Published : 17 Oct 2025, 03:39 AM
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ‘ওয়াশিং মেশিনের’ মত ব্যবহার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
তিনি বলেছেন, “চরম পর্যায়ের অরাজকতা ছিল সবখানে। এতটাই অরাজকতা ও অনাচারে ভরে গিয়েছিল যে, সরকার পতনের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব ও সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত পর্যন্ত পালিয়ে গেছেন।
“আগের সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনকে ওয়াশিং মেশিনের মত ব্যবহার করেছে। এখন আর সেই দিন নেই। কেউ দুর্নীতি করতে চাইলেও সহজ হবে না। দুর্নীতি করা কঠিন হবে। এজন্য দেখছেন কেউ (সরকারি আমলা) ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।”
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সূচক প্রকাশ অনুষ্ঠানে দুর্নীতির বিষয়গুলো তুলে ধরে এসব কথা বলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা।
অনুষ্ঠানে ব্যবসার পরিবেশ ও নতুন বিনিয়োগের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ সরকারি দপ্তরে দুর্নীতিকে বাধা হিসেবে তুলে ধরে বক্তব্য দেন ব্যবসায়ী নেতারা।
বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল ইসলাম পারভেজ বলেন, “আমলারা কাজ করছেন না। তারা ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না, বলছেন যারা কাজ করেছিল তারা এখন জেলে। জেলে যাইতে চাই না।”
গুলশানের পুলিশ প্লাজায় নিজস্ব কার্যালয়ে মহানগর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) যৌথভাবে ‘বাংলাদেশ বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স (বিবিএক্স) ২০২৪-২৫’ এর চতুর্থ সংস্কার প্রকাশ করে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বশিরউদ্দীন বলেন, “আমার তিন মন্ত্রণালয়ের কোথাও যদি দুর্নীতি, ঘুষ আপনারা যাকে ইনফরমাল ডিল বলেন, তা হয়, তাহলে আমাকে জানাবেন, সমাধান করে দিব।
“যদি বলতে পারেন যে দুর্নীতি আছে, তাহলে আপনি জানেন কোথায় আছে, আসুন এবং আমাকে বলুন, আমি তা মোকাবিলা করব। সবখানে দুর্নীতিমুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের সম্মিলিত চেষ্টা থাকতে হবে এজন্য। সরকারি দপ্তরে যে সমস্যা হয় না, তা না। এজন্য আমরা একটা সংলাপ করতে পারি। আপনাদের কথা দিচ্ছি, সমস্যা বললে তা সমাধান হবে।”
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সবাইকে সমানভাবে ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়ার কথা জানিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, আগের সরকারের সময়ে সবখানে একটি ক্রনিক গোষ্ঠী হলো, লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড হলো না। কয়েকটি গোষ্ঠী কিছু কিছু খাতে একচেটিয়া ব্যবসা করল, এটা তো সরকারি নীতি হতে পারে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থনীতি এমন অবস্থায় পাওয়া পৌঁছেছে যে ছয় বিলিয়ন ডলার বিদেশি দায় পরিশোধ করা হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, “মুদ্রানীতি সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারায় এখন বৈদেশিক বাণিজ্যে সমস্যা হচ্ছে না। ডলারের পর্যাপ্ততা রয়েছে।
“অনাচারে ভরা অর্থনীতি হঠাৎ করেই পুরোটা ঠিক হবে না। একটা জাতি ঋণ নির্ভর হয়ে গিয়েছিল, তা তো হতে পারে না। এটা টেকসই হয় না। আমরা চেষ্টা করছি, এই চিত্র আমাদের বলে দেয় সংস্কার কতটা জরুরি।”
“ব্যাংক ও অবকাঠামো খাতে যে আপরাধ হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অকল্পনীয় দুর্নীতি হয়েছে। অনাচারের চিত্রটা ভুলে যাওয়া যায়, আমি মনে করি আমাদের মনে রাখা উচিত। আগামীতে যাতে সবাই মিলে সুশাসনের জন্য কাজটা করতে পারি,” বলেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসায় আগামী বছরের শুরুতে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে আশা বশিরউদ্দিনের।
বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী হক চৌধুরী বলেন, “সরকার ও আমরা দুই না। তারা ও আমরা বলে কোনো কথা থাকতে পারে না। আমরা বাংলাদেশি, এটাই আমাদের পরিচয় হওয়া উচিত।
“শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি কথা বললেই হবে না, নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে কমপ্লাইন্স কি-না, সেখানেও নজর দিতে হবে। ঘুষ কেনো চাইবে তারা (সরকারি দপ্তর)। আমাদের প্রতিষ্ঠানের সমস্যা কোথায়, সেটাও দেখতে হবে। নইলে তো প্রতিষ্ঠান টিকবে না।”
দুর্বোধ্য কর ব্যবস্থা
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করা ১৫০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করতে গিয়ে যেসব চ্যালেঞ্জ দেখছে তা তুলে ধরেন জাপানি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জেট্রোর বাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার কাজুইকি কাতওকা।
তিনি বলেন, “চার ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ীরা; যেগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্বোধ্য কর ব্যবস্থা। কর দেওয়ার বিষয়গুলো স্পষ্ট না। আমাদের কাছে মনে হয়, করহার সরকারের কাছেও পরিষ্কার না।
“হঠাৎ করে অনেক পুরনো রিটার্ন দেখতে চিঠি দেয় এনবিআর, এটা একটা সমস্যা। প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতার অভাব ও সব নির্দেশনা বাংলায় লেখা থাকায় আমাদের জন্য বুঝতে সময়ের প্রয়োজন হয়।”
বিনিয়োগে ভূমির প্রাপ্যতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্যের প্রাপ্যতা, অবকাঠামো, শ্রম পরিবেশ, বিরোধ নিষ্পত্তি, বাণিজ্য সুবিধা, কর প্রদান, প্রযুক্তি গ্রহণ, অর্থায়ন প্রাপ্তি ও পরিবেশগত নিয়মসহ ১১টি সূচক নিয়ে ব্যবসার পরিবেশ কেমন তার একটি সূচক প্রকাশ করে বিবিএক্স।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপায় পিইবি চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, এক বছর স্বল্প মাত্রায় অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে খাতগুলোতে, এখানে অনেক সম্ভাবনা ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ সামান্য স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখিয়েছে। ওই অর্থবছরে বিবিএক্স স্কোর ৫৯ দশমিক ৬৯ পয়েন্টে ছিল; যা তার আগের অর্থবছর ছিল ৫৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
বিবিএক্স-৪ সংস্কার প্রকাশে সহযোগিতা করা ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ার দূতাবাসের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ক কমিশনার বেন কারসন বলেন, “বাংলাদেশ এশিয়ার উদীয়মান দেশ। একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে পৌঁছাতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চায় অস্ট্রেলিয়া।”
এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, দীর্ঘমেয়াদী ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের জন্য অবকাঠামোগত বিষয়গুলো জরুরি। সরকারি সেবাগুলো যত অনলাইন ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বাইরে হবে তত স্বচ্ছতা থাকবে।