গত ৩১ ডিসেম্বর সাঁতারকুলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খতনা হয় আয়ানের। জ্ঞান আর ফেরেনি। পরে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে ৭ জানুয়ারি মৃত ঘোষণা করা হয় তাকে।
Published : 25 Feb 2024, 06:53 PM
থানায় মামলা করার কারণে হুমকির অভিযোগ নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) হারুন অর রশিদের কাছে গেলেন খতনা করাতে গিয়ে মারা যাওয়া আয়ান আহমেদের বাবা শামীম আহমেদ।
রোববার দুপুরে গোয়েন্দা কার্যালয়ে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়ে তিনি বলেন, হুমকির কারণে আতঙ্কে দিন কাটছে তার।
শামীম লিখেন, “অভিযুক্ত ডাক্তাররা এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে অফিস করছেন। তাদের বিরুদ্ধে ইউনাইটেড হাসপাতাল কোনো প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
“বাড্ডা থানায় মামলা করার কারণে আমি এবং আমার পরিবারকে প্রাণনাশের প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, যার কারণে আমরা শাহবাগ থানায় একটি জিডি করি। কোনো প্রকার উপায় না পেয়ে আপনার শরণাপন্ন হলাম।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের কাউকে গ্রেপ্তার না করায় আমি এবং আমার পরিবার হুমকির মধ্যে আছি।”
অভিযোগে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক সাইদ সাব্বির আহম্মেদ, তাসনুভা মাহজাবিন, রিফাতুল আক্তার, মহাব্যবস্থাপক বসির আহমেদ মোল্লা, সহকারী মহাব্যবস্থাপক মঈনুল আহমেদ, হেলথ কেয়ার ইউনাইটেড গ্রুপের পরিচালক নিজাম উদ্দিন হাসান রশিদ, ইউনাইটেড মেডিকেল হাসপাতালের চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজা এবং ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন উদ্দিন হাসান রশিদকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিও জানানো হয়।
শামীম আহমেদ জানান, তার কথা শুনে দ্রুতই তদন্ত শেষ করে সংশ্লিষ্টদের বিচারের মুখোমুখি করার আশ্বাস দিয়েছেন হারুন।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর পৌনে ছয় বছর বয়সী ছেলে আয়ানের খতনা করাতে রাজধানীর সাঁতারকুলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান শামীম আহমেদ।
বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা শেষে পরের দিন পুরোপুরি অজ্ঞান করে আয়ানের খতনা করানো হয়, আর জ্ঞান ফেরেনি। পরে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে এনে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় শিশুটিকে। ৭ জানুয়ারি রাতে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এর দুই দিন পর বাড্ডা থানায় মামলা করেন আয়ানের বাবা। এতে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবেদনবিদ (অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট) সাইদ সাব্বির আহমেদ, সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক তাসনুভা মাহজাবিন, অজ্ঞাতনামা পরিচালক, ডাক্তার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আসামি করা হয়।
ডিবি কর্মকর্তা হারুনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে আয়ানের বাবা বলেন, “ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে আমাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, থানা-পুলিশও আসামিদের গ্রেপ্তার করছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের অব্যাহতিও দেয়নি। এমন অবস্থায় আমি ডিবি কার্যালয়ে এসেছি। লিখিত অভিযোগ করব। আশা করি, আসামিদের গ্রেপ্তার করবে ডিবি।”
এ বিষয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তা হারুনের বক্তব্য জানতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
তদন্ত নিয়ে পুলিশ কী বলছে
মামলার তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে এক প্রশ্নে বাড্ডা থানার ওসি ইয়াসিন গাজী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্ত চলছে। বিভিন্ন বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে মতামত চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠির কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।”
আয়ানের মৃত্যুর আগেই বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় চলছিল। এর মধ্যে গত ৬ জানুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানাও পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুর রঊফ সবুজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে চিঠিটি দেন। এতে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়, ভুল চিকিৎসার কারণে মৃত্যু হয়েছে কি না, অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে কি না এবং চিকিৎসা প্রদানকারী চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদানে অনুমোদন ছিল কি না- এই চারটি বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়া হয়।
ওসি ইয়াসিন গাজী বলেন, “চিঠির জবাব পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
আয়ানের বাবার সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করার বিষয়ে শাহবাগ থানায় ওসি মোস্তাজিরুল রহমান কিছু বলতে পারেননি। বলেন, “এ বিষয়ে আমি অভিহিত নই।”
আয়ানের মৃত্যু নিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা
আয়ানের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন যুক্ত করে গত ৯ জানুয়ারি হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম শাহজাহান আকন্দ মাসুম।
এতে শিশুটির মৃত্যুর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়। পাশাপাশি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল এবং নতুন রোগী ভর্তি না করার নির্দেশনা চেয়ে একটি সম্পূরক আবেদনও জমা দেওয়া হয়।
গত ১৪ জানুয়ারি এই রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আয়ানের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে। পাশাপাশি দেশের সব অনুমোদিত ও অননুমোদিত হাসপাতাল-ক্লিনিকের তালিকা এক মাসের মধ্যে আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দেন বিচারকরা।
দেশে খতনা হয় কীভাবে, অজ্ঞান করা নিয়ে কী বলছেন চিকিৎসকরা
খতনা করাতে গিয়ে শিশুর মৃত্যু: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘মর্মাহত’
খতনা করাতে গিয়ে ঝরল আরেক শিশুর প্রাণ, ২ চিকিৎসক গ্রেপ্তার
খতনা করাতে গিয়ে মৃত্যু: প্রধানমন্ত্রীর ‘কড়া নির্দেশ’ পেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী