১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল: ‘বিকল্প বিমানবন্দরে’ খরচের ধাক্কায় প্রবাসীরা

উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়েই ফ্লাইট বাতিল জেনেও যাত্রীদের অনেকেই শাহজালাল বিমানবন্দরে ব্যাগ-ব্যাগেজ সমেত এসে অপেক্ষা করছেন।

গোলাম মর্তুজা অন্তু গোলাম মর্তুজা অন্তু

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 12 Oct 2026, 11:28 PM

Updated : 12 Oct 2026, 11:28 PM

সৌদি আরবে বিমানবন্দরগুলোতে ইয়েমেনের স্বশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের একের পর এক হামলার ঘটনায় বিমান চলাচল ব্যহত হওয়ায় ছুটিতে ঢাকায় এসে আটকা পড়েছেন দেশটিতে কাজ করা অনেক বাংলাদেশি। তাদের কারও ভিসার মেয়াদ শেষের পথে, কেউ কফিলের (নিয়োগদাতা) সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে পারেননি এখনো।

ফলে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়েই ফ্লাইট বাতিল জেনেও অনেকেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যাগ-ব্যাগেজ সমেত এসে অপেক্ষা করছেন।

গত শনিবার হুথিদের হামলার পর থেকে সৌদি আরবের অন্যতম রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম একেবারেই বন্ধ। তবে বাকি তিনটি শহর মদিনা, দাম্মাম ও জেদ্দার বিমানবন্দরগুলো কার্যকর রয়েছে। ফলে অনেকগুলো এয়ারলাইন্স রিয়াদের যাত্রীদের বাকি তিনটি বিমানবন্দরে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

কিন্তু টিকিট বদলে ‘বিকল্প’ বিমানবন্দরের টিকেট কাটা বিরাট খরচের ব্যাপার বলে জানাচ্ছেন যাত্রীরা।

শাহজালাল বিমানবন্দরের তথ্যানুযায়ী, সৌদির বিভিন্ন বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার ঘটনায় ঢাকা থেকে রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দাগামী অনেকগুলো ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। শনিবার থেকে আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ তিন পথে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স মোট ৫১টি ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা এসেছে। এসব ফ্লাইটের পাঁচ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী বাংলাদেশে আটকা পড়েছেন।

ঢাকা থেকে সৌদি আরবের চারটি গন্তব্যে সরাসরি ও বিরতি দিয়ে (ট্রানজিট) ফ্লাইট চলাচল করে। এরমধ্যে গত তিনদিন ধরে একেবারেই বন্ধ রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দর। তবে মদিনা থেকে ফ্লাইট চলাচল করছে ঠিকমতই। মদিনার প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ বিমানবন্দর একেবারে স্বাভাবিক। জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ বিমানবন্দর রোববার কিছু সময় বন্ধ থাকলেও সোমবার সেখানে ফ্লাইট ওঠানামা করছে।

দাম্মাম কিং ফাহাদ বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল সোমবার কিছুটা ব্যহত হয়েছে। তবে সেখানেও সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চলাচল করছে বলে বিমানবন্দরের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে।

বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে বিমান সৌদি আরবের চারটি গন্তব্যেই ফ্লাইট চালায়। বর্তমানে বিমানের রিয়াদ ছাড়া অন্য গন্তব্যগুলোতে ফ্লাইট চলছে। আর ইউএস বাংলা শুধুমাত্র রিয়াদে ফ্লাইট চালায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদের ফ্লাইট বন্ধ রাখতে হয়েছে।

সোমবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিমান বলেছে, রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানের রিয়াদগামী সকল ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।

সৌদি আরবের একটি এয়ারলাইন্সের ঢাকার এক কর্মী বলছেন, তারা রিয়াদের বাইরে বিকল্প বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। জরুরি প্রয়োজনে সেখান থেকে সড়কপথে যাত্রীদের রিয়াদ পৌঁছানোর সুযোগ থাকে।

শাহজালাল বিমানবন্দরে সোমবার সকালে কথা হয় কুষ্টিয়া থেকে আসা মো. লিখনের সঙ্গে। তার রিয়াদ যাওয়ার কথা রাত পৌনে ১১টায় সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে। কিন্তু সেই ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। তা জেনেও বিমানবন্দরে এসেছেন তিনি।

লিখন বলছেন, যে করেই হোক তাকে যেতে হবে। কারণ ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কফিলের কাছ থেকে ছুটি নেওয়া ছিল।

লিখন বলেন, তিনি সৌদি আরব থেকেই ২৩৫০ সৌদি রিয়াল (৭৭ হাজার টাকা) দিয়ে ইকোনমি ক্লাসের রিয়াদ-ঢাকা-রিয়াদ অর্থাৎ আসা-যাওয়ার টিকিট করেছিলেন। তার ফ্লাইট ক্যান্সেল হয়েছে। তিনি সৌদি আরবের যে ট্রাভেল এজেন্টের কাছ থেকে টিকিট করেছিলেন তারা জানিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র বিজনেস ক্লাসের কিছু টিকেট ফাঁকা আছে। বেশি দামে টিকেট কাটতে পারলে তাদের কাছে ‘ব্যবস্থা আছে’।

কফিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না প্রশ্নে লিখন বলেন, “কফিলের সঙ্গে যোগাযোগ হইছে। সে বলছে, অন্য ফ্লাইটে বিজনেস ক্লাসের টিকিট কাটতে। কিন্তু বিজনেস ক্লাসের টিকিটের দাম তো অনেক বেশি।”

এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে লিখন বিমানবন্দরের টার্মিনালের ক্যানোপিতে দাঁড়িয়ে বারবার একে ওকে ফোন করছিলেন। তিনি বলেন, “ভাই এখন জেদ্দা হয়ে রিয়াদে যাওয়ার অপশন দিছে, তাও বিজনেস ক্লাসে। ভাড়া আসছে সোয়া এক লাখ টাকা। আমি তো টিকিট কেটেই ফেলছি। এখন কফিল বলছে বিজনেস ক্লাসে করে যাইতে। কিন্তু সেই টাকাও তো সে দেবে না।”

বিষয়টি যাচাই করতে সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ওয়েবসাইটে গেলে দেখা যায়, ঢাকা থেকে রিয়াদের আগামী তিনদিনের মধ্যে সবচেয়ে কম দামী ওয়ানওয়ে টিকিটের দামও লাখ টাকার ওপরে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা রবিউল মিয়ার টিকিট ‘ফ্লাই দুবাই’ এয়ারলাইন্সে। দুবাইয়ে বিরতি দিয়ে আরেকটি ফ্লাইটে তার রিয়াদ যাওয়ার কথা। তবে ফ্লাই দুবাই সেই ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঢাকা থেকে দুবাইয়ে ফ্লাইট চলছে এটা জেনে তিনি বিমানবন্দর চলে এসেছেন।

রবিউল মিয়া বলেন, “ট্রেনে চলে আসছি। ফ্লাই দুবাই চলতেছে শুনছি। কিন্তু আমারে কইতেছে তোমারে ফ্লাই করতে দেবে না। এই কারণে সরাসরি এয়ারপোর্টে চলে আইছি বিষয়টা বোঝার জন্য।”

পরে ট্রাভেল এজেন্সির লোক রবিউল মিয়াকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ঢাকা থেকে দুবাই ঠিকই ফ্লাইট চলছে। তবে দুবাই থেকে রিয়াদ ফ্লাইট বন্ধ। সেই কারণে রবিউলের ফ্লাইট বাতিলের তথ্য দিয়েছে এয়ারলাইন্স।

রবিউল বলছেন, তার কফিলের সঙ্গে কথা হয়েছে। তবে কফিল ছুটি বাড়াতে চান না। আবার তাকে বলেছে পরিস্থিতি দেখতে। এরকম অস্পষ্ট নির্দেশনা পেয়ে সে বিভ্রান্ত। কারণ তার চাকরি পুরোপারি কফিলের ওপর নির্ভরশীল। কফিলকে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি বিমানবন্দরে এসে বসে আছেন কিন্তু ফ্লাইট যাচ্ছে না। কফিলের পরিষ্কার নির্দেশনা পেলে তিনি সেই অনুযায়ী কাজ করবেন।

সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে বিমানবন্দরে আসা আরও বেশ কয়েকজন যাত্রীকেও অপেক্ষমান দেখা গেল। তাদের বেশিরভাগই সৌদি থাকতেই টিকিট কেটে দেশে এসেছিলেন। এখন যাওয়ার পথে পড়েছেন বিড়ম্বনায়।

তাদের মধ্যে নাম প্রকাশ না করতে না চাওয়া এক নারী বলেন, তার দুবাই হয়ে জেদ্দার টিকিট কাটা ছিল। এখন এয়ারলাইন্স জানিয়ে দিয়েছে, কানেক্টিং ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তার আগের টিকিট বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু তিনি শুনেছেন, সোমবার দুপুরেও ঢাকা থেকে জেদ্দার ফ্লাইট ছেড়েছে। এ জন্য নিজেই এয়ারপোর্টে চলে এসেছেন।

ওই নারী বলেন, “এখন ওরা (এয়ারলাইন্স) যদি পরে টিকেট বদলে না দেয় তাইলে তো আমার বিরাট লস। দুইদিন পরে গেলেও কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু বাড়তি টাকা যেন দিতে না হয়। আমি ঢাকা ছাড়ুম না, ক্যান্টনমেন্টে ভাইয়ের বাসায় পইড়া থাকুম।”

বিকল্প বিমানবন্দরে পাঠানোর চেষ্টায় বিমান

এদিকে সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, “বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স রিয়াদের যাত্রীদের বাকি তিনটি বিমানবন্দরে পৌঁছে দিয়ে সমন্বয় করার চেষ্টা করছে।”

মন্ত্রীর সঙ্গে থাকা বিমানের এমডি ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, “সৌদিতে আমাদের ৪টি গন্তব্য আছে। ওখানে অনেক বাংলাদেশি থাকেন। এটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন দাম্মাম অথবা মদিনা, এই দুটি বিমানবন্দরে যেহেতু কার্যক্রম আছে, আমরা বলেছি বিনা খরচে তাদের (যাত্রীদের) সমন্বয় করে দেব। তারা যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে আসন পাওয়া সাপেক্ষে আমরা ব্যবস্থা করব।”

রিয়াদ বিমানবন্দরের পরিস্থিতি অনেকটা ‘অনিশ্চিত’ মন্তব্য করে বিমানের এমডি বলেন, “ওরা (সৌদি কর্তৃপক্ষ) আমাদের বলছে না যে আগামী তিন বা সাতদিন বিমানবন্দর বন্ধ। ওরা আমাদের আজকে রাত ১০টা পর্যন্ত বন্ধ বলছে, এরপর বলছে পরদিন সকাল ৭টা পর্যন্ত বন্ধ। তাই সেভাবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা পরিকল্পনা করা যাচ্ছে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি; যেভাবে পারি অন্যান্য গন্তব্যের মাধ্যমে যাত্রীদের সৌদি আরবে পৌঁছে দেওয়ার। কারও ওয়ার্ক পারমিটে সমস্যা থাকতে পারে, কারও অন্য সমস্যা থাকতে পারে।”

বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, “যাত্রীদের ভোগান্তি যাতে কম হয় সেজন্য আমরা চেষ্টা করছি। সব এয়ারলাইন্সগুলোকে যাত্রী ভোগান্তি যতটুকু সম্ভব কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ বিমানমন্ত্রী বলেন, “রিয়াদ থেকে শুধু বাংলাদেশ নয়, সমস্ত আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটা আমরাও বন্ধ করিনি। যাত্রী ভোগান্তি শুধু আমাদের নয়, সারাবিশ্বে সবার হচ্ছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে এখন অপারেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। শুধু বাংলাদেশের বিমানের ফ্লাইট বন্ধ হয়েছে, তা কিন্তু নয়। যতগুলো এয়ারলাইন্স সেখানে নামে বা ট্রানজিট করে, সব এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বন্ধ করা হয়েছে।

“আমরা কি আমাদের যাত্রীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেব, নাকি তাদের রক্ষার চেষ্টা করব? আমাদের হয়ত একটু কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তাদের নিরাপত্তাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই কষ্টের চেয়ে।”

যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ বা জরুরি প্রয়োজন এমন যাত্রীদের বিকল্প বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে তথ্য দিয়ে বিমানমন্ত্রী বলেন, “এখন দাম্মাম ও মদিনায় বিমানের ফ্লাইট যাচ্ছে। সেগুলোতে একটু রোটেট করে… যাদের ভিসা শেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের একোমোডেট করে যেন তারা তাদের কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারে।”