নিই ইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যস্ত দিন
প্রধানমন্ত্রী বুধবার টেকসই আবাসন বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন এবং গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপের সভায় অংশ নেন।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেকসই আবাসন বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের সভায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বৈঠক ও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ‘ব্যস্ত দিন’ কাটিয়েছেন বুধবার।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেছেন, নিউ ইয়র্কে পৌঁছানোর পর প্রথম দিনের মত প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় দিনটিও কেটেছে নির্ধারিত নানা আয়োজনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে।
বুধবার রাতে নিউ ইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারপ্রধানের সারা দিনের ব্যস্ততার বিবরণ তুলে ধরেন মোমেন।
তিনি বলেন, বুধবার সকালে টেকসই আবাসন বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ, বতসোয়ানা, স্লোভাক রিপাবলিক এবং ইউএন হ্যাবিট্যাট যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
টেকসই আবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মোমেন বলেন,“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। যার মধ্যে রয়েছে- গৃহহীন ও ভূমিহীন জনগণের জন্য টেকসই আবাসন প্রদানের লক্ষ্যে গৃহীত ‘আশ্রয়ন প্রকল্প’, গ্রামীণ জনগণের উন্নয়নের জন্য ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ উদ্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুতদের জন্য আবাসনের উদ্যোগ, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি ব্যবস্থাপনার সংস্কার ইত্যাদি।”
গত দুই বছরে বিনামূল্যে ২ লাখ ১৪ হাজার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারে হাতে ঘর তুলে দেওয়ার বিষয়টিও শেখ হাসিনা এ সভায় বলেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মহাপরিচালক, ইউএন হ্যাবিট্যাট এর নির্বাহী পরিচালক, ভারত, মালাউয়ি, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএন ডেসা, ইউনিসেফসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন এ অনুষ্ঠানে।
মোমেন জানান, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মহাপরিচালক এবং ইউএন হ্যাবিট্যাটের নির্বাহী পরিচালক তাদের বক্তব্যে গৃহায়নের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সাফল্যের ‘ভূয়সী প্রশংসা’ করেন।
“জাতিসংঘের নিউ আরবান এজেন্ডা বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার বিষয়ে বাংলাদেশসহ উপস্থিত সকল পক্ষ সভায় ঐকমত্যে পৌঁছায়।”
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নির্বাহী চেয়ারম্যান ক্লাউস সোয়াব এদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে উন্নয়নশীল দেশগুলো খাদ্য ও জ্বালানি সংকটসহ আর্থিক ও বাণিজ্যিক দিক দিয়ে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, সে বিষয়ে বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলাসহ বাণিজ্যের প্রসারের বিষয়ে বাংলাদেশ ও ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের মধ্যে সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন।”
ক্লাউস সোয়াব আসছে জানুয়ারিতে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানান।
প্রধানমন্ত্রী এদিন গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপের উচ্চ পর্যায়ের সভাতেও অংশ নেন। জাতিসংঘ মহাসচিব, জার্মানির চ্যান্সেলর, সেনেগালের প্রেসিডেন্ট, আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট, বারবাডোসের প্রধানমন্ত্রী এবং ইন্দোনেশিয়া ও ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও অংশগ্রহণ করেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন।
তিনি বলেন, “আপনারা জানেন যে, এ বছরের মার্চে জাতিসংঘ মহাসচিব খাদ্য, জ্বালানি ও আর্থিক বিষয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ছয়টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানদের সমন্বয়ে এই গ্রুপটি গঠন করেন। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি বিরল সম্মান।“
সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ ও কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে তৈরি হওয়া সংকট কোনো দেশের পক্ষে এককভাবে মোকাবিলা করা কঠিন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী এই সভায় বৈশ্বিক বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করা, নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অধিক কার্যকরভাবে খাদ্য সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান।
“সেই সাথে তিনি বৈশ্বিক আর্থিক সংকট মোকাবিলায় জি-৭, জি-২০, ওইসিডি, আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংকে আরো জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানান। এছাড়া বাংলাদেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এবং মূ্ল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার যেসব সুনির্দিষ্ট রাজস্ব ও আর্থিক নীতি নিয়েছে, সেগুলো প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে তুলে ধরেন।
“প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বব্যাপী উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারটি তুলে ধরেন।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী মূলত তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিশ্বে শান্তির জন্যে জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সবাইকে ধন্যবাদ দেন এবং বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাদের জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সদরদপ্তরে পদ্মা বহুমুখী সেতু নিয়ে আয়োজিত আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এদিন তিনি স্লোভেনিয়ার প্রেসিডেন্ট বরুত পাহোর এবং একুয়েডরের প্রেসিডেন্ট গুইলারমো লাসোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নেন।
পাশপাশি স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ এবং উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য জাতিসংঘের প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা এদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
