Published : 06 Aug 2026, 09:19 PM
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ আরও কমে জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে; যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সবশেষ সংকোচন মূলক মুদ্রানীতিতে জুন শেষে এ খাতে যে প্রবৃদ্ধির আশা করেছিল, এ হার সেটির থেকেও কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা ছিল জুন মাসে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৫ শতাংশ হওয়ার।
তিন মাস আগেই একক মাস হিসেবে মার্চে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি দেখেছিল বাংলাদেশ; প্রবৃদ্ধি নেমেছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে। জুনে তা আরও কমে গেল।
২০২৩ সাল থেকে খরায় চলা বেসরকারি ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি গত মে মাসে ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এপ্রিলে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
এ খাতে ঋণ প্রবাহের হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঋণ প্রবাহ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রণোদনার প্যাকেজ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এতে ঋণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ব্যবসায়ীরা এখন জ্বালানি সংকটে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন। অনেকের উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমেছে, কারো কারো এক তৃতীয়াংশ হয়ে গেছে।
নিজের কারখানার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিতে শুরু করেছেন ক্রেতারা। এই পরিস্থিতিতে নতুন ঋণের চাহিদা তো থাকবে না।
ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় তারল্য বাড়ছে অনেক ব্যাংকের হাতে। আমানতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিতার কারণে বিনিয়োগে গতি আসছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে বছর তিনেক ধরে ধীরগতির হয়ে পড়া অর্থনীতিতেও গতি পাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়ে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। এই স্থিতি এক বছর আগের ঋণ স্থিতি ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকার চেয়ে তুলনায় ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি।
গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ছয় মাসের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। এতে ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ৬ দশমিক ৮ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। জানুয়ারির মুদ্রানীতিতে এ হার ধরা হয়েছিল সাড়ে ৮ শতাংশ।
মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। আগের মুদ্রানীতিতে এ হার ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকারি ঋণের চাপে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে তা ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ করা হয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর সবচেয়ে বেশি সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় গত এপ্রিল শেষে ৩০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। তার পরের অর্থাৎ গত মে মাসে প্রবৃদ্ধি হয় ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ।
সরকারি ঋণ প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রকাশিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনীতির গতি কমতে শুরু করে। মোট দেশীয় উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও গত জুনায়ারি-মার্চ প্রান্তিকে হয় ২ দশমিক ২২ শতাংশ। আগের প্রান্তিকে ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
মূলত কৃষি শিল্প ও সেবা খাতে আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় সবশেষ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগের প্রান্তিকের তুলনায় কমে যায়।
এ কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যায় তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশের উপরে উঠে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন অধিক সচেতন হচ্ছে নতুন ঋণ দিতে।
এর সঙ্গে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে বৈশ্বিক প্রভাব পড়তে শুরু করে। মূলত এই তিন কারণেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যায় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এদিকে সার্বিকভাবে অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধি গত জুন শেষে হয় ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ। জানুয়ারির মুদ্রানীতি এ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। আর সবশেষ মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সার্বিকভাবে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।
শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা কমে যাওয়ার জন্য সুদহারও দায়ী। কিন্তু এটি একমাত্র কারণ নয়। প্রধান কারণ হল জ্বালানি সংকট, যা যত দ্রুত সম্ভব সমাধান করা প্রয়োজন।
ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগে সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেটা ধীরে ধীরে বাড়বে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক এজাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ হলেও যদি তা উৎপাদনশীল খাতে যায়, তাহলে খারাপ না।
আরও পড়ুন
গ্যাস সংকটে গাজীপুরে ১৮% কারখানায় ৩ দিনের ছুটি, সড়কে 'ঈদের মত' ভিড়