পুরোপুরি চালু হোক রেস্তোরাঁ খাত

মীর নিয়াজ মোর্শেদ
Published : 9 July 2020, 03:29 PM
Updated : 9 July 2020, 03:29 PM

ঢাকার রাস্তার বাঁকে বাঁকে খাবার দোকান, রেস্তোরাঁ, যেগুলোতে ভিড় লেগে থাকত সবসময়। নভেল করোনাভাইরাস আতঙ্কে এখন খোলা রেস্তোরাঁ পাওয়াই ভার। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

মধ্যপ্রাচ্যের হালাল রেস্টুরেন্ট চেইন হারফি বাংলাদেশের অ্যাসিসট্যান্ট হেড অফ অপারেশনস হিসেবে কাজ করছি আমি। গত তিন মাসের বেশি সময় ধরে আমাদের উপার্জনের একমাত্র উৎস রেস্তোরাঁর বিক্রয় বন্ধ; মানে কোনো অতিথি রেস্তোরাঁয় বসে খাবার-পানীয় সেবা গ্রহণ করতে পারবেন না।

বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক চেইন রেস্তোঁরাসহ অন্যান্য রেস্তোরাঁগুলো সাধারণত মোট বিক্রয়ের শতকরা ১৫-২০ ভাগ বিক্রয় করে  টেক অ্যাওয়ে ও হোম ডেলিভারি সেবা থেকে। স্বাভাবিক ভাবেই আয়ের প্রায়  ৮০-৮৫ শতাংশ আসে 'ডাইন ইন' খাত থেকে। মহামারীর বাস্তবতায় গত কয়েক মাস ধরে দেশের এই খাতটি অবর্ননীয় বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়েই যাচ্ছে।

লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা অন্য সবার মত আন্তরিক ভাবেই সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়ম মেনে খুব সীমিত পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। আর এতে করে রেস্তোরাঁর আয় কমে আসে ৬০-৮০ শতাংশ। অনেক কর্মীকে বাধ্য হয়ে বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠাতে হয়েছে। এই সময় অনেক প্রতিষ্ঠানই অপারগ হয়ে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে, হচ্ছে।

মহামারীর মত দৈব ঘটনায় যদি কারো উপার্জনের একমাত্র উৎস হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এর মত দুঃখজনক আর কিছু হতে পারেনা। মৃত্যু ভয়ে বাসায় বসে সঙ্গরোধ পালন করার মত বিলাসিতা আমাদের অনেকেরই নেই।

আয়ের প্রধান খাত কবে স্বাভাবিক ভাবে চালু হবে তা কেউ জানিনা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের জায়গা ভাড়া কি আধা পয়সাও মওকুফ হয়েছে?  আমাদের পণ্য সরবরাহকারীদের বিল কি এড়ানো সম্ভব? সম্ভব নয়, কারণ ওরাও ব্যবসা করে পেট চালায়। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বিল কি আমাদেরকে পরিশোধ করতে হচ্ছে না?

ছোঁয়াচে ভাইরাসে মরার ভয়ের চেয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা, মাস শেষে কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধের দায়বদ্ধতা এবং কোনো রকমে নিজের সংসার চালানোর চিন্তা অনেকের কাছেই মূখ্য বিষয়।

আমরা কোনো প্রকার দূর্নীতি করিনা, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অনেক কষ্ট করে সৎভাবে অর্থ উপার্জন করি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আট-নয় ঘন্টা দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়, মানুষের যাচ্ছেতাই বাজে ব্যবহার মুখ বুঁজে সহ্য করতে হয়। আমাদের অঢেল ব্যাংক ব্যালেন্স নাই, আর এজন্যই মাসের পর মাস যদি মূল বেতনের ৪০-৫০ শতাংশ পাই তাহলে ঢাকা শহরে বাস করবো কীভাবে?

যে কোনো মহল্লার বাজারে গেলে পা ফেলার জায়গা পাওয়া কষ্টকর। সামাজিক দূরত্ব রক্ষার ন্যূনতম সদিচ্ছা আমাদের কারো নেই। অনেক সময় দেখেছি সামাজিক দূরত্ব মেনে সিরিয়াল দিয়ে ক্রেতা ঢোকানোর ও বিল নেওয়ার লোক দেখানো নাটক করতে। নাটক বললাম কারণ, সিরিয়াল দিয়ে ঢোকার পর সুপার শপের ভেতরের অবস্থা ফার্মগেট অথবা কারওয়ান বাজারের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

রেস্তোঁরায় ক্রেতা বসে খেলে সংক্রমণের আশংকা যত বেশি, তার থেকে শত শত গুণ বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকি সুপার শপ এবং বাজারে। রেস্তোরাঁয় কোনো ক্রেতা দৌড়াদৌড়ি, ধাক্কাধাক্কি করেন না, সেই সুযোগ নাই।  সুপার শপে সামাজিক দূরত্ব মানা আদৌ সম্ভব নয় কারণ ভেতরে ঢুকে শপিং করতে থাকা কারও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা অন্তত বাংলাদেশে সহজ হবে না।

তবে রেস্তোঁরায় সামাজিক দূরত্ব মেনে অতিথি বসানো শতভাগ সম্ভব। বিভিন্ন দেশে লকডাউন পরবর্তী সময়ে (মূলত উত্তর আমেরিকায়) রেস্তোরাঁ, পাব, ক্যাফে চালু হয়েছে আমেরিকার ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের বেঁধে দেওয়া নিয়মানুসারে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তার পূর্বের ধারণ ক্ষমতার ৫০ শতাংশ অতিথি একসাথে বসাতে পারবেন। প্রতিটি টেবিলের মধ্যে ন্যূনতম ব্যবধান ছয় থেকে আট ফুট হতে হবে। হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ জীবাণুনাশকের  পর্যাপ্ত মজুদও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এই বিধিতে।  এছাড়াও খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুত ও পরিবেশন কাজে নিয়োজিত সবাইকে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে হেড ক্যাপ, হ্যান্ড গ্লাভস পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।


ভরপুর ব্যবসার রেস্তোরাঁ স্টার কাবাব বন্ধ রয়েছে এখনও। ছবি: হাসান বিপুল

কোভিড-১৯ আমাদের ভালো-খারাপ অনেক কিছুই শিখিয়েছে এবং শেখাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হল ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের চর্চা এবং ভোক্তাদের সচেতনতা।

হঠকারী সিদ্ধান্তে রেস্তোরাঁ খাতের ধ্বংসের চেয়ে, দেশের নীতি নির্ধারকদের উচিৎ যুক্তরাষ্ট্রের মতো সহজে পালনীয় সংক্রমণ প্রতিরোধের যুগপোযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করে সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রেস্তোরাঁ খাত উন্মুক্ত করে দেওয়া।

আমার আফসোস এমন একটি সেক্টরে চাকরি করি, যেখানে আমাদের কোনো সংগঠন নাই, নিজেদের মৌলিক অধিকার নিয়ে বলার মত শক্ত মেরুদণ্ড কারো নেই। জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান এবং বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিকারী উদীয়মান হোটেল-রেস্তোরাঁ সেক্টরকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানাই সবার কাছে।

লাখ লাখ মানুষের রুটি-রুজির উৎস এই সেক্টরকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এমন কেউ কি নেই যে আমাদের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরবেন? আসুন, এসময় ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেরা বাচাঁর তাগিদে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে রেস্তোরাঁ সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার যৌক্তিক এবং ন্যায্য দাবি পেশ করি।

একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ   হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট প্রফেশনাল হিসেবে এই সময়ে এমনটা হওয়াই যথাযথ বলে মনে করছি। আমি বিশ্বাস করি, নির্বোধের মত সবকিছু নিয়তির হাতে ছেড়ে না দিয়ে, নিজেদের সার্বিক দিক রক্ষার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া এখনই প্রয়োজন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক