১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশে পাকিস্তান সরকারের বৃত্তিতে ‘প্রতারণা’

যেসব সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল সেগুলো না দেওয়ায় কয়েকজন শিক্ষার্থী সুযোগ পাওয়ার পরও না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 17 Sep 2026, 09:28 PM

Updated : 17 Sep 2026, 09:28 PM

বিজ্ঞাপন দেওয়া হল ভর্তি নেওয়া হবে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি কোর্সে; বৃত্তির আওতায় থাকবে সম্পূর্ণ টিউশন ফি, মাসিক খরচের ভাতা, হোস্টেল চার্জ, বিমানের রিটার্ন টিকেট এবং ভর্তি হওয়া প্রতিষ্ঠানে ওঠার জন্য এককালীন ভাতা।

কয়েক মাসের বাছাই প্রক্রিয়া শেষে যখন ভর্তি নিশ্চিত করার তথ্য চেয়ে ইমেইল এল, তখন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা জানলেন, তাদের বৃত্তির আওতায় শুধু থাকবে টিউশন ফি ও আবাসন। কারও কারও জন্য আবাসনেরও সুযোগ নেই।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পাকিস্তান সরকারের বৃত্তি কর্মসূচিতে এমন ‘প্রতারণার’ অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। ওই শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ নিয়েছেন না যাওয়ারই সিদ্ধান্ত।

বিষয়টি আলোচনায় আসার পর বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ঢাকায় পাকিস্তানের হাই কমিশন বলেছে, আল্লামা ইকবাল বৃত্তিতে মাস্টার্স ডিগ্রির ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা বন্টনের পদ্ধতি যে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে, সেটা তাদেরকে জানানো হয়েছে।

“তবে, এই কর্মসূচির অধীনে যাওয়া সব যোগ্য শিক্ষার্থীকে সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।”

পাকিস্তান সম্পূর্ণ বৃত্তি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ বছরে ৫০০ শিক্ষার্থী নেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোরের’ ঘোষণা দেয় ২০২৫ সালের অগাস্টে।

পাকিস্তান সরকারের ‘আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল স্কলারশিপ’ কর্মসূচির আওতায় তাদের সম্পূর্ণ খরচ বহন করার কথা।

এ বছর ভর্তির জন্য নির্বাচিত হওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, “এটা এক ধরনের প্রতারণা। অ্যালাউন্স যেগুলো দেওয়ার কথা, সেগুলো যদি মাস্টার্সের স্টুডেন্টরা না পায়, সেটাতো তারা আগে বলেনি। প্রসেসের প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে বলেছে।”

‘পাক-অস্ট্রিয়া ফাখোখশুলে: ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজিতে’ (পিএএফ-আইএএসটি) ডেটা সায়েন্সে স্নাতকোত্তরে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

ওই শিক্ষার্থী বলেন, ২০২৫ সালে প্রথম যখন এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশ থেকে প্রথম ৭৪ শিক্ষার্থী নেওয়া হয়, তখন সেখানে কেবল স্নাতক ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ছিলেন। এবার সেখানে মাস্টার্স যুক্ত হয়েছে।

“প্রথম বছর যারা গিয়েছে, তাদেরটা ভালোভাবে গেছে। এবারও ব্যাচেলর এবং পিএইচডিতে কোনো সমস্যা হয়নি। তারা যাচ্ছেন।”

ওই শিক্ষার্থী বলেন, আইইএলটিএসের প্রয়োজন না পড়া এবং ডকুমেন্টশনে জটিলতা কম হওয়ায় তিনি আবেদন করেছেন। জুনে বাছাই পরীক্ষার পর অগাস্টের শেষ দিকে কনফার্মেশন চেয়ে মেইল করা হয়েছিল।

“আমার বাছাই পরীক্ষা বেশ ভালো হয়েছে। পাস করেছি। ওই বৃত্তির অধীনে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আছে ওইগুলোর বেশ কয়েকটা বেশ ভালো র‍্যাংকিংয়েও আছে।”

কনফার্মেশন চেয়ে আসা ইমেইলে আগে ঘোষিত সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে কোনো মিল না পাওয়ায় হতাশ হওয়ার কথা বলছেন ওই শিক্ষার্থী। সেখানে তিনি দেখতে পান, বৃত্তির মধ্যে কেবল শতভাগ টিউশন ফি এবং আবাসন সুবিধার কথা আছে।

কারও কারও ক্ষেত্রে আবাসন সুবিধা না থাকার কথা তুলে ধরে ধরে ওই শিক্ষার্থী বলেন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে হল বা হোস্টেল নেই, সেখানে আবাসন সুবিধাও দেওয়া হয়নি। কেবল টিউশন ফি মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানের উচ্চ শিক্ষা কমিশন (এইচইসি) থেকে পাওয়া ইমেইলের জবাবে বিজ্ঞাপনে ঘোষিত সুযোগ সুবিধার দেওয়া হবে কি-না জানতে চান ওই শিক্ষার্থী।

এর জবাবে কেবল টিউশন ফি মওকুফ এবং আবাসন সুবিধা নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয় তাকে। সে কারণে পাকিস্তানে এখন আর পড়তে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন ওই শিক্ষার্থী।

আরেকজন শিক্ষার্থী বলেছেন, লিখিত যোগ্যতা পরীক্ষার পর অফার লেটারে তিনি দেখতে পান কেবল শতভাগ টিউশন ফি মওকুফের কথা।

তার মানে, চিঠিতে বলা হচ্ছে, আবাসন, জীবনযাপনের ব্যয়, যাতায়াত, ভিসা ফি, মেডিকেল ইন্সুরেন্স এবং বিমান ভাড়া- সবকিছু খরচ নিজেকে দিতে হবে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে ব্যাপক বৃষ্টি ও যানজট পেরিয়ে ওই যাচাই পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন কেবল এই জন্য যে, এটাকে সম্পূর্ণ ফান্ডেড হিসাবে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল।

“যদি আমরা শুরু থেকে জানতাম, শুধু টিউশন ফি দেওয়া হবে, তাহলে আমাদের অনেকে আবেদনেই করতাম না। সময়, শক্তি আর অর্থ অপচয় করে শেষমেশ জানতে পারলাম, একটা বিভ্রান্তিকর অফারের পেছনে এতদিন দৌড়ালাম।”

যা বলছে পাকিস্তান হাই কমিশন

বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বাস্তবতার মিল না রাখার এমন কাণ্ড নিয়ে সমালোচনার মধ্যে একটা বক্তব্য দিয়েছে ঢাকা পাকিস্তান হাই কমিশন।

এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, আল্লামা ইকবাল বৃত্তিতে মাস্টার্স ডিগ্রির ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা বন্টনের পদ্ধতি যে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে, সেটা তাদেরকে জানানো হয়েছে।

“তবে এই কর্মসূচির অধীনে যাওয়া সব যোগ্য শিক্ষার্থীকে সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।”

হাই কমিশন বলছে, ২০২৫ সালের অগাস্টে ঢাকা সফরে এসে ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোরের’ যে ঘোষণা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার দিয়েছিলেন, তার ‘প্রধান উপাদানেই’ হচ্ছে আল্লামা ইকবাল বৃত্তি।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশর মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতার প্রসার ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, “গত বছর প্রথম ব্যাচে ৭৪ জন শিক্ষার্থী যাওয়ার মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি সফলতার সঙ্গে তার উদ্দেশ্যের দিকে যাত্রা করছে।

“দ্বিতীয় ব্যাচে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তিন হাজার শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে স্নাতক কোর্সে ১২৫ জন, মাস্টার্সে ২২ জন এবং পিএইচডিতে ১৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সারার পরপরই সব শিক্ষার্থী পাকিস্তানের নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ দেবেন।”

মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞাপন অনুযায়ী সবগুলো সুবিধা পাবে কি-না, এ বিষয়ে হাই কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তবে এখনও সাড়া পাওয়া যায়নি।