১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি এমদাদুলকে অপসারণ

পি কে হালদারের ঋণ অনিয়মের সময় আলোচনায় আসা আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকে এ সিদ্ধান্ত চিঠি দিয়ে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 22 Apr 2026, 02:07 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:27 PM

আগের কর্মস্থলে বিভিন্ন ‘অনিয়মে’ জড়িত থাকা এবং সেসব তথ্য ‘গোপন করে মিথ্যা হলফনামা’ দেওয়ার অভিযোগে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলামকে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঋণ জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের জেরে বেশ কয়েক বছর ধরে ধুঁকতে থাকা আর্থিক খাতের কোম্পানিটির এই প্রধানকে সোমবার সরিয়ে দেওয়া হয়।

অর্থপাচারের অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা পি কে হালদারের ঋণ অনিয়মের সময় আলোচনায় আসা ব্যাংক বর্হিভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকে সেদিনই এ সিদ্ধান্ত চিঠি দিয়ে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ।

এমডি এমদাদুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডে এমডি ও সিইও থাকাকালে বেশ কিছু অনিয়ম করেন। এসময়ে তার দায় দেখতে পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি হওয়ার আগে তিনি এসব তথ্য গোপন করে মিথ্যা হলফনামা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের পরিচালক হাসান তারেক খাঁন এসব অনিয়মের কথা তুলে ধরে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের চেয়ারম্যানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।

চিঠিতে তিনি একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে আর্থিক খাতের কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র পরিচালক মো. মাহবুবুল হককে প্রশ্ন করা হলে তিনি একটি বৈঠকে থাকার কথা বলে ফোন রেখে দেন। পরে কল করা হলে আর ফোন ধরেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডিকে অপসারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে চাননি।

ব্যাংক বর্হিভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩ এর ১৯ ধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে ‘অদ্য (সোমবার) অপসারণ করা হল’। 

চিঠিতে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গত ২৫ জানুয়ারি এমদাদুলকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়। ২৮ জানুয়ারি তিনি এর জবাব দেন। প্রায় তিন মাসের মাথায় সেই জবাবকে ‘অসন্তোষজনক’ বিবেচনা করে চূড়ান্ত অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

চিঠিতে বলা হয়, তার (এমদাদুলের) অনিয়মের মধ্যে রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি ছাড়াই গ্রাহক প্রতিষ্ঠান কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের ৪৯ দশমিক ৯০ কোটি টাকার ঋণ স্থিতিকে অশ্রেণিকৃত ঋণ হিসেবে দেখানো। এর মাধ্যমে জিএসপি ফাইন্যান্সের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১৬ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

এছাড়া সার্কুলারের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে আথিক প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী কোম্পানি জিএসপি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ঋণ সুবিধা পুনর্গঠন করার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

চিঠিতে বলা হয়, “কোভিডকালীন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারি করা পরিপত্রের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ডরিন হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের ঋণ হিসাবের বিপরীতে অতিরিক্ত দণ্ডসুদ আরোপ করা হয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বারবার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা পরিপালন করা হয়নি।”

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানিতে দায়িত্ব পালনের সময় এসব অনিয়মের জন্য এমদাদুলের ‘সুস্পষ্ট দায়’ রয়েছে।

“এসব বিষয় থাকা সত্ত্বেও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য দাখিল করা আবেদন ও হলফনামায় তিনি এ সংক্রান্ত তথ্য গোপন করেছেন।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, এসব অনিয়মে এমদাদুলের ‘দায় থাকায়’ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি হিসেবে নিয়োগের জন্য ‘মিথ্যা হলফনামা’ দাখিল করায় তাকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে এমদাদুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আর্থিক এ প্রতিষ্ঠানের সাবেক ব্যবস্থাপক ছিলেন পি কে হালদার; যিনি গ্রেপ্তার হয়ে ভারতের কারাগারে। দেশের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির আলোচনায় নাম আসে তার। তিনি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক এমডিও।

নানা কৌশলে নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলে শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনেন এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে নিজের আত্মীয়, বন্ধু ও সাবেক সহকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে পর্ষদে বসিয়ে অন্তত চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার।

এই চার কোম্পানি হল- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (আইএলএফএসএল), পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)।

পি কে হালদার নামে-বেনামে পিপলস লিজিংসহ নানা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খুলে হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পালিয়ে যান বলে ২০২০ সালের শুরুতে খবর আসে।

ওই বছর জানুয়ারিতে হাই কোর্ট ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে পি কে হালদারকে অপসারণ করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদকে স্বাধীন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। 

একই সময় পি কে হালদারসহ শীর্ষ ২০ কর্মকর্তার পাসপোর্ট জব্দের নির্দেশও আসে।

এরপর দুদক তদন্তে নেমে পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের ৩৪টি মামলা করে। ২০২২ সালের মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তাকে গ্রেপ্তারের খবর আসে। 

পরের বছর ৮ অক্টোবর প্রথম মামলায় তার ২২ বছরের কারাদণ্ডের রায় আসে।

অর্থপাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের এ মামলায় আরও ১৩ জনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।