Published : 19 Apr 2026, 09:59 PM
জাতীয় সংসদে তেল সরবরাহে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ তুলেছেন বিরোধী দল জামায়াতের ইসলামীর একজন সদস্য।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে নীলফামারী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফী বলেন, তার এলাকার জনগণ বলছেন, পেট্রোল পাম্পে এখন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নয়, ‘সবার আগে বিএনপির নেতাকর্মীরা’।
রোববার বিকালে শুরু হওয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপরে আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা হয়। মাগরিবের নামাজের পরে স্পিকার হাফি উদ্দিন আহমদ সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত বৈঠক মূলতবি করেন।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশে জ্বালানি সরবরাহে চাপ বাড়ে। রেশনিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এ অবস্থায় সরকার শনিবার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে।
নীলফামারী-৩ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফী বলেন, তার এলাকায় পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে গেলে বিএনপির নেতাকর্মীদের আগে দেওয়া হয় বলে মানুষের মধ্যে অভিযোগ আছে।
তিনি বলেন, “আমরা তো খুব আশান্বিত ছিলাম, আমরা খুবই খুশি ছিলাম যে বিএনপি বলেছিল, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে...এমনকি আমার এলাকাতেও দেখেছি, পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে গেলে বিএনপির নেতাকর্মীদেরকে সবার আগে দেওয়া হয়।
“এখন জনগণ বলতেছে যে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ না, ‘সবার আগে বিএনপির নেতাকর্মীরা’।”
বিরোধী দরের এই সদস্য বলেন, নির্বাচনের আগে মানুষের কাছে যে প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল, সরকার তা থেকে দ্রুত সরে এসেছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন মানুষের মধ্যে উঠছে।
ওবায়দুল্লাহ সালাফী বলেন, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে তিনি এই উদ্বেগের কথা শুনছেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের এ আলোচনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, প্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, এক-এগারো, নদীভাঙন, হাসপাতালের সংকট, তিস্তা ও হাওর অঞ্চলের দুর্ভোগ এবং কৃষি, যোগাযোগ ও আইনশৃঙ্খলার নানা বিষয়ও তোলেন বিভিন্ন দলের সদস্যরা।
নওগাঁ-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. মুস্তাফিজুর রহমান নিয়ামতপুর-পোরশা-সাপাহারকে ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকা’ বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “এটা নিয়ামতপুর না, এটা কিয়ামতপুর।”
সেই স্মৃতি স্মরণ করে মুস্তাফিজুর রহমান তার এলাকার উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ চান। একই সঙ্গে কৃষকের ধান-গমের ন্যায্যমূল্য, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মহিলা কলেজ সরকারিকরণ, তিনটি উপজেলার ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা, হৃদরোগ-কিডনি-চক্ষু বিভাগ চালু, আম সংরক্ষণের হিমাগার ও আমভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপনের দাবি জানান।
পাবনা-৫ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, “ছাত্র শ্রমিক জনতার মিলিত সংগ্রাম হচ্ছে জুলাই বিপ্লব।”
প্রয়াত বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শিমুল বিশ্বাস বলেন, “তিনি জেল, জুলুম, নির্যাতন হাসিমুখে বরণ করেছেন। কখনো মাথা নত করেননি।”
মাগরিবের বিরতির পর অসমাপ্ত বক্তব্য শেষ করতে গিয়ে শিমুল বিশ্বাস খালেদা জিয়ার সাজা ঘোষণার দিনের স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দি করা মানে বাংলাদেশকে বন্দি করা।”
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া মানুষের বড় অংশই শ্রমজীবী ও গরিব মানুষ।
সরকারি গেজেটের তথ্য তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, “পেশা অনুযায়ী নিহতদের মধ্যে শ্রমজীবী ২৮৪ জন, শিক্ষার্থী ২৬৯ জন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ১২০ জন, ছোট বেসরকারি চাকরিজীবী ১০৮ জন।”
তিনি বলেন, প্রবাসে থেকে তারেক রহমান ‘রণাঙ্গনের সেনাপতির ভূমিকা’ পালন করেছেন। বাংলাদেশকে বদলাতে হলে ‘ভাগ্যাহত মানুষের অধিকার রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত’ করতে হবে।
এক-এগারোর সরকারের সময় নিজের আটক ও নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে চাঁদপুর-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ বলেন, ২০০৭ সালের ২৭ জুলাই তাকে গুলশান ক্লাবের সামনে থেকে চোখ বেঁধে তুলে নেওয়া হয়।

পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ৪ কোটি টাকা জমা দিতে বাধ্য করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
শেখ ফরিদ বলেন, “আমি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমে অনুরোধ করছি, আমার সেই টাকাটা যেন ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।”
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ‘যার ভোট, ভোটকেন্দ্রে দিয়ে তার ভোট দিতে পারার’ কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার যেন নির্বাচন কমিশনকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য স্বীকৃতি দেয়।
চাঁদপুরের নদীভাঙন, নীলকমল, ইব্রাহিমপুর ও রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের ঝুঁকি, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দৃশ্যমান করা, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল-ইপিজেড স্থাপন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালের পাশে ১৫ তলা আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলার দাবি জানান এই সংসদ সদস্য।
তবে তার বক্তব্যে ব্যবহৃত ‘গাত্রদাহ’ শব্দটি স্পিকার কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেন।
সুনামগঞ্জ-৫ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য কলিমউদ্দিন আহমদ বজ্রপাতে হতাহতের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বিষয়টি ‘শুধু নোটিস দেওয়ার বিষয় নয়’; সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যেতে হবে।
তবে তিনি সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফ, কৃষি কার্ড এবং ইমাম, পুরোহিত ও যাজকদের ভাতা কর্মসূচির প্রশংসা করেন।
ইলিয়াস আলীসহ গুম হওয়া নেতাকর্মীদের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির এ সংসদ সদস্য বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে সংসদে একটি স্পষ্ট বিবৃতি দরকার।
সিলেট বিভাগের যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “গত ১৭ বছরের অবর্ণনীয় অবহেলার কারণে বাংলাদেশের আর কোনো বিভাগ এত অবহেলিত নয়।”
হাওর উন্নয়ন বোর্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সড়ক উন্নয়ন, সুরমা নদীর ওপর সেতু, ছাতক পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্প, দক্ষিণ ছাতকে উপজেলা ঘোষণা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের দাবিও জানান তিনি।
নদীভাঙন, হাসপাতালের সংকট, শিক্ষক শূন্যতা, অবৈধ বালি-মাটি উত্তোলন, শেয়ারবাজারে অনিয়ম এবং স্থানীয় গ্যাস সংযোগের দাবি নিয়ে কথা বলেন নোয়াখালী-৫ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. ফখরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাটের হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার, নার্স, সার্জন, গাইনি চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে।
একটি হাসপাতালের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে সরকারি দলের এ সদস্য কটাক্ষ করে বলেন, “আধুনিক হাসপাতাল না লিখে, ‘আধুনিক গরু’ লিখে দিলে ভালো হতো।”
শেয়ারবাজারে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি বিশেষ অভিযানের দাবি জানান। তার এলাকায় গ্যাসক্ষেত্র থাকলেও স্থানীয় মানুষ রান্নার গ্যাস পায় না, বলেন তিনি।
প্রবাসীদের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও সামনে আনেন ফখরুল ইসলাম।
সুনামগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণে বসে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি পান।
তিনি রাষ্ট্রপতির ভাষণের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, “রাষ্ট্রপতি আমাদের জনগণের পক্ষেই কথা বলেছেন।”
জুলাই সনদের প্রসঙ্গ টেনে নাসিরউদ্দিন বলেন, “যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের স্মরণ না করলে এই সংসদ অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে।”
একই সঙ্গে তিনি হাসপাতাল, চিকিৎসক ও নার্সের সংকট, ফসলহানি এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে বিএনপির এই সদস্য বলেন, “ডাক্তার দিন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাহেবকে বলতে হয়, দয়া করে নার্সের ব্যবস্থা করুন, অপারেশনের ব্যবস্থা করুন। এটা আমাদের মৌলিক অধিকার।”