প্রতিবছর বাজেটে কর বাড়িয়ে দেওয়ার পর বাড়তি দামেই ভোক্তাদের সিগারেট কিনতে হয়। কিন্তু কোম্পানির কৌশলের কারণে সরকার প্রথম কয়েক মাসে কর বাড়ানোর ফল পায় না।
Published : 24 Dec 2024, 10:32 PM
বাজেটে কর বাড়ানোর পর দোকানে বাড়তি দামে সিগারেট বিক্রি হলেও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ-এর কৌশলের কারণে সরকার চার অর্থবছরে প্রায় ৩৭৯ কোটি টাকার শুল্ক ও কর থেকে ‘বঞ্চিত’ হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট —এলটিইউ (মূসক) বলছে, বিএটির মজুদ ও বিক্রির তথ্য যাচাই করে কর ফাঁকির ‘প্রমাণ’ পাওয়া যায়। এর পর চার অর্থবছরের জন্য আলাদা চারটি নোট পাঠানো হয় ওই কোম্পানিটিকে।
চারটি ‘ডিমান্ড নোট’ পাঠানোর কথা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নিশ্চিত করেছেন এলটিইউ (মূসক) কমিশনার মো. সামছুল ইসলাম। এই অর্থ আদায়যোগ্য বলেও ডিমান্ড নোটে লেখা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএটি বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া জানতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের তরফ থেকে যোগাযোগ করা হলে কোম্পানির মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রতিবছর বাজেটে কর বাড়িয়ে দেওয়ার পর বাড়তি দামেই ভোক্তাদের সিগারেট কিনতে হয়। কিন্তু কোম্পানির কৌশলের কারণে সরকার প্রথম কয়েক মাসে কর বাড়ানোর ফল পায় না।
সিগারেট কোম্পানিগুলো বাজেটের আগেই বাড়তি পণ্য উৎপাদন করে পুরনো কর পরিশোধ করে মাল খালাস করে ফেলে। এই সিগারেটই পরে বাড়তি দামে ভোক্তার কাছে বিক্রি করা হয়।
বিএটির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমে এলটিইউ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১০ কোটি ৮৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩৪২ টাকা কর ফাঁকির ‘প্রমাণ’ পায়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সে অর্থ চেয়ে বিএটিকে নোটিস দেয় এনবিআর।
নোটিসের পর সিগারেটের বাড়তি মূল্যের কর হার নিয়ে আইনি প্রশ্ন ওঠে। কোন অর্থবছরের বাড়তি কর হার প্রযোজ্য হবে, মূলত সেই প্রশ্নে জটিলতা দেখা দেয়। তখন এনবিআরের মূসক (বিধি) শাখা আগের অর্থবছরের পক্ষে মত দেয়।
নতুন করহার ধরে নিরীক্ষা করায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১০ কোটি টাকার কর ফাঁকির তথ্য মিলেছিল; সংশোধন করার পর এটি দাঁড়ায় ১৬৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
পরে অনুসন্ধানে নেমে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৮ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা কর ফাঁকির তথ্য পায় এলটিইউ।
বাকি তিন অর্থবছরের ক্ষেত্রে মূসক বিধি শাখার ব্যাখ্যা অনুযায়ী নিরীক্ষা করা হয়। সব মিলিয়ে চার অর্থবছরে বিএটির কর ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭৯ কোটি টাকা।
বিএটির কর ফাঁকির বিষয়ে এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (মূসক বিধি) মো. বদরুজ্জামান মুন্সী বলেন, “আমরা অভিযোগ এনেছি যে তুমি (বিএটি) বেশি মূল্যে বিক্রি করেছ। সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য যেটা নির্ধারণ আছে, তার থেকে যখন বেশি মূল্য নেওয়া হচ্ছে, তখন সেই অতিরিক্তটার ওপরে ডিউটি-ট্যাক্স দিতে হবে।
"ডিউটি-ট্যাক্স প্রযোজ্য হবে কীভাবে, সেটা আবার আইন বলে দিয়েছে। কারখানা থেকে যেদিন বের হবে, ওই দিন যে ডিউটি ছিল, যে আইন ছিল, সেটাই প্রযোজ্য হবে।"
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বলেন, “প্রতিবছরই যেহেতু কোম্পানিগুলো এ সুযোগ নেয়, সেটি বিবেচনায় রেখে বাজেট উপস্থাপনের আগের দিন আমরা তাদের (বিএটি) কারখানায় গিয়ে মজুদ সিগারেটের তথ্য নিই।
“বাজেটের পর এই কোম্পানির গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত ডিপো ও পণ্যাগারে গিয়ে দেখি, তারা আগে উৎপাদন করা সিগারেট বাড়তি মূল্যে জেলায় জেলায় সরবরাহ করছে।"
বাড়তি মূল্যে বিক্রির কথা বিএটি ‘স্বীকার করেছে’ বলেও দাবি করেন ওই কর্মকর্তা।
দেশে এমন ওয়্যারহাউজ (পণ্যাগার) কত জানতে চাইলে তিনি বলেন, “২৫টির কম হবে না, ৩০ বা ৩৫টিও হতে পারে।”
এলটিইউর (মূসক) কমিশনার সামছুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কোম্পানিকে ‘ডিমান্ড নোট’ দেওয়া হয়েছে। এতে ১৫ দিনের মাঝে জবাব দিতে বলা হয়েছে।”
সেখানে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী দাবিকৃত রাজস্ব পরিশোধের আগের দিন পর্যন্ত প্রযোজ্য হারে সুদ আদায়যোগ্য হবে।
সামছুল ইসলাম বলেন, আইনিভাবে ৫ বছরের বেশি সময় আগের নিরীক্ষায় বিধিনিষেধ থাকায় আপাতত চার অর্থবছরের নিরীক্ষা করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বিএটি বাংলাদেশের মন্তব্য জানতে চেয়েছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এর উত্তর আসে বাংলাদেশে বিএটির জনসংযোগের কাজ করা ফোরথট পিআরের মাধ্যমে।
বিএটি বাংলাদেশের একজন মুখপাত্র সেখানে বলেন, " বিষয়টি এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট ও করদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়, যার ফলে এই ব্যাপারে আমরা কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।