১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

নভেম্বরে তরঙ্গ নিলাম: রাজস্ব ও বিনিয়োগের ভারসাম্য আসবে তো?

কয়েক হাজার কোটি টাকার এই নিলাম প্রক্রিয়ায় সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব বাড়ানো; অন্যদিকে তরঙ্গের দাম কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব মূল্য কাঠামো তৈরির দাবি তুলছে অপারেটররা।

গোলাম মর্তুজা অন্তু গোলাম মর্তুজা অন্তু

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 04 Aug 2026, 01:01 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

দেশের তিনটি বেসরকারি মোবাইল অপারেটরকে আগামী নভেম্বরের মধ্যে ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ (স্পেকট্রাম) নবায়ন করতে হবে, যেখান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পাওয়ার আশা করছে সরকার।

তবে বাংলাদেশের বাজারে তরঙ্গের উচ্চমূল্য নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে অপারেটরদের। তারা সরকারকে ‘সবার জন্য ইন্টারনেট’ রূপকল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছে, উচ্চমূল্যের কারণেই গত জানুয়ারির নিলামে প্রায় অর্ধেক তরঙ্গ অবিক্রীত থেকে গিয়েছিল। 

অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) তরঙ্গ নবায়নের ক্ষেত্রে রাজস্ব আয় ও সেবার প্রসারের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জায়গা খোঁজার চেষ্টা করছে। 

রেডিও স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ একটি সীমাবদ্ধ জাতীয় সম্পদ। মোবাইল অপারেটররা বিটিআরসির কাছ থেকে নির্ধারিত দামে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এই তরঙ্গ বরাদ্দ পায়। 

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম না থাকলে উচ্চগতির মোবাইল ব্রডব্যান্ড সেবা সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়ে। আবার স্পেকট্রামের দাম বেশি হলে অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বিনিয়োগও কমে যায়। ফলে মূল্য নির্ধারণে রাজস্ব আহরণ ও বিনিয়োগ—দুই দিকের ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সবগুলো মোবাইল অপারেটর মিলে ৪৬৩ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহার করছে। এর মধ্যে আগামী নভেম্বরে গ্রামীণফোনকে ৩২ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ, রবিকে ২৯ দশমিক ৪ এবং বাংলালিংককে ২১ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নবায়ন করতে হবে।

গত জানুয়ারিতে ৭০০ ব্যান্ডের ২০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামে তোলা হলেও চড়া দামের কারণে রবি ও বাংলালিংক নিলাম থেকে সরে দাঁড়ায়। শুধু গ্রামীণফোন ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকায় কিনে নেয়। 

পরে অব্যবহৃত ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ প্রায় বিনামূল্যেই রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটককে বরাদ্দ দেয় সরকার। এ নিয়ে অপারেটরগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। 

তাদের দাবি, সরকার দাম না কমালে এবারও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ তরঙ্গ অবিক্রীত থেকে যেতে পারে। দাম কমালে তরঙ্গের ব্যবহার বাড়বে, যা সেবার মান ও পরোক্ষ রাজস্ব দুই-ই বাড়াবে।

‘সুইট পয়েন্ট’এর তালাশ

স্পেকট্রামের দাম কিছুটা কমালে বিক্রি বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্বও বাড়তে পারে—এমন যুক্তি দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছে টেলিযোগাযোগ খাত।

তবে বিটিআরসি বলছে, দাম কমানোর সিদ্ধান্ত শুধু ধারণার ভিত্তিতে নেওয়া যাবে না।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারী বলেন, “(আন্তর্জাতিক সংস্থা) জিএসএমএ এর প্রতিনিধিরা এখানে আছেন, তারা বারবার আমাদের তাগিদ দেন যে স্পেকট্রামের বা তরঙ্গ লাইসেন্সের দাম অনেক বেশি। 

“আমরাও বুঝি—হ্যাঁ, দাম বেশি। তবে এটি একটি ধারণা নির্ভর কথা। কারণ মূল ধারণাটি হলো, স্পেকট্রামের দাম কমালে সরকারের পরোক্ষ রাজস্ব বাড়বে। কিন্তু সরকারের সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের নিশ্চয়তা দরকার।”

এ কারণে মূল্য, শর্ত ও অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনায় আগেভাগেই একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে বিটিআরসি। 

বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, “স্পেকট্রামের দাম ঠিক কতটা হলে সরকারের রাজস্ব এবং সার্বিক অগ্রগতি—উভয় ক্ষেত্রেই একটি ‘সুইট পয়েন্ট’ (ভারসাম্যপূর্ণ জায়গা) তৈরি হবে, সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য গবেষণা ছিল না। তাই বিটিআরসি সম্প্রতি এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূণ ও গভীর গবেষণা শুরু করেছে। 

“আমরা আশা করছি, এবারই হয়ত প্রথমবার একটি নির্ভরযোগ্য গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বিটিআরসি সরকারকে পরামর্শ দিতে পারবে যে ইন্টারনেট এবং অন্যান্য বিষয়ের জন্য স্পেকট্রামের উপযুক্ত বা যৌক্তিক মূল্য ঠিক কত হওয়া উচিত।”

কী বলছে অপারেটররা

বর্তমানে গ্রামীণফোনের প্রায় ৮ কোটি ৪৪ লাখ গ্রাহকের জন্য রয়েছে ১৩৭ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম। রবির ৫ কোটি ৭৪ লাখ গ্রাহকের জন্য রয়েছে ১২৪ মেগাহার্টজ এবং বাংলালিংকের ৩ কোটি ৭৪ লাখ গ্রাহকের জন্য ৮০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম।

এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটকের হাতে রয়েছে মোট ৬৫ দশমিক ২ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম; তাদের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৬৮ লাখ।

নতুন করে বিপুল বিনিয়োগের আগে অপারেটররা তরঙ্গের দাম নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।

গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, একটি ভারসাম্যপূর্ণ, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব স্পেকট্রাম নবায়ন কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।

“বর্তমানে বাংলাদেশে স্পেকট্রামের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এবং বাজার বাস্তবতায় তুলনামূলকভাবে বেশি। তাই আমরা আশা করি, নবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আরও যৌক্তিক ও বিনিয়োগ-সহায়ক একটি মূল্য কাঠামো বিবেচনা করা হবে, যা অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে অধিক বিনিয়োগে সক্ষম করবে। 

“এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের গঠনমূলক আলোচনা অব্যাহত থাকবে। আমরা আশাবাদী, স্পেকট্রাম নবায়ন প্রক্রিয়া এমনভাবে পরিচালিত হবে যা দেশের শক্তিশালী ও টেকসই ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়ক হবে।”

বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, স্পেকট্রাম নবায়নের আগে স্বাধীন পরামর্শকের মাধ্যমে মূল্য ও নীতিমালা পর্যালোচনার উদ্যোগকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন।

“আমরা আশা করি, এই রিভিউটি প্রমাণ-ভিত্তিক হবে, যা আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা এবং আঞ্চলিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। পাশাপাশি এটি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ফলাফল নির্ধারণে সহায়তা করবে যা দীর্ঘমেয়াদে সরকার এবং টেলিযোগাযোগ শিল্প উভয়েরই স্বার্থ রক্ষা করবে।”

রবির চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, গত ১৫ বছর ধরে তুলনামূলক সীমিত স্পেকট্রাম নিয়েই তাদের প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে। তারপরও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং দ্রুত বাড়তে থাকা ডেটা ব্যবহারের চাহিদা পূরণে তারা বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।

তার মতে, স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণে সরকারের ‘সবার জন্য ইন্টারনেট’ লক্ষ্য এবং ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।

সাহেদ আলম বলেন, “স্পেক্ট্রাম নবায়নের মূল্য যদি অত্যধিক মাত্রায় বেশিই থেকে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত এর মাশুল গ্রাহকদেরই গুনতে হবে। একই মানের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অপারেটররা সীমিত স্পেকট্রামের ঘাটতি পূরণে উল্লেখযোগ্যভাবে আরও বেশি নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম স্থাপন করতে বাধ্য হবে। 

“এটি কেবল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ব্যয়ই বৃদ্ধি করে না, বরং টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম আমদানিও বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার বাইরে চলে যায়।”

ফয়েজ তৈয়্যবের ভিন্ন মত

স্পেকট্রাম মূল্য নির্ধারণ নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করা ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব। চলতি বছরেই ৭০০ ব্যান্ডের তরঙ্গ নিলামে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তিনি।

তার মতে, স্পেকট্রামের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণে নতুন করে জটিল গবেষণার প্রয়োজন নেই। বিটিআরসির দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বিভিন্ন ব্যান্ডের চাহিদা বিবেচনা করে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, সব ব্যান্ডের স্পেকট্রামের মূল্য এক হতে পারে না। যে ব্যান্ডের চাহিদা বেশি, তার মূল্য এক রকম হবে; আবার যেসব ব্যান্ডের চাহিদা কম, সেগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি নেওয়া যেতে পারে।

ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যবের স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণে শুধু তাৎক্ষণিক রাজস্বের দিকে নজর দিলে হবে না। অপারেটররা বেশি বিনিয়োগ করতে পারলে উন্নত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে, গ্রাহক বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারও কর, ভ্যাট ও অন্যান্য উৎস থেকে বেশি রাজস্ব পাবে।

তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ এখন স্পেকট্রাম বিক্রি থেকে সর্বোচ্চ অর্থ আদায়ের পরিবর্তে টেলিযোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এতে সেবার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি রাজস্বও বাড়ছে।

তার ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ভিত্তিমূল্য আগের তুলনায় ১০ শতাংশ কমানো হয়েছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ব্যান্ডের মূল্য একই হারে কমাতে হবে।

তিনি বলেন, যেসব ব্যান্ডের বাজারচাহিদা কম, সেগুলো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত রেখে দেওয়ার চেয়ে যৌক্তিক মূল্যে বরাদ্দ দেওয়া বেশি লাভজনক। এতে স্পেকট্রাম ব্যবহারের পরিমাণ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারেরই লাভ হবে।

স্পেকট্রাম নবায়নের আগে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ফয়েজ তৈয়্যব।

তিনি বলেন, “বিটিআরসিতে তরঙ্গ নিয়ে যথেষ্ট কাজ হয়েছে। সেই কাজের ভিত্তিতে বিটিআরসির নিজেই এটা করা উচিৎ। আসলে কনসালটেন্ট নির্ভরতা থেকে আমাদের সরে আসা উচিৎ।”

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ফয়েজ তৈয়্যব বলেন, “বাংলাদেশের সরকারি লেভেলে যে কনসালটেন্টরা কাজ করে তাদের অধিকাংশেরই মান অত্যন্ত নিচু। এবং আমরা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাইকার ক্ষেত্রেও দেখেছি যে গতানুগতিক কনসালটেন্ট হিসেবেও বস্টন কনসালটেন্সি, পিডব্লিউসি–এরাই আসে। 

“এদের ইন্ডিয়ান কিছু ছেলে-পেলেই এখানে কাজ করে। একই কনসালটেন্ট বিভিন্ন প্রজেক্টে বিভিন্নভাবে কাজ করে। সুতরাং আমি কনসালটেন্ট নির্ভরতার কোনো প্রয়োজন দেখছি না।”