০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

এক জুলাই শহীদের মৃত্যুতে দুই থানায় মামলা, একটিতে অভিযোগের ‘প্রমাণ মেলেনি’

তদন্তে পুলিশ বলছে, নাজমুল আশুলিয়ায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তার পরিবারের করা মামলাটির তদন্ত চলছে।

মামুন খান

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Nov 2026, 09:15 AM

Updated : 08 Nov 2026, 09:15 AM

জুলাই আন্দোলনের সময় আশুলিয়ায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া পোশাক শ্রমিক নাজমুল মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবার মামলা করেছিল আশুলিয়া থানায়।

এর প্রায় এক বছর বাদে একই মৃত্যু ঘিরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৯৩ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন গাজী সেলিম নামে এক ব্যক্তি।

মোহাম্মদপুর থানার তদন্তে উঠে এসেছে, নাজমুল আশুলিয়ায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তার পরিবারের করা মামলাটিও আশুলিয়া থানায় তদন্তাধীন।

তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, গাজী সেলিমের করা মামলার অভিযোগের পক্ষে কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাদীকে খুঁজেও পাওয়া যায়নি।

এ অবস্থায় শেখ হাসিনাসহ ৩৯৩ জন এবং এ মামলায় গ্রেপ্তার ১১ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে গত ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন মোহাম্মদপুর থানার এসআই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর বলেন, “বাদীর অভিযোগের সত্যতা মেলেনি, এজন্য আসামিদের অব্যাহতির আবেদন করে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছি। এ ঘটনায় ভিকটিমের পরিবার আশুলিয়া থানায় মামলা করেছে। ওই মামলার তদন্ত চলছে।”

এসআই ইলিয়াস বলেন, “মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর থেকে বাদীকে খুঁজছি, নোটিসও দিয়েছি। কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা আমাদের মত আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। পরবর্তী বিষয় আদালত দেখবেন।”

অনেক মামলায় এমন জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলেও জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।

অব্যাহতির সুপারিশ করা অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আওয়ামী লীগ নেতা অজয় কর খোকন ও লাবনী চৌধুরী।

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান জানান, ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে আগামী ১৭ নভেম্বর এ মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।

তদন্ত প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার প্রতিবেদনে বলেছেন, নাজমুল মিয়া গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা। তার মৃত্যুর ঘটনায় মা গোলেভান বেগম আশুলিয়া থানায় মামলা করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজী সেলিমের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টার মধ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার সলিমুল্লাহ রোডের মাথায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে আসামিরা নাজমুলকে গুলি করে হত্যা করেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো বস্তুনিষ্ঠ সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তদন্তে জানা যায়, নাজমুল ৪ অগাস্ট আন্দোলনে অংশ নিয়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে আশুলিয়া থানার বগাবাড়ী বাইপাইল মোড়ে দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে মারা যান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নাজমুলের পরিবারের কাউকে না জানিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও গাজী সেলিম ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে’ তার নাম ব্যবহার করে আদালতে মামলার আবেদন করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, নাজমুলের মা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা গাজী সেলিমকে চেনেন না। তিনি তাদের আত্মীয়ও নন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আশুলিয়া থানায় যোগাযোগ করে নাজমুলের জুলাই যোদ্ধার গেজেট, জন্মনিবন্ধন ও মেডিকেল কেস আইডি যাচাই করা হয়। তাতে দেখা যায়, গোলেভান বেগমের করা আশুলিয়া থানার মামলার নিহত ব্যক্তি এবং মোহাম্মদপুর থানার মামলার নিহত ব্যক্তি একই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজী সেলিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার সাক্ষীসহ থানায় হাজির হতে নোটিস পাঠানো হয়েছিল। তবে তারা থানায় হাজির হননি।

নাজমুলের পরিবারের সদস্য না হওয়া এবং আশুলিয়া থানার মামলার তদন্তে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মোহাম্মদপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাননি বলে প্রতিবেদনে বলেছেন।

পরিবারের ভাষ্য

নাজমুলের বোনের স্বামী আব্দুল মজিদ বলেন, নাজমুল আশুলিয়ার জামগড়ার সিএম গার্মেন্টে চাকরি করতেন। তিনি কখনো মোহাম্মদপুরে থাকেননি বা আন্দোলনের সময় সেখানে যাননি।

তিনি বলেন, “নাজমুল আশুলিয়ায় মারা যান। আমরা আশুলিয়া থানায় মামলা করেছি। আমাদের মামলাটা সঠিক।

“আর কেউ মামলা করে থাকলে ওইটা ভুয়া। হয়তো ফায়দা নিতে মামলা করেছে। আর যিনি মামলা করেছেন তাকে আমরা চিনি না।”

নিজেদের করা মামলাটি সঠিক দাবি করে আব্দুল মজিদ নাজমুল হত্যার বিচার চান।

আশুলিয়া থানার মামলায় ৫২ জনকে আসামি করা হলেও সেখানে শেখ হাসিনার নাম নেই।

এ বিষয়ে আব্দুল মজিদ বলেন, “সব মামলায় তো তাকে আসামি করা হয়েছে। এক মামলায় সাজা হলে যে কথা, একাধিক মামলায় সাজা হলেও সেই কথা। আর তিনি তো দেশের বাইরে আছেন। তাকে কি ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করতে পারবে?

“আমরা যে ৫২ জনের নামে মামলা করেছি, তারা ঘটনার সাথে জড়িত। কারণ আমি তখন আশুলিয়াতে থাকতাম। আমাদের মামলার ৫২ আসামির বিচার তো হোক আগে। ছেলের হত্যাকারীদের বিচারের আশায় আছেন শাশুড়ি মা।”

মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি পাওয়ার কথাও জানান আব্দুল মজিদ।

তিনি বলেন, “মোবাইলে আমাকে মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। মামলা না তুলে নিলে আমাকে মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেয়। গাজী সেলিম মামলা তুলে নিতে হুমকি দিয়েছিলেন হয়তো। কারণ তিনি ফায়দা নিতে চেয়েছিলেন হয়তো।”

এ বিষয়ে লাবনী চৌধুরীর আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী বলেন, “এমন অনেক মামলা হয়েছে, যা ঘটেনি। আবার একই ঘটনায় দুই মামলাও হয়েছে। ভালোভাবে যাচাই না করে যাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তার ভুক্তভোগী হচ্ছেন। যাচাই না করে যে বিজনেস চলছে, এর দায় সরকারেরও।

“এ ধরনের মামলায় পর্যাপ্ত তদন্ত করে আসামি গ্রেপ্তার করা উচিত। না হলে অনেকেই অনেকেই ভুক্তভোগী হবেন। আর আদালতেও এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত। যে কেউ এসেই যে মিথ্যা মামলা করে পার পেয়ে না যায়।”

দুই মামলায় দুই জায়গার কথা

গাজী সেলিমের মামলায় বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নাজমুলও আন্দোলনে অংশ নেন। এ সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণ হলে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ অগাস্ট তাঁর মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে নাজমুলের মা গোলেভান বেগমের আশুলিয়া থানার মামলায় বলা হয়, নাজমুল আশুলিয়ার জামগড়ায় থেকে শিমুলতলা সিএনকে হেডওয়্যার লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। জুলাই আন্দোলনের সময় ৪ অগাস্ট বগাবাড়ী বাইপাইল এলাকায় আন্দোলনে অংশ নিলে তার তলপেটে গুলি লাগে। তিনি সেখানেই পড়ে থাকেন।

পরে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে জামগড়া নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ অগাস্ট তার মৃত্যু হয়।

নিহত নাজমুল গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর থানার নরপুর গ্রামের মৃত হামিদুলের ছেলে।

আর মোহাম্মদপুরের মামলার বাদী গাজী সেলিম নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার গোদনাইল সৈয়দপাড়ার দ্বীন মোহাম্মদ গাজীর ছেলে।