হলে গিয়ে ‘ন ডরাই’ দেখতে হবে যে কারণে

তন্ময় সাগর
Published : 8 Dec 2019, 12:01 PM
Updated : 8 Dec 2019, 12:01 PM

'ন ডরাই' মানে 'ভয় পাই না'। দু:খজনক হলেও সত্য ন ডরাই তে আমি 'ভয় পাই না' এমন অর্থবাচক বা দ্যোতনার কিছু পাইনি। সে কথায় পরে আসছি।

ন ডরাই সম্ভবত বাংলাদেশে নির্মিত হওয়া সেরা মেকিংয়ের মুভি। কয়েকটা জায়গায় তো পুরোই অভিভূত হবেন। বাংলাদেশের মুভি দেখছেন কি না দ্বিধায় পড়ে যাবেন। সিনেমার ক্যামেরার মুন্সিয়ানা দারুণ। মেকিং আন্তর্জাতিক মানের তা মানতেই হবে।

তবে সেন্সর বোর্ড কোন দৃশ্যগুলো কাটাতে বাধ্য করেছে সেটা আমরা হয়ত আন্দাজ করতে পেরেছি পুরো মুভি দেখে। আমাদের আন্দাজ ঠিক হয়ে থাকলে দৃশ্য কর্তনে মুভির গল্প বয়ানে কোন হেরফের হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে দৃশ্যগুলো না কাটালে হয়ত দৃশ্যগুলোর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আমরা আলোচনা ও মতামত দেওয়ার সুযোগ পেতাম। অবশ্য তখন দৃশ্য কাটা না কাটার এই আলোচনাও থাকতো না হয়ত।

ন ডরাইয়ের প্রচার শুরু থেকে জেনে আসছি দেশে সার্ফিং নিয়ে নির্মিত প্রথম মুভি এটি। সার্ফিং আছে। শুরু হয় সার্ফিং দিয়েই। কিন্তু সার্ফিং এই মুভির উপজীব্য এটা বলা বোধহয় সমীচিন হবে না। ঘটনা হিসেবে সার্ফিং আছে। কিন্তু সার্ফিং উপজীব্য হয়ে উঠতে পারেনি বা সার্ফিং উপজীব্য না এই মুভির৷

নাম তো ন ডরাই। তাহলে ভয় পাই না এমন ঘটনা এই মুভির উপজীব্য? মজার বা দুঃখের বিষয় সেটাও এই মুভিতে পাইনি।

গল্পের একটি চরিত্র সার্ফিংয়ে পুরস্কার বিজয়ী সোহেল। পরিবার বা আদতে সমাজের অবদমনের শিকার হয়ে সার্ফিং ছাড়তে বাধ্য হওয়া আয়শা আরেকটি চরিত্র।

সার্ফিং মুল উপজীব্য দাবী করা হয়ে থাকলেও শৃঙ্খলাহীন সোহেলের সেরা সার্ফার হয়ে উঠার লড়াইটা অতটা সময় পায়নি সিনেমাতে। সামান্য সময়ের পরিশ্রমেই সে অসামান্য হয়ে উঠলো এমনটাই মনে হয়েছে। পুরস্কার জিতেও ফেললো।

গল্প এখানেই শেষ না। আবার আয়শার ভাল সার্ফিং করা বা ছোট বেলা থেকেই সার্ফিংয়ের প্রতি অগাধ আবেগও শেষ পর্যন্ত জোরালো ভাবে দেখানো হয়নি। ভাইয়ের অত্যাচারে অবদমিত আয়শা ঘরে বন্দি হতে, সার্ফিং ছাড়তে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়েতে বাধ্য হয়। আয়শার মধ্যে আমরা ন ডরাই বা ভয় পাই না এমন কোনো কিছু পাই না অন্তত অত্যাচারী স্বামীর গায়ে হাত তুলবার আগ পর্যন্ত। তার আগে অর্থাৎ বিয়েরও আগে পাড়ার কান কথা লাগিয়ে বেড়ানো এক মহিলার আচরণের প্রতিবাদ করতে দেখি আমরা বটে। সেটাও সব হারাবার পর এবং সামান্যতম।  অথচ সমাজ বা পরিবারের অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য না করে ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়েতে না বসে, সার্ফিং চালিয়ে গেলেই আয়শার ন ডরাই মানে ভয় পাই না মনোভাব প্রকাশ পেতে পারতো।

মুভির নামকরনের সার্থকতা, সেই সাথে আয়শার লড়াই সংগ্রামও উঠে আসতো। উঠে আসতো অদম্য মনোভাব। মুভির প্রচারে বিয়ের পোশাকে সার্ফিং বোর্ড হাতে আয়শাকে দেখে আমরা সাধারণ দর্শকের ভেবেছিলাম এটা সার্ফিং ভালবাসা প্রান্তিক এক নারীর লড়াই সংগ্রামের মুভি। সার্ফিংয়ে তার মুক্তি ও বিজয় অর্জন। আদতে মুভিটা কার ও কীসের সেটা মুভি দেখলে আপনি বিভ্রান্ত হবেন। অমনোযোগী ও শৃঙ্খলাহীন জীবন যাপনকারী সোহেলের বিশ্বজয়ী সার্ফার হয়ে উঠার গল্প এই মুভি? না সমাজের অত্যাচারে হার মানতে বাধ্য হওয়া  আয়শার গল্প এটা?

মাঝে মার্কিন নাগরিক এস্থার সাথে সোহেলের সম্পর্কিত হওয়া, ঢাকায় চলে যাওয়া এসব ন ডরাই নামের গল্পটা যেমন প্রতিবাদের লড়াইয়ের মনে হচ্ছিল সেটার সাথে যায় না৷ যেমনটা হার মানতে বাধ্য হওয়া আয়শাকে বেমানান লেগেছে ন ডরাই-তে। এতো ভাল মেকিংয়ের মুভির শেষটাও গড়পড়তা সাদা মাটা একেবারে। বলা হয়েছে সত্য ঘটনা অবলম্বনে ন ডরাই নির্মিত। সেই সত্য ঘটনার পুরো বয়ান আমাদের দেখানো ন ডরাই তে থেকে থাকলে, কৌতূহল থেকে যায় সেই সত্য ঘটনার ঠিক কোন জায়গাটা নির্মাতাদের উদ্বুদ্ধ করেছে এমন ঘটনা নিয়ে এতো সুন্দর মেকিংয়ের মুভি বানাতে।

চাটগাঁর ভাষায় হলেও ন ডরাই এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভাষাগত বিরক্তি তৈরি করবে না আপনার। বরং কোথাও কোথাও বেশি ভাল লাগাবে। কথিত অশ্লীল শব্দ বা বাক্য ব্যবহার বরং বেশি প্রাসঙ্গিক বাস্তবানুগ মনে হয়েছে। আর আয়শা নাম নিয়ে আইনি নোটিশের ঘটনাটি অহেতুক মূর্খতা বা ভিন্ন কোনো  কারণ বলে মনে হচ্ছে ন ডরাই দেখা শেষ করার পর।

আমাদের চলচ্চিত্র হাঁটি হাঁটি পা পা করে একটা পরিণতির দিকে যাচ্ছে। ন ডরাই দেখিয়ে দিলো মেকিং কাকে বলে। ন ডরাই মেকিংয়ের জন্য অনেক পুরস্কার পাবে বা পাওয়া উচিত বলে ধারনা করি। ন ডরাই দেখে স্বস্তি ও শান্তি দুটোই পাবেন। আর গল্পের জন্য ন ডরাইয়ের সমালোচনা করতে থিয়েটারে গিয়ে আপনাকে ন ডরাই দেখতেই হবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক