Published : 05 Feb 2026, 01:13 AM
প্রতি বছর বাংলাদেশ বর্হিবিশ্বে যে পরিমাণ তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই যাচ্ছে ১১টি দেশে।
ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও রাশিয়ার মত অপ্রচলিত বাজার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হলেও নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানির উদ্যোগ এগোচ্ছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন বাজারে প্রবেশ করতে বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি না নিয়ে চালু বাজারকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। সরকার বিশেষ সুবিধা দিলে নতুন বাজারেও বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়তে পারে।
শুধু প্রণোদনা নয়, জ্বলানি ও বিদ্যুৎ সমস্যা না কাটা পর্যন্ত রপ্তানি বাজার খুব একটা বড় করার সুযোগ কম বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
সিংহভাগই ১১ দেশে
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ বা ৩১ বিলিয়র ডলারের পণ্য যায় ১১টি দেশে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুারোর (ইপিবি) তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত বছর জাপান, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, নেদারল্যান্ডস, পোলান্ড, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে গেছে মোট পোশাকের ৭৯ দশমিক ৯২ শতাংশ।
আগের বছরে, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই দেশগুলোতে যায় মোট পোশাকের ৭৯ দশমিক ২৭ শতাংশ।
অবশিষ্ট ২০ শতাংশ যাচ্ছে বাকি দেশগুলোতে।

ওই ২০ দেশের মধ্যে একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে গত বছর পোশাক রপ্তানিতে ৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এরপর জার্মানিতে যাচ্ছে মোট পোশাকের ১২ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ ও ৯ শতাংশ যাচ্ছে স্পেনে। অবশিষ্ট ৯টি দেশে ৫ শতাংশ করে যাচ্ছে বাংলাদেশের পোশাক।
সম্ভাবনার জাপানে রপ্তানি শুরু
জাপান, ব্রাজিল, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মেক্সিকো, ভারত,মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, চীন,দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, চিলিকে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির জন্য ‘অপ্রচলিত বাজার’ হিসেবে ধরা হত আগে।
এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়, ব্রাজিল ও রাশিয়া সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়। হাল আমলে নতুন বাজার হিসেবে জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। চাহিদা থাকায় মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে রপ্তানি।
ইপিবির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে জাপানে মোট ১১৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৩ শতাংশ জাপানে গেছে।
এর মধ্যে ওভন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৫৮ কোটি ৬১ লাখ ডলারের; নিট খাতে আয় হয়েছে ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার।
আগের বছরে জাপানে ১১১ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা যে পোশাক বানাই, তা জাপানের জন্য উপযুক্ত। তারা উচ্চ ও মধ্যম দামের পোশাক ব্যবহার করে। শুল্ক ঝামেলা কম বলে দেশটির সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, জাপান বছরে ২২ দশকি ৮৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করে। এর মধ্যে বাংলাদেশ মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশের জায়গা নিতে পেরেছে।
জাপানের বাজারের বাকি অংশ চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভারতের দখলে। এর মধ্যে চীনের পরের অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম।
জাপানে বাংলাদেশের তৈরি ট্রাউজার, টি-শার্ট, শার্ট, ডেনিম, জ্যাকেট এবং উচ্চমানের তুলার পোশাকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
সম্ভাবনাময় এ দেশটির সঙ্গে ইকোনোমিক পার্টনারশিপে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ওই চুক্তি হলে ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ।
এক সময়ের ‘অপ্রচলিত বাজার’ জাপানে দিন দিন বাংলাদেশি পোশাকের চাহিদা বাড়লেও অন্যান্য দেশে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে না।
ফজলে শামীম এহসান বলেন, “অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলে আমাদের সবচেয়ে বেশি রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তাদের ক্রয় ক্ষমতা অনেক বেশি। আমরা যে মানের পোশাক তৈরি করি তার ক্রেতা রয়েছে সেখানে।”
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ায় ৮১ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৮০ কোটি ডলারের।

অন্যদিকে রাশিয়ায় সবশেষ অর্থবছরে ৩২ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক যায়।
সম্ভাবনা থাকলেও দেশ দুটিতে রপ্তানি বাড়াতে বাধা কোথায় জানতে চাইলে ফজলে শামীম এহসান বলেন, “রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য করতে বাধা আছে যুক্তরাষ্ট্রের। আমরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়ব। তবে যদি তাদের সঙ্গে পণ্য বিনিময় করি, তাহলে সমস্যা হবে কি না তা দেখা যেতে পারে।”
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় খরচের বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণে বিনিয়োগ রয়েছে রাশিয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ কারণে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনেক দায় আটকে গেছে।
চীনের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ উন্মোচন করার বিষয়টিও দেখা যেতে পারে বলে পরামর্শ দেন ফজলে শামীম।
নতুন বাজারে পণ্য জনপ্রিয় করতে প্রদর্শনী ও মেলায় অংশগ্রহণ করতে হয়। নতুন ক্রেতার সন্ধান শেষে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দেশের কারখানায় নিয়ে আসার মত বিষয়গুলোও ব্যয়বহুল।
ফজলে শামীমের ভাষ্য, দূতাবাস ও সরকারের উদ্যোগে মেলার আয়োজন করলে স্টল দিতে পারেন বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা। সেক্ষেত্রে হোটেলসহ বিভিন্ন সুবিধা দিলে খরচ পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
অথবা প্রণোদনার আকার বাড়িয়ে দিলেও উদ্যোক্তারা নতুন বাজারের প্রতি ঝুঁকবেন বলে মনে করেন তিনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে যাচ্ছে ৪৮ শতাংশ
বাংলাদেশের পোশাকের পুরনো বাজারের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্রেতা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো।
ইপিবির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে একক বাজার হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে মোট পোশাকের ৪৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ গেছে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইইউতে পোশাক রপ্তানি হয় ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারের, যা মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ দশমিক ১০ শতাংশ।
ওই অর্থবছরে মোট ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ১০ শতাংশ।
দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত কেবল ডজনখানেক দেশের ওপর নির্ভর করে থাকার বিষয়টি ‘ঝুঁকি’ তৈরি করছে বলে মনে করেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্টস লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের বাজার মূলত ইউরোপকেন্দ্রিক। এখন ইইউর সঙ্গে নতুন নতুন দেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে আলোচনা করছে। ভারত ইতোমধ্যে তা নিয়েছে। এখন আমাদেরও সেরকম কিছু করতে হবে।

“যদি সেটা না হয়, তাহলে নতুন বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে না পারলে সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের এ খাতটি ঝুঁকির মুখে পড়বে। সরকারের দিক থেকে এ বিষয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা করা দরকার।”
বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাজার সম্প্রসারণ জরুরি। তার চেয়ে বেশি জরুরি হল শিল্পে জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ। সেটা করতে পারলে তো বিদ্যমান সক্ষমতায় কয়েক বছরের মধ্যে পোশাক রপ্তানি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব।”
তিনি বলেন, “রপ্তানি বাজার বাড়াতে হলে বন্দর ও সড়কের পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে হবে আগে। শুধু ক্রেতা আকৃষ্ট করে বাজার বাড়ানোর পরিকল্পনা খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না।’’