Published : 28 Sep 2025, 07:19 PM
আগামী বছর যারা সরকারিভাবে হজে যেতে চান, তাদের জন্য গতবারের চেয়ে খরচ কমিয়ে তিনটি প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
বিমান ভাড়া কমায় এসব প্যাকেজে এবার গতবারের তুলনায় ১১ হাজার টাকার মতো কম খরচ পড়বে হজযাত্রীদের।
গেল হজে দুটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার। এর মধ্যে সাধারণ প্যাকেজ-১ এর সর্বনিম্ন খরচ ছিল ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৪২ টাকা। আর প্যাকেজ-২ এ খরচ পড়ে সর্বনিম্ন ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮০ টাকা।
এবার সর্বনিম্ন (প্যাকেজ-৩) খরচ ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা, যা গতবারের সর্বনিম্ন খরচের চেয়ে প্রায় ১১ হাজার টাকা কম।
এছাড়া হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ) এর খরচ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৯৭ টাকা। প্যাকেজ-২ এ খরচ পড়বে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮১ টাকা।
রোববার সচিবালয়ে হজের তিনটি সরকারি প্যাকেজ ঘোষণা করেন ধর্ম উপদেষ্টা আ. ফ. ম খালিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “২০২৬ সালের জন্য হজে সৌদি প্রান্তে আবশ্যকীয় ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। এ কারণে বিগত বছরের খরচ বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য ব্যয় ধরে প্যাকেজ ঠিক করা হয়েছে।
“সৌদি সরকার কোনো খাতের খরচ কমালে কিংবা বাড়ালে সে অনুসারে প্যাকেজ মূল্য ঠিক করা হবে। প্যাকেজ মূল্য বাড়লে হজযাত্রীদের তা পরিশোধ করতে হবে। প্যাকেজ মূল্য কমলে উদ্বৃত্ত টাকা ফেরত দেওয়া হবে।”
সবশেষ হজে যাওয়া ব্যক্তিদের ৮ কোটি ২৮ লাখ ৯০ হাজার ১৮৩ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছিল বলে জানান উপদেষ্টা।
ধর্ম মন্ত্রণালয় বলছে, হজ প্যাকেজে সৌদি আরবে খরচের মধ্যে রয়েছে, মক্কা-মদিনায় বাড়ি বা হোটেল ভাড়া, পরিবহন ব্যয়, জমজম পানি, মিনা-আরাফায় সার্ভিস চার্জ, ভিসা ফি, স্বাস্থ্যবীমা, ইলেক্ট্রনিক্স ফি, গ্রাউন্ড সার্ভিস ফি, মিনার তাঁবু ভাড়া বা ক্যাম্প ফি, লাগেজ পরিবহন ব্যয় ও দমে শোকর খরচ।
বাংলাদেশ অংশ ব্যয়ের খাতে রয়েছে, বিমান ভাড়া, হজযাত্রীদের কল্যাণ তহবিল, প্রশিক্ষণ ফি, হজ গাইড ও অন্যান্য সার্ভিস।
সৌদি আরব ও বাংলাদেশ পর্বের এসব ব্যয় যোগ করেই প্যাকেজ মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
উপদেষ্টা বলেন, “আসন্ন ২০২৬ সালের হজে হজযাত্রী পরিবহনে বিমান ভাড়া যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। গতবছর বিমান ভাড়া ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮২০ টাকা। এবছর বিমান ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩০ টাকা। অর্থাৎ এবছর হজযাত্রী প্রতি বিমান ভাড়া ১২ হাজার ৯৯০ টাকা কমেছে। এছাড়া বেসমারিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রনালয় থেকে ভাড়া আরও কমানোর চেষ্টা চলছে।”
এবছর বিমান ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে গতবছরের মতো বাংলাদেশ পর্বের ভ্যাট ও ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এগুলো গতবছর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। এবছরও বাংলাদেশ পর্বের ভ্যাট ও ট্যাক্সকে হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া বহির্ভূত রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে।
হজ প্যাকেজে যা কিছু নতুন
>> ২০২৬ সালের হজে সৌদি সরকার স্বাস্থ্য বীমার পরিমাণ বাড়িয়ে ১৩০ সৌদি রিয়াল করেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ২৭০ টাকা। গত বছর স্বাস্থ্যবীমা ছিল ২১ রিয়াল।
>> মিনা ও আরাফায় তাঁবু ভাড়া ৪ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নুসুক মাসার প্লাটফর্মে 'দমে শোকর' বাবদ ৭২০ সৌদি রিয়াল বা ২৩ হাজার ৬৫২ টাকা জমাদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এবছর প্রথমবারের মতো দমে শোকর বাবদ টাকা হজ প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত করে প্যাকেজ ঘোষণা করা হচ্ছে।
>> এবছর সৌদি রিয়ালের বিনিময় হারও বেড়েছে, গতবছর সৌদি রিয়াল ছিল ৩২ দশমিক ৫০ টাকা, এবছর সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৮৫ টাকা।
>> এবছর সরকারি মাধ্যমে হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ), 'হজ প্যাকেজ-২' ও 'হজ প্যাকেজ-৩' শিরোনামে তিনটি হজ প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে।
>> ২০২৬ সালের হজে কোরবানির টাকা আবশ্যিকভাবে নুসুক মাসার প্লাটফর্মে জমা দিতে হবে। এ কারণে কোরবানি বাবদ ৭২০ সৌদি রিয়াল বা ২৩ হাজার ৬৫২ টাকা হজ প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খাবার বাবদ কোনো টাকা প্যাকেজে ধরা হয়নি। এজন্য প্রত্যেক হজযাত্রীকে খাবার বাবদ প্রতিদিন ন্যূনতম ৩৫ সৌদি রিয়াল হিসেবে প্রয়োজনীয় অর্থ সঙ্গে নিতে বলেছে সরকার।
কোন প্যাকেজে কী থাকছে, খরচ কত
হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ): এই প্যাকেজে হজযাত্রীদের মক্কায় হারাম শরীফের বহিরঙ্গণ থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ মিটারের মধ্যে এবং মদিনায় মারকাজিয়া বা সেন্ট্রাল এরিয়ায় হাজীদের আবাসন সুবিধা দেওয়া হবে। এটাচড বাথরুমসহ একরুমে সর্বোচ্চ ৫ জনের আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। মিনায় জোন-২ এ তাঁবুর অবস্থান হবে এবং মিনা-আরাফায় ডি+ ক্যাটাগরির সার্ভিসসহ মোয়াল্লেমের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হবে। এ প্যাকেজে খরচ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৯৭ টাকা।
হজ প্যাকেজ-২: এটি কিছুটা সুলভ। এই প্যাকেজের হজযাত্রীদের মক্কায় হারাম শরীফের বহিরঙ্গণ থেকে এক দশমিক ২ কিলোমিটার থেকে এক দশমিক ৮ কিলোমিটারের মধ্যে এবং মদিনায় মারকাজিয়া বা সেন্ট্রাল এরিয়ায় হাজীদের আবাসন সুবিধা দেওয়া হবে। এটাচড বাথরুমসহ একরুমে সর্বোচ্চ ৬ জনের আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। মিনায় জোন-২ এ তাঁবুর অবস্থান হবে এবং মিনা-আরাফায় ডি ক্যাটাগরির সার্ভিসসহ মোয়াল্লেমের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হবে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮১ টাকা।
হজ প্যাকেজ-১ ও হজ প্যাকেজ-২ এ নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ সাপেক্ষে মক্কা ও মদিনায় ২ ও ৩ আসনের রুমের শর্ট প্যাকেজ সুবিধা নেওয়া যাবে। হজযাত্রীদের সৌদি আরব অবস্থানকাল হবে সাধারণত ৩৫ থেকে ৪৭ দিন। তবে শর্ট প্যাকেজে সৌদি আরবে অবস্থান কাল হবে ২২ থেকে ৩০ দিন।
হজ প্যাকেজ-৩: এটি সাশ্রয়ী হজ প্যাকেজ। এই প্যাকেজে হজযাত্রীদের আবাসন হবে মক্কায় আজিজিয়া এলাকায় এবং মদিনায় মারকাজিয়া এলাকার বাইরে। একরুমে সর্বোচ্চ ৬ জনের আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। মিনায় জোন-৫ এ তাঁবুর অবস্থান হবে এবং মিনা-আরাফায় ডি ক্যাটাগরির সার্ভিসসহ মোয়াল্লেম কর্তৃক খাবার সরবরাহ করা হবে। হারাম শরীফে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে যাতায়াতের জন্য এসি বাসের ব্যবস্থা থাকবে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা।
এছাড়া 'বেসরকারি মাধ্যমের সাধারণ হজ প্যাকেজ' শিরোনামে একটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৯ হাজার ১৮৫ টাকা। এর বাইরে এজেন্সিগুলো নিজেদের মতো করে দুটি প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারবে। তবে কোনো প্যাকেজের মূল্যই ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকার কম হতে পারবে না।
হজ নিয়ে আরও তথ্য
>> চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২০২৬ সালের ২৬ মে হজ অনুষ্ঠিত হবে।
>> ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে সম্ভাব্য এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজ পালন করতে পারবেন।
>> গত ২৭ জুলাই থেকে হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু হয়েছে। সৌদি সরকারের রোডম্যাপ অনুসারে ১২ অক্টোবর হজের নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ হবে। তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করা যাবে।
>> ১২ বছর ও তার চেয়ে বেশি বয়সী শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তি ২০২৬ সালের হজ করতে পারবেন। ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে কেউ গেলে ৫০ বছরের নিচে কাউকে সঙ্গে নিতে হবে। লিভার সিরোসিস, করোনারি রোগসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের নিরুৎসাহিত করছে সরকার।
>> ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্যাকেজের সব টাকা পরিশোধ করতে হবে।
>> ১৮ এপ্রিল ২০২৬ সাল থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হবে।
সর্বোচ্চ হজযাত্রী পাঠানোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। গতবছর বাংলাদেশ থেকে ৮৭ হাজার ১০০ জন হজ পালন করেছেন।