জাহাজ ভাঙা শিল্প: শ্রমিকের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে লাভ করছে শিপিং কোম্পানিগুলো

জাহাজের বিষাক্ত বর্জ্যগুলো সরাসরি ফেলা হচ্ছে সৈকত ও এর আশেপাশে। সেইসঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি, বিশ্রাম ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দিতেও অনীহা রয়েছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 7 Nov 2023, 10:22 AM
Updated : 7 Nov 2023, 10:22 AM

বাংলাদেশের সৈকতে গড়ে ওঠা জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোর দূষিত ও বিপজ্জনক পরিবেশ সম্পর্কে জানার পরও বেশি লাভের জন্য ইউরোপীয় শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের পরিত্যক্ত জাহাজ ভাঙতে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ- এইচআরডব্লিউ।

বেলজিয়াম ভিত্তিক এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যৌথভাবে করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশি ইয়ার্ডগুলোতে কাজের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। জাহাজের বিষাক্ত বর্জ্যগুলো সরাসরি ফেলা হচ্ছে সৈকত ও এর আশেপাশে। সেইসঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি, বিশ্রাম ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দিতেও অনীহা রয়েছে।

জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম আছে, যেখানে পরিবেশ ও শ্রমিকদের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত ইয়ার্ডগুলোতে সেই পরিবেশ না থাকার পরও কীভাবে জাহাজ কোম্পানিগুলো নিয়মের ফাঁক গলে তাদের পরিত্যক্ত জাহাজ পাঠাচ্ছে, তার গোটা নেটওয়ার্ক তুলে ধরেছে এইচআরডব্লিউ ও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম।

‘জীবনের বিনিময়ে লাভের ব্যবসা: বাংলাদেশের সৈকতে বিষাক্ত জাহাজ ভাঙতে যেভাবে নিয়ম ভাঙছে জাহাজ শিল্প’ শীর্ষক ৯০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার প্রকাশ করে এইচআরডব্লিউ।

এশিয়ায় মানবাধিকার সংস্থাটির সিনিয়র গবেষক জুলিয়া ব্লেকনার বলেন, “বাংলাদেশের বিপজ্জনক ও দূষিত ইয়ার্ডে কোম্পানিগুলো জাহাজ ভেঙে বাংলাদেশিদের জীবন ও পরিবেশের বিনিময়ে লাভ করছে। আন্তর্জাতিক নিয়মের ফাঁকফোকর ব্যবহার বন্ধ করে জাহাজ কোম্পানিগুলোর উচিত নিরাপদে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করা।”

এইচআরডব্লিউ ও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম বলছে, পরিবেশগতভাবে নিরাপদে জাহাজ ভাঙার জন্য রয়েছে হংকং ইন্টার‌ন্যাশনাল কনভেনশন, যা কার্যকর হবে ২০২৫ সাল থেকে। টেকসই ও নিরাপদ জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তোলার জন্য এই কনভেনশনকে শক্তিশালী করা উচিত। এছাড়া এই কাজের জন্য বাসেল কনভেনশনসহ বিদ্যমান আন্তর্জাতিক শ্রম ও পরিবেশ আইন মেনে চলা উচিত দেশগুলোর।

জাহাজভাঙার কাজে জড়িত ৪৫ জন শ্রমিক, ১০ জন চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ, সরকারি জাহাজ শিল্প ডেটাবেজ, কোম্পানিগুলোর আর্থিক ডেটাবেজ, বাংলাদেশের ইয়ার্ডে জাহাজ আমদানি ও আমদানি সনদের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।

শ্রমিকরা বারবার বলে আসছেন, এই কাজ করার সময় তাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয় না। প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় না। হাত পুড়ে যাওয়া ঠেকাতে শ্রমিকরা তাদের মোজাকেই গ্লাভস হিসেবে ব্যবহার করেন। খালি পায়ে তারা স্টিল গলানোর কাজ করেন। বিষাক্ত গ্যাস থেকে রক্ষা পেতে তারা নিজেদের শার্ট বেঁধে নেন মুখে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজভাঙার জন্য বিশ্বের অন্যতম গন্তব্য এখন বাংলাদেশ। ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশের ২০ হাজার শ্রমিক ৫২০টির বেশি জাহাজ কেটেছে, যা অন্য যে কোনো দেশের সক্ষমতার চেয়ে বেশি। জাহাজ ভাঙার এই কাজকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা।

(প্রতিবেদনটি প্রথম ফেইসবুকে প্রকাশিত হয়েছিল ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে: ফেইসবুক লিংক)