কতটা জ্বলে উঠতে পেরেছে তৌকীর আহমেদের ‘স্ফুলিঙ্গ’?

রোদেলা নীলা
Published : 31 March 2021, 04:56 PM
Updated : 31 March 2021, 04:56 PM

সময়টা ১৯৯৬ কি ১৯৯৭; তৌকীর আহমেদ তখন একের পর এক নাটক উপহার দিয়ে যাচ্ছেন দর্শকদের। তৌকির নিজেও হয়তো জানতেন না অভিনেতা নাম ছাপিয়ে তার নাম উঠবে সফল নির্মাতার খাতায় । আমার চোখে তৌকীর আহমেদ এই উপমহাদেশের অনেক গুণি পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম একজন। তাই তার কাছে আমার প্রত্যাশাও কিছু বেশি। যারা তার পরিচালনায় 'হালদা' সিনেমাটি দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই আমার সাথে একমত হবেন। 'জয়যাত্রা' সিনেমার মধ্য দিয়ে তার পরিচালনার ক্যারিয়ার শুরু। একে একে নির্মাণ করেছেন অজ্ঞাতনামা,  দারুচিনি দ্বীপ, রূপকথার গল্প, জালালের গল্প, ফাগুন হাওয়ায়। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র 'ফাগুন হাওয়া'র গান এবং সংলাপ আধুনিক প্রজন্মকে যে স্পর্শ করে গেছে সেটা ইউটিউবে সার্চ করলেই বোঝা যায় ।

গত ২৬ মার্চ মুক্তি পেয়েছে স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রযোজিত 'স্ফুলিঙ্গ'। পরিচালক তৌকীর আহমেদ যথেষ্ট আশাবাদী হয়ে বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং চেতনার সাথে তারুণ্যের মেলবন্ধন রচনা করাই এই সিনেমার প্রয়াস। ১৯৭১ সালে অবশ্যই মানুষের হৃদয়ে স্ফুলিঙ্গ দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু; নয়তো এই দেশের জন্মই হতো না। আবার যদি বর্তমান প্রজন্মের কথা বিশ্লেষণ করতে যাই তাহলে তো অবশ্যই এদের ভেতর এমন লুুকায়িত আগুন আছে যা দিয়াশলাই সংস্পর্শ পেলেই জ্বলে উঠতে পারে, ছড়িয়ে পড়তে পারে স্ফুলিঙ্গ। সিনেমার নামকরণ উপযুক্ত হয়েছে বলেই আমি মনে করি।

ফজলুর রহমান বাবু এই সিনেমায় শেষ অব্দি অভিনয় করতে পারেননি। তারকা শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন- মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াত, শহীদুল ইসলাম সাচ্চু, রওনক হাসান, জাকিয়া বারী মম, পরীমনি এবং শ্যামল মওলা।

আবুল হায়াত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন; যিনি সর্বদা ব্যস্ত থাকেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে কথা বলতে। পার্থকে তিনি কথায় কথায় অপদস্থ করেন এবং তাকে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার মতো কুটিল কাজটিও তিনি বেশ দক্ষতার সাথেই করেন। নিঃসন্দেহে এমন চরিত্রে আবুল হায়াত অন্যতম কাস্টিং।

মামুনুর রশিদ এবং শহিদুল ইসলাম সাচ্চু, এই দুই জাত অভিনেতা যখন ক্যামেরার সামনে আসেন তখন মনে হয় পু্রো ফ্রেমটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে;  তাদের চোখের অভিব্যক্তি এবং সংলাপ ছুড়ে দেবার নৈপুণ্যের পেছনে কোনো দক্ষ জাদুশিল্পী আছে  তা অস্বীকার করা যাবে না।

ব্যরিস্টার আসিফ চরিত্রে রওনাক হাসান দুর্দান্ত নির্বাচন। তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, তীক্ষ্ম অভিব্যক্তি  দারুণ ভাবে একজন উকিলকে প্রদর্শন করতে সফল হয়েছে। স্ক্রিনে কম উপস্থিতি নিয়ে পর্দায় রিমান্ড অফিসার হিসেবে আবির্ভাব হয়েছেন এ কে আজাদ সেতু। ছাড়া ছাড়া কয়েকটি দৃশ্য, বলিষ্ঠ কন্ঠ, রুঢ় আচরণ চমৎকার ভাবে বুঝিয়ে দেয় রিমান্ডে এমনি নির্যাতন করা হয় আসামীদের।

পরীমনি এবং জাকিয়া বারি মম; তাদের যতটা চরিত্রের জন্যে করার ততটাই করেছেন বলেই আমি মনে করি। বাকি যারা আছেন সবার নাম এ মুহূর্তে মনে না পড়লেও কোনো চরিত্র অতিরঞ্জিত বা আরোপিত বলে মনে হয়নি।

এই সিনেমায় জাফর চরিত্রে হাসনাত রিপন সাবলীলভাবে দর্শকদের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সিনিয়র ভোকালিস্টের একটি চরিত্রে পার্থ বড়ুয়াকে কাস্ট করলে ব্যান্ডপ্রেমীরা আরো বেশি মুগ্ধ হতেন বলে আমার ধারণা।

তৌকীর আহমেদের লেখা চিত্রনাট্যে বেশ উপভোগ্য ছিল সংলাপ। সিনেমা হলে মুহূর্তে মুহূর্তে দর্শক সারিতে হাসির রোল উঠেছে। এই সিনেমার একমাত্র উপজীব্য হচ্ছে ব্যান্ডের গান; সবগুলোই এক কথায় দারুণ। গানের কথা ও কম্পোজিশন সব বয়সীদের স্পর্শ করে যাবার মতো। মাঝে মাঝে হলের  সিটে বসে আছি না কি কনসার্টে আছি সেটা নিয়ে নিজের মধ্যে সংশয় কাজ করেছে। পিন্টু ঘোষ এবং রোকন ইমনের 'বুঝি না' বা 'তোমার নামে' গান দুটো ইউটিউবে দারুণ চলছে।

https://www.youtube.com/watch?v=gknI-5cGv9o

আশির দশক ধরে ব্যান্ডের শিল্পীরা যে ধরনের পোশাক পরে আসছেন, তৌকীর আহমেদও সেই ধারাবাহিকতা সিনেমাতে বজায় রেখেছেন; ব্যতিক্রম শুধু শ্যামল মওলা। আইরিন চরিত্রে মমর পোশাক ঠিক ছিল। ট্যাটু বেশ মানিয়েছে কেবল ঠোঁটের নীচে চকচক করা বিষয়টি ভালো লাগেনি; আরোপিত মনে হয়েছে। সাধারণ নারী পোশাকে দিবা চরিত্রে পরিমনী সব সময়কার মতোই গর্জিয়াস। আর শহীদুল আলম সাচ্চু নাইট গাউন কেন সব সময় পরেছিলেন সেটা পরিষ্কার না।

পার্থর ঘর, কবির বাড়ির গাছ ভর্তি বারান্দা, উকিলের দপ্তর, কোর্টের ভেতর অংশ, সূর্যমুখী, নৌকা  নদী সব কিছুই দৃষ্টিনন্দন ছিল। শিল্প নির্দেশনা বেশ উপভোগ্য ছিল, দেওয়ালে দেওয়ালে বঙ্গবন্ধুর ক্ষণে ক্ষণে আবির্ভাব নতুনত্ব এনেছে। আর গান চর্চা করবার ঘরটা ছিল বেশ বিশ্বাসযোগ্য।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাসের যাত্রীদের যে তল্লাশি করা হয়েছে তার সাথে যোগ করে পরিচালক দেখিয়েছেন গাড়িতে করে পার্থ ও তার বন্ধু মদের বোতল নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে। দু'সময়কার পুলিশি জেরার তোপে মুক্তিযোদ্ধা এবং বর্তমানের চোরাই মদ পাচারকারী কী করে সমন্বয় হলো তা বোঝা যায়নি।

রেপ কেসে রিমান্ডে আটকে পড়া পার্থের আঙ্গুল ভাঙ্গতে দেখা যায় অফিসারকে। পাশাপাশি পরিচালক দেখিয়েছেন পাকহানাদার বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধার আঙ্গুল ভেঙে দেওয়াকে। কী অর্থে এই সংযোগ হলো?

কিছু অসামঞ্জস্যতা মেনে নিয়ে স্ফুলিঙ্গ চলচ্চিত্রকে সফল বলা চলে না কি ওই অসামঞ্জস্যতাকেই বড় করে দেখতে হবে, তা স্পষ্ট করে বুঝতে হলে অবশ্য হলে গিয়েই স্ফুলিঙ্গ দেখতে হবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক