Published : 03 Dec 2025, 12:44 AM
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার পর কোনো কর্মকর্তা এখন চাইলে যে কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হতে পারবেন।
তবে শর্ত হল, প্রথম শ্রেণি বা সমমানের পদে ২০ বছরের চাকরি জীবনে কোনো পর্যায়ে দ্বিতীয় গ্রেডের বেতনধারী হতে হবে।
নতুন এই সুযোগ তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার দিয়েছে গত ২৭ নভেম্বর। কিন্তু তাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অধীনস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত দেখছেন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহীদ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নুতন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ব্যাংক, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কর্মকর্তাদের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে যোগদানে আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এতদিন এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা নীতিমালা না থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অবসরের পর বাণিজ্যিক ব্যাংকে যোগদানের উদাহরণ আছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অবসরে যাওয়ার পরপরই বাণিজ্যিক ব্যাংকে সরাসরি উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যোগ দিয়েছেন অনেক কর্মকর্তা।
কেউ কেউ সরাসরি ব্যাংক পরিচালনায় সম্পৃক্ত না হলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রশিক্ষণ একাডেমির প্রধান পদ সামলেছেন। তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংক পাড়ায় সমালোচনাও হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এবার সেই পথ খুলে দিল।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন করার ফলে এখন থেকে কোনো ব্যাংকের এমডি হতে ব্যাংকিং পেশায় কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা লাগবে। এর মধ্যে এমডির আগের পদ উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জারি করা সার্কুলারে এমডি নিয়োগের শর্তে বলা ছিল, ব্যাংকিং পেশায় ২০ বছরের সক্রিয় অভিজ্ঞতার পাশাপাশি উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বা অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে একক বা উভয়ভাবে ২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
গত নভেম্বরের দেওয়া সার্কুলারে অন্যান্য শর্ত ঠিক রেখে এমডির আগের পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা এক বছর বাড়িয়ে তিন বছর করা হয়েছে।
আর আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় প্রথম শ্রেণি বা সমমান পদে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার পাশাপাশি জাতীয় বেতন কাঠামোতে দ্বিতীয় গ্রেডে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও আইডিআরএ তে চাকরিতে প্রবেশের সহকারী পরিচালক পদটি প্রথম শ্রেণি বা জাতীয় বেতন কাঠামোতে নবম গ্রেডের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পদোন্নতি পাওয়া সর্বোচ্চ পদ হচ্ছে নির্বাহী পরিচালক (ইডি), যা জাতীয় বেতন কাঠামোর দ্বিতীয় গ্রেডভুক্ত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকদের মধ্যে মাত্র তিন জন জাতীয় বেতন কাঠামোতে প্রথম গ্রেডভুক্ত। দুটি পদ জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এবং একটি পদ গবেষণা বিভাগের পরিচালকের জন্য নির্ধারিত।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাহী পরিচালকের নিচের পদের কেউ বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি হতে পারবেন না। এ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্বাহী পরিচালক পদ থেকে অবসরে গেলে বা ২০ বছর চাকরি করে ইডি পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি হওয়ার সুযোগ তৈরি হল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এর ফলে একজন ইডি হওয়ার পরপরই কোনো ব্যাংকের এমডি পদের জন্য আবেদন করতে পারবেন। নিয়োগ পেলে চাকরি থেকে পদত্যাগ করে বাণিজ্যিক ব্যাংকে চলে যেতে পারবেন।”
বেসরকারি খাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডির বেতন ১০ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আছে।
সেই অতিরিক্ত অর্থের লোভে আগ থেকেই কোনো ব্যাংককে সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে মন্তব্য করে অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা সম্পূর্ণ স্বার্থের সংঘাত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে অধীনস্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না।
“এতে আর্থিক খাতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হবে, কারণ হল ভবিষ্যত সুবিধা আদায়ে চাকরি জীবনের শুরু থেকেই কর্মকর্তারা কোনো কোনো ব্যাংকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করতে পারেন।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলছেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংক খাতে শীর্ষ পর্যায়ে জনবল ঘাটতি পূরণ ও কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ব্যাংকের পরিসর অনুযায়ী শীর্ষ পদে দক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশেষ করে পুরোমাত্রায় পেশাদার ও উপযুক্ত লোকের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সেজন্য ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দীর্ঘদিন বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন যারা করেছেন, তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে এর মাধ্যমে।
ব্যাংকগুলো চাইলে নিতে পারবেন। যারাই বাণিজ্যিক ব্যাংকে যাবেন, তাদের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।’’
এ যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে শহিদুল ইসলাম বলেন, “বাণিজ্যিক ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজের ধরন আলাদা। এখানে একটির অভিজ্ঞতা অন্য জায়গায় কাজে লাগানোর বিষয়ে পুরোটা লেলানো যাবে না।
“নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিয়ম নীতি তৈরি করে, পরিপালন করতে বাধ্য করে, শাস্তি দেয়। সেখানে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা থাকে না। বাণিজ্যিক ব্যাংক গণ মানুষের সঙ্গে কাজ করে প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে, তাদের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য থাকে। তাই অভিজ্ঞতা আলাদা।”
তিনি বলেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকে কাজের ঝুঁকি বেশি হওয়ায় আর্থিক সুবিধাও বেশি। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তার যদি অর্থের টান থাকে, তাহলে শুরুতেই কেনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে গেলেন না। সেখানে গেলেন না এ কারণেই যে, তার ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ আর্থিক সুবিধা প্রয়োজন। এখন কেন আবার অর্থের প্রতি টান থাকবে? এটা হলে ভবিষ্যত সুবিধার জন্য কর্মকর্তাদের অনৈতিক পথে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাটা থাকে। আমি বলছি না সবাই যাবে। কিন্তু সুযোগটা তো তৈরি হল।”