১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্যাংকে প্রশাসক থাকার সীমা বাড়ল

চব্বিশের আন্দোলনের পর ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে বেশ কিছু ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়; বেশ কয়েকটিতে বসানো হয় প্রশাসক।

ব্যাংকে প্রশাসক থাকার সীমা বাড়ল
.

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Aug 2026, 01:57 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

কোনো ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করা প্রশাসক কিংবা পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের মেয়াদে দুই বছরের সীমা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নিয়ম শিথিল করার এ পদক্ষেপের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে দুই বছরের বেশি সময় প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ তৈরি হল। একই সঙ্গে ভেঙে দেওয়া পর্ষদের মেয়াদেও কোনো সীমা থাকবে না।

চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে বেশ কিছু ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়; বেশ কয়েকটিতে বসানো হয় প্রশাসক।

এখনও অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসকরা দায়িত্ব পালন করছেন। অনেক ব্যাংকের পর্ষদ চলছে স্বতন্ত্রদের দিয়ে। তাদের কাজ চালিয়ে নেওয়ার সুবিধার জন্যই এমন পদক্ষেপ বলে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

এজন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের সুনির্দিষ্ট ধারার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতির জন্য সোমবার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকে প্রশাসক রাখার জন্য এমন সিদ্ধান্ত কিনা- এমন প্রশ্নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিশেষ কোনো ব্যাংককে উদ্দেশ্য করে এই সিদ্ধান্ত হয়নি।

সার্কুলারে বলা হয়, “ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১ (১৯৯১ সনের ১৪ নং আইন) এর ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা বলে এতদ্বারা সংশ্লিষ্ট সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত) এর ৪৭(২) ধারায় উল্লেখিত পরিচালনা পর্ষদ বাতিল আদেশের মেয়াদ সংক্রান্ত বিধান সকল ব্যাংক-কোম্পানীর ক্ষেত্রে, সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে না।’’

অর্থাৎ এখন থেকে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭(২) ধারা পরিপালন থেকে অব্যাহতি পেল বাংলাদেশ ব্যাংক।

কী আছে ৪৭(২) ধারায়?

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭ নং ধারার ১ উপধারা অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের কার্যকলাপ বা আমানতকারীদের স্বার্থের পরিপন্থি বা ক্ষতিকর কোনো কিছু পেলে লিখিত কারণ জানিয়ে পরিচালক পর্ষদ বাতিল করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে ৪৭(২) ধারায় বলা হয়, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংক উপ-ধারা (১) এর অধীন প্রদত্ত আদেশের মেয়াদ সময় সময় বর্ধিত করিতে পারে, তবে বর্ধিত মেয়াদসহ উক্ত মেয়াদ দুই বছরের বেশি হইবে না।’’

এখন এই ধারা পালন থেকে ছাড় পাওয়ায় পরিচালক পর্ষদ ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকসহ আরও বেশ কয়েকটি ব্যাংক বিকল্প ব্যবস্থায় পরিচালনার সুযোগ পেল বাংলাদেশ ব্যাংক।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয় ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে। এরপরই সংস্কারের দাবি তীব্র হলে সবার অগ্রাধিকারে চলে আসে ব্যাংক খাত।

অগাস্ট মাসেই চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৭ ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সেসময পর্যায়ক্রমে ১২ থেকে ১৩টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। অনেক ব্যাংকে বসানো হয় প্রশাসক।

এসব ব্যাংকের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক রয়েছে।

এগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক বসিয়ে ব্যাংকগুলো পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে ন্যশনাল ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা হয় শেয়ারধারক পরিচালকদের। পরে প্রিমিয়ারসহ কয়েকটি ব্যাংকের পর্ষদে রদ-বদল করে তা উদ্যোক্তা ও শেয়ারধারক পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পর্ষদ ভেঙে দেওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে শরীয়াহভিত্তিক এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক।

এখন পর্যন্ত তিনটি ব্যাংকের প্রশাসক সরিয়ে সেগুলো সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এর বাইরে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদে ফিরেছেন সাবেক পরিচালকদের কেউ কেউ। নতুনভাবে পর্ষদের নেতৃত্বে এসেছে চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপ। ন্যাশনাল ব্যাংককেও ফিরে এসেছেন উদ্যোক্তা পরিচালকদের অনেকে। 

অন্যদিকে ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ সরকারি মালিকানা থাকা আইএফআইসি ব্যাংকের পর্ষদে রয়েছেন দুই সরকারি কর্মকর্তা। এখনো চেয়ারম্যানসহ তিনজন স্বতন্ত্র পরিচালক রয়েছেন।

আর ২০২৪ এর অগাস্টে বাদ দেওয়া ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদে এখনো ফিরেনি উদ্যোক্তা ও শেয়ারধারক পরিচালক। গত জুন পর্যন্ত এভাবেই স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়ে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করে আসছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে পরে তা ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তাকেই পুরো পর্ষদ দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়।