Published : 14 Oct 2023, 05:22 PM
ভেষজ চিকিৎসার মিথ্যা আশ্বাসে আশুলিয়ার পোশাককর্মী দম্পতি মোক্তার হোসেন ওরফে বাবুল ও শাহিদা বেগমের বাসায় গিয়েছিলেন সাগর আলী ও তার স্ত্রী ঈশিতা বেগম। উদ্দেশ্য ছিল, তাদেরকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে মালামাল লুট করবেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত টাকা না পেয়ে মোক্তার-শাহিদার সঙ্গে তাদের ১২ বছর বয়সী ছেলের গলা কাটেন।
সাগর ও ঈশিতাকে গ্রেপ্তারের পর তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাতে এমনটাই জানিয়েছে র্যাব।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব সদরদপ্তরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
র্যাব-৪ এর একটি দল সোমবার রাতে গাজীপুরের শফিপুর এলাকার সাগর-ঈশিতাকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় নিহত মোক্তারের কাছ থেকে লুট করা আংটি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাভারের আশুলিয়া জামগড়া এলাকার একটি ভবনের ৪র্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে মোক্তার, তার স্ত্রী শাহিদা ও তাদের ১২ বছরের সন্তান মেহেদী হাসান জয়ের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
মোক্তার ও শাহিদা আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তার মেহেদী স্থানীয় একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
তিন খুনের ঘটনায় আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা হয়।
র্যাব কর্মকর্তা খন্দকার মঈন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দম্পতি র্যাবকে জানিয়েছেন, প্রথমে অর্থের লোভে ও পরে কাঙ্ক্ষিত অর্থ না পেয়ে ক্ষোভ থেকে তাদের হত্যা করা হয়।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত ২৮ সেপ্টেম্বর সাগর সাভার বারইপাড়া এলাকার একটা চায়ের দোকানে চা খাওয়ার সময় মোক্তারকে পাশের একটি ভেষজ ওষুধের দোকানে তার চিকিৎসার বিষয় নিয়ে কথা বলতে দেখেন।
কমান্ডার মঈন বলেন, “সাগর জানতে পারে, মোক্তার ওই দোকানে চিকিৎসা বাবদ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করেও কোনো ফলাফল পাননি। পরে সাগর কৌশলে মোক্তারকে ডেকে নিয়ে কথা বলে ভেষজ চিকিৎসার প্রতি তার আস্থার কথা জানতে পারে। মোক্তার নিজের ও তার পরিবারের সদস্যদের কিছু শারীরিক সমস্যার কথাও সাগরকে জানান।
“সাগর জানায়, তার স্ত্রী একজন ভালো কবিরাজ এবং সে তার সমস্যার সমাধান করে দেবে। এমন মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এক পর্যায়ে ৯০ হাজার টাকার চুক্তি করে। সাগর ও তার স্ত্রী পরদিন (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে ওষুধসহ তার বাসায় গিয়ে চিকিৎসা করবে বলে জানায়। যোগাযোগের জন্য মোক্তারকে নিজের নম্বর না দিয়ে এক আত্মীয়ের মোবাইল নম্বর দেয় সাগর।”
র্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, পরে সাগর ও ঈশিতা পরিকল্পনা করেন, মোক্তারের বাসায় গিয়ে চিকিৎসার কথা বলে পরিবারের সবাইকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে তাদের অর্থসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সাগর গাজীপুরের মৌচাক এলাকার একটি ফার্মেসি থেকে এক বাক্স ঘুমের ওষুধও কিনেন।
“২৯ সেপ্টেম্বর সকালে সাগর ও ঈশিতা জামগড়া মোড়ে মোক্তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার বাসায় যায়। সেখানে ঈশিতা তাদের সমস্যার কথা শুনে ইসবগুলের শরবতের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে ভেষজ ওষুধ বলে খাওয়ায়।”
কমান্ডার মঈন বলেন, “মোক্তার, তার স্ত্রী ও ছেলে ঘুমিয়ে পড়লে সাগর ও ঈশিতা প্রথমে মোক্তারের কক্ষে গিয়ে তার ও পরে শাহিদার হাত-পা বাঁধে। তারা মোক্তারের মানিব্যাগ, তার স্ত্রীর পার্স ও বাসার বিভিন্ন স্থানে খুঁজে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বটি দিয়ে প্রথমে মোক্তারের গলায় উপর্যুপরি কোপ দিয়ে হত্যা করে সাগর। পরে অন্য কক্ষে গিয়ে একই কায়দায় শাহিদা ও মেহেদীকেও হত্যা করে।"
পালানোর আগে তারা মোক্তারের হাত থেকে আংটি খুলে নেন জানিয়ে র্যাব কর্মকর্তা মঈন বলেন, “সাগর স্ত্রীকে নিয়ে ভিন্ন পথে রিকশায় গাজীপুরের মৌচাকে শ্বশুরবাড়িতে যায়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রচারের পর তারা আত্মগোপনে চলে যায়। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায়ই শফিপুর থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২০ সালে একই কায়দায় টাঙ্গাইলে চারজনকে হত্যা করেন সাগর
সাগর সম্পর্কে কমান্ডার মঈন বলেন, “সে মাদকাসক্ত এবং বিভিন্ন পেশার আড়ালে চুরি ও ছিনতাই করত বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। ২০২০ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে ২০০ টাকার জন্য একই পরিবারের চারজনকে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে একই কায়দায় গলা কেটে হত্যার ঘটানায় অভিযুক্ত সাগর।”
ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাগর র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে সাড়ে তিন বছর কারাভোগের এ বছরের জুনে জামিনে বেরিয়ে শ্বশুরের ভাড়া বাসায় কিছুদিন অবস্থান করেন। আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় রাজমিস্ত্রি, কৃষি শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার আড়ালে ঢাকা, সিলেট ও টাঙ্গাইলে অবস্থান করে সুযোগ বুঝে চুরি ও ছিনতাই করতেন বলে জানান কমান্ডার মঈন।
গ্রেপ্তার দম্পতির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন র্যাবের এ কর্মকর্তা।
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ৩ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে: