Published : 16 Sep 2026, 06:46 PM
নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’বইয়ে আগামী শিক্ষাবর্ষে যুক্ত হচ্ছে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’। তাতে থাকছে তার লেখা ডায়েরির পৃষ্ঠার একটি ছবিও।
গত ২৪ অগাস্ট জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে বাসসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাসসকে বলেন, “আগামী বছরের শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এনসিসিসি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে।
“যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।”
এনসিটিবির বরাতে বাসস লিখেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যপুস্তকে নতুন ‘অধ্যায়’ হিসেবে নিবন্ধটি স্থান পাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম স্মৃতিকথা হিসেবে সেটিকে পাঠ্যভুক্ত করতে চূড়ান্ত সায় দিয়েছে এনসিসিসি।
এ বিষয়ে জাতীয় ড. মাহবুব উল্লাহ বাসসকে বলেন, “জিয়াউর রহমানের লেখা এই নিবন্ধে ঐতিহাসিক মূল্য আছে।
“এর মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতার সংগ্রাম সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে। পাঠ্যবইয়ে এটি অন্তর্ভুক্ত করা যৌক্তিক।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বাসসকে বলেন, “এই নিবন্ধ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ ঘটনা জানার সুযোগ পাবে।
“অতীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে যেভাবে একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চা করা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নির্মোহ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরার দৃষ্টিভঙ্গি সেই মানসিকতার অবসান ঘটাবে।”
১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সম্মুখসমরের আত্মত্যাগের কথা উঠে এসেছে নিবন্ধটিতে।
মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র দায়িত্ব গ্রহণের অনুভূতির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, “সবাই আমরা যুদ্ধ করেছি। সৈনিক, জনগণ সবাই। জাতির চরম সংকটের মুহূর্তে কাউকে না কাউকে সামনে এগিয়ে আসতে হয়। নিতে হয় দায়িত্ব। আমি কেবল সেই দায়িত্ব পালন করেছি।
“নেতারা যখন উধাও হয়ে গেল—সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ থাকল না, তখন জাতির পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত আমাকে ঘোষণা করতে হলো... ২৬শে মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে সেই চূড়ান্ত সময়টি এলো। যার জন্য গোটা মাস আমরা রুদ্ধশ্বাস হয়ে প্রতীক্ষা করছিলাম।”
চট্টগ্রামে পাক বাহিনীর ষড়যন্ত্র অনুধাবন এবং একাত্তরের পহেলা মার্চ থেকে শুরু হওয়া সন্দেহজনক গতিবিধির বিবরণ দিয়ে মেজর জিয়া লিখেছে, “১লা মার্চ থেকে ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের রহস্যজনক গতিবিধি থেকে আমরা সুস্পষ্ট আঁচ করতে পারছিলাম কী ঘটতে যাচ্ছে... ১৩ই মার্চ নেতাদের সঙ্গে ইয়াহিয়ার গোলটেবিল বৈঠক শুরু হলো।
“এর মধ্যেই পাকিস্তানি জেনারেলরা একের পর এক বিমানে আসতে লাগলেন... এ ছিল সর্বাত্মক হামলার এক ভীতিকর পূর্বাভাস... দ্রুত ঘনিয়ে এলো পঁচিশ-ছাব্বিশের সে রাতটি।
“রাত ১১টায় চট্টগ্রাম বন্দরে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করার জন্য ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার আমার কাছে নির্দেশ পাঠালেন। নৌ-বাহিনীর একটি ট্রাক পাঠানো হলো আমাকে এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য...।”
নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, “আগ্রাবাদের এক ব্যারিকেডের সামনে ট্রাক থেমে গেল...ঠিক সে সময়ে মেজর খালিকুজ্জামান সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করলেন। অনুচ্চস্বরে বললেন, ওরা ক্যান্টনমেন্টে হামলা শুরু করেছে। শহরেও অভিযান চালিয়েছে। হতাহত হয়েছে বহু নিরীহ মানুষ।
“যে সময়ের জন্য এতদিন অপেক্ষা করছিলাম, সে সময় এসে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম, ‘উই রিভোল্ট’। নির্দেশ দিলাম, ষোলশহরে ছুটে যাও। পাকিস্তানি অফিসারদের আটক করো। যুদ্ধের জন্য তৈরি করে রাখো ব্যাটালিয়নের সবাইকে।”
১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয় ‘একটি জাতির জন্ম’। ছবি: সংগ্রামের নোটবুক
এনসিটিবির বরাতে বাসস জানিয়েছে, নিবন্ধটির বর্ণনা শুরুর আগে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ১৯৭২ সালে ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ এবং ১৯৮০ সালে অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ দুটিকে মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল হিসেবে বর্ণনা করে এ ব্যাখায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব নয়।
“এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অনিবার্য নাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।”