Published : 10 Aug 2026, 12:27 AM
আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপের (এবিজি) পাশাপাশি আরও একটি বেসরকারি কোম্পানি সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছে।
বখতিয়ার আহমেদ জেনারেল ট্রেডিং ওপিসি নামের এই কোম্পানি জ্বালানির পাশাপাশি আইনি সেবা, কৃষি ও মৎস্য, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি, জনশক্তি, আমদানি-রপ্তানি এবং স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতুর ব্যবসাতেও জড়িত বলে তাদের ওয়েবসাইটে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল বসুন্ধরার আবেদন ঘিরে।
গত মে মাসে বড় পরিমাণে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল আমদানি এবং নিজস্ব ব্যবস্থায় বাজারজাত করার অনুমতি চেয়েছিল বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড।
এরপর সেই আবেদন পরীক্ষা করতে বিপিসি কমিটি করে। পরে বেসরকারি খাতের জন্য পরিশোধিত তেল আমদানি থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের আলাদা নীতিমালার খসড়া তৈরির নির্দেশ দেয় সরকার।
বেসরকারি খাতকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নের লিখিত জবাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত দুটি কোম্পানি এ ধরনের আবেদন করেছে। একটি আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ-এবিজি; অন্যটি বখতিয়ার আহমেদ জেনারেল ট্রেডিং ওপিসি।
বখতিয়ার আহমেদ জেনারেল ট্রেডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বখতিয়ার আহমেদ রনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এই বছরের প্রথম দিকে তারা বিপিসিতে আবেদন করেছিলেন। তবে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের সেই পরিকল্পনা এখন আর তাদের নেই।
বখতিয়ার আহমেদ জেনারেল ট্রেডিং ওপিসি তাদের ওয়েবসাইটে খনিজ ও জ্বালানি সম্পদের আমদানি-রপ্তানি, সরবরাহ এবং কেনাবেচার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলসহ বিভিন্ন ধরনের তেল এবং সিএনজি ও এলপিজির কেনাবেচায় কাজ করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ আমদানি-রপ্তানি ও সরবরাহের কাজ করার কথাও সেখানে বলা হয়েছে।
কোম্পানি প্রোফাইলে ‘পেট্রোলিয়াম, গ্যাস অ্যান্ড মাইনিং’ নামে আলাদা ব্যবসায়িক ক্ষেত্র দেখানো হয়েছে। সেখানে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল এবং গ্যাসের কেনাবেচায় মধ্যস্থতার কথা বলা হয়েছে।
তবে এ কোম্পানির মধ্যস্থতায় কবে কী পরিমাণ অপরিশোধিত বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে, কোথা থেকে তা আমদানি হয়েছে, বড় পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহের কোনো প্রকল্প পরিচালনা করেছে কি না, সেসব তথ্য ওয়েবসাইটে নেই।
তাদের নিজস্ব তেল টার্মিনাল বা বড় সংরক্ষণাগার থাকার কোনো তথ্যও সেখানে নেই।
বাংলাদেশে বখতিয়ার আহমেদ অ্যাসোসিয়েটস গ্রুপ এর প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর দনিয়ার ৪৯ রাসুলপুরে। দুবাইয়ের দেইরা এবং সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউনেও কার্যালয় থাকার কথা বলা হয়েছে।
বসুন্ধরার আবেদনে কী ছিল?
বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীর কাছে সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে।
আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীরের স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে বছরে ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রোল এবং ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানির অনুমতি চাওয়া হয়।
সর্বোচ্চ পরিমাণ ধরে হিসাব করলে বছরে ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের সুযোগ চেয়েছে এ কোম্পানি।
আবেদনে বসুন্ধরা বলেছে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে তাদের রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ২২ লাখ ১০ হাজার টন। সেখানে প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
উৎপাদিত ফার্নেস অয়েল ও বিটুমিন তারা নিজস্ব ব্যবস্থায় বাজারজাত করছে এবং ডিজেলসহ অন্য জ্বালানি বিপিসিকে সরবরাহ করছে।
বসুন্ধরা বলেছে, ২০২৪ সালের ১০ জুন তারা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুদ ও প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত তেল বিপণনের অনুমতি পেয়েছিল। সেই অনুমোদনের সঙ্গে ৩৮৮টি ফিলিং স্টেশন স্থাপন এবং এলপিজি বা অটোগ্যাস স্টেশনকে ফুয়েল স্টেশনে রূপান্তরের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
আগের অনুমতিতে বসুন্ধরাকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এবারের আবেদনে তারা বিদেশ থেকে পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল এনে নিজস্ব ব্যবস্থায় বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চেয়েছে।
বসুন্ধরার আবেদন পাওয়ার পর ২ জুলাই সেটি বিপিসিতে পাঠায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। প্রচলিত আইন ও বিধির আলোকে আবেদনটি পরীক্ষা করে মতামত দিতে বলা হয়। এরপর ১৪ জুলাই ১১ সদস্যের একটি কমিটি করে বিপিসি।
আবেদনকারী কোম্পানির কারিগরি সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি প্রস্তাবটির আইনি দিক দেখতে বলা হয় ওই কমিটিকে।
বসুন্ধরার চাওয়া বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানির প্রভাবও ছিল কমিটির কার্যপরিধিতে। রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের বাজার হিস্যা, রাজস্ব ও ব্যবসায় প্রস্তাবটির সম্ভাব্য প্রভাব দেখতে বলা হয়।
একই সঙ্গে সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারের ওপর এর প্রভাব পর্যালোচনা করতে বলা হয় কমিটিকে। এসব বিষয়ে সুপারিশ দেওয়ার জন্য কমিটিকে সময় দেওয়া হয় দুই কর্মদিবস।
এরপর ৬ অগাস্ট বিপিসিকে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরির নির্দেশ দেয় জ্বালানি বিভাগ। ১০ অগাস্টের মধ্যে খসড়াটি জমা দিতে বলা হয়।
তবে রোববার বিপিসির কাছে জানতে চাইলে সংস্থাটি জানিয়েছে, তখনও খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত হয়নি।
‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়ার অভিযোগ নাকচ সরকারের
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বাজারজাত করার অনুমতি চেয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের আবেদনের পর তড়িঘড়ি বেসরকারি খাতের জন্য বাজার খুলে দেওয়ার নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
সরকার বলছে, বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রস্তাবিত নীতিমালা নিয়ে কিছু সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অনুমান নির্ভর ও অসত্য তথ্য’ প্রকাশ করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ‘দায়িত্বশীল আচরণ’ করার অনুরোধ জানিয়েছে সরকার।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে’ নীতিমালার খসড়া তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
“এই নীতিমালার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।”
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখা এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য দাবি করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একটি ‘স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা’ গড়ে তোলাও এর লক্ষ্য।