Published : 13 Aug 2025, 02:06 PM
শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় শেষ বিদায় জানানো হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ- ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহফুজা খানমকে।
বুধবার ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মাহফুজা খানমের দীর্ঘদিনের সহকর্মী, স্বজন, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোদ্ধাসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এসেছিলেন মাহফুজা খানমকে বিদায় জানাতে।
শুরুতে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড় অব অনার প্রদান করা হয়। বিউগলে বেজে ওঠে করুন সুর, পালন করা হয় নীরবতাও।
ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে মাহফুজা খানমের স্মৃতি বিজড়িত সংগঠন খেলাঘর, ছাত্র ইউনিয়ন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিক সোসাইটিসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। এসেছিলেন রাজনীতিকরাও।
তাদের ভাষ্য মাহফুজা খানম তার বিস্তৃত কাজের পরিধির মাধ্যমেই মানুষের মাঝে বেঁচে রইবেন। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা এই মানুষটি সকল পক্ষের মানুষের আশ্রয় হয়ে ছিলেন বলেও জানিয়েছেন তার সতীর্থরা।

মঙ্গলবার সকালে অসুস্থবোধ করায় তাকে পান্থপথের হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
তিনি ঢাকার ইন্দিরা রোডে স্বামী সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের সঙ্গে থাকতেন। মাহফুজা-শফিক দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে ও মেয়ে পেশায় চিকিৎসক। ছোট ছেলে মাহবুব শফিক একজন আইনজীবী।
এত বড় মহীরুহকে নিয়ে বলা খুব কঠিন
শহীদ মিনারে মায়ের অবদান নিয়ে মাহবুব শফিক বলেন, “মা আমার বাবাকে সব সময় এগিয়ে দিয়েছেন, আমাদের এগিয়ে দিয়েছেন। মায়ের সহযোগিতা না পেলে বাবা কিংবা আমাদের এই অবস্থানটা হত না। বাবা যে আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা মাকে ছাড়া সম্ভব হত না। আমরা ভাই-বোনেরা ডাক্তার হয়েছি ব্যারিস্টার হয়েছি, তা মায়ের জন্যই।"

মাহফুজা খানমের ভাই মোস্তফা কামাল বলেন, "এখানে এসে প্রথম উপলব্ধি করলাম যে তিনি কত কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কত সংগঠন আর মানুষ তাকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছে।"
শ্রদ্ধা জানাতে এসে ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "মাহফুজা আপা এত বড় মহীরুহ ছিলেন যে তাঁকে নিয়ে বলা খুব কঠিন। তিনি আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। তিনি আমাকে মায়ের মত, বড় বোনের মতো স্নেহ করতেন। মাহফুজা আপার সামনাসামনি কখনো এভাবে বলিনি।"
মাহফুজা খানমের চলে যাওয়ার বেদনা নিয়ে শহীদ মিনারে তিনি এসেছেন জানিয়ে মান্না বলেন, "তার মৃত্যুর খবর জানার পর ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলাম, সেই কষ্ট নিয়েই এখানে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। আমিও ডাকসুর ভিপি ছিলাম। তিনি যেভাবে সবাইকে কাছে টানতে পারতেন, তা বিরল। মাহফুজা আপা আমাদের মাঝে চির জাগরুক থাকুক।"

অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ মনে করেন মাহফুজা খানম বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমরা কেউ তাঁকে এখানে শ্রদ্ধা জানাতে না আসলেও, তিনি অগণিত মানুষের মনে-হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। এত বড় তার কাজের পরিধি, সেসব কাজের মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন।"
ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ জাসদের নেতা ডা. মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "মাহফুজা আপার সঙ্গে যোগাযোগ তো অনেক বছরের। যখন ছাত্র আন্দোলন করেছি, তখন নানা বিষয়ে পরামর্শ নিতে মাহফুজা আপার কাছে যেতাম। তিনি যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সামনে থেকেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন।
"কোভিডের সময় তিনি আমাকে এশিয়াটিক সোসাইটিতে একটা সেমিনারে প্রবন্ধ পড়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এরপরও নানা সময় দেখা হয়েছে। এমন একটা মানুষ হঠাৎ করে চলে যাবেন, মানতে কষ্ট হচ্ছে।"
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "মাহফুজা খানম নানা পরিচয়ে উজ্জ্বল। তিনি পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও প্রগতিশীল চর্চায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি শিশু কিশোরদের সংগঠনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন।

"আমি মনে করি জাতি তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে এবং নতুন প্রজন্ম তাঁর থেকে শিক্ষা নিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবেন।"
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "মাহফুজা খানম ছিলেন প্রগতিশীল এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ। তিনি নির্দিষ্ট কোনো গোত্রের মধ্যে ছিলেন না। মানুষের প্রগতিশীল লড়াইয়ের সকল পক্ষের মানুষেরই আশ্রয়।"
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে- উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, কচিকাঁচার মেলা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, গেরিলা ১৯৭১, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ঐক্য ন্যাপ, নারী প্রগতি সংঘ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, বাংলাদেশ জাসদ, গণফোরাম, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ, শান্তি পরিষদ, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, ক্ষেত মজুর সমিতি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, ছাত্র ইউনিয়ন।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মরদেহ নেওয়া হয় ডাকসু ভবনের সামনে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ডাকসুর সাবেক নেতা এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা।

এসময় বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, "ডাকসুকে এক সময় বলা হত দ্বিতীয় পার্লামেন্ট। মাহফুজা খানম এই ডাকসুর ভিপি ছিলেন।"
ডাকসুর যে সংগ্রামের ঐতিহ্য, তা সমুন্নত রাখতে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
পরে মাহফুজা খানমের মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে, সেখানে জানাজার পর তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করার কথা রয়েছে।
মাহফুজা খানম ১৯৬৬-৬৭ ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ভিপি হয়েছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৬ সালে স্নাতক ও পরের বছর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৬৮ সালে লন্ডনের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পেলেও রাজনৈতিক কারণে তখন তাকে পাসপোর্ট দেয়নি পাকিস্তান সরকার।
বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করা মাহফুজা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্যও ছিলেন তিনি।
মাহফুজা বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে সাধারণ সম্পাদক এবং জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন খেলাঘর আসরের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেছেন।
শিক্ষায় বিশেষ অবদান রাখায় ২০২১ সালে একুশে পদক পান অধ্যাপক মাহফুজা।