‘জালিয়াতি করে’ ব্যবসায়ীর নামে ক্রেডিট কার্ড, তোলা হয়েছে লাখ টাকা

পুলিশ বলছে, ব্যাংকের ‘অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ’ ছাড়া এ ধরনের জালিয়াতি করা কঠিন।

গোলাম মর্তুজা অন্তুবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 Jan 2024, 05:34 PM
Updated : 25 Jan 2024, 05:34 PM

এক ব্যবসায়ীর জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়কর (টিআইএন) সনদ এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে এনআরবি ব্যাংক থেকে তার নামে ক্রেডিট কার্ড করিয়ে চারমাসে তিন লাখ টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এইচ এম সাইফুদ্দিন নামের ওই ব্যবসায়ী গত রোববার ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

তিনি বলছেন, গত বছর গৃহঋণ নেওয়ার জন্য একটি ব্যাংকের তৃতীয় পক্ষের প্রতিনিধিকে এনআইডি, টিআইএন সনদ ও ব্যাংক স্টেটমেন্টের কাগজ দিয়েছিলেন তিনি। পরে সেই ঋণটি তিনি পাননি। ওই কাগজগুলো ব্যবহার করেই এনআরবি ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড তোলা বলে তার ধারণা। 

সাইফুদ্দিনের নামে ওই ক্রেডিট কার্ড তুলতে যে আবেদন করা হয়েছিল, তাতে কিছু গড়মিল পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন এনআরবি ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তবে সাইফুদ্দিন যে নিজে ওই কার্ড তোলেননি, সেই দাবির বিষয়ে এখনও তারা নিশ্চিত নন। বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলছেন তারা। 

আর উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি আবুল হাসান বলেছেন, “আমরা জিডির অভিযোগ খতিয়ে দেখছি। তবে অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের জালিয়াতি করা কঠিন।”

কী ঘটেছিল?

এইচ এম সাইফুদ্দিন গার্মেন্ট কারখানার ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের ব্যবসায় জড়িত। তার বাসা উত্তরায়, গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরে।

এই ব্যবসায়ীর ভাষ্য, গত ২০ জানুয়ারি সকালে তিনি গ্রামের বাড়ি থেকে ফোন পান। তাকে জানানো হয়, এনআরবি ব্যাংকের ক্রেডিট রিকোভারি শাখা থেকে একজন কর্মকর্তা পাওনা টাকা আদায়ের জন্য সেখানে গেছেন। সাইফুদ্দিনের বৃদ্ধ বাবা-মাসহ বাড়ির সবার ভিডিও ধারণ করছেন ওই কর্মকর্তা। তাতে অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন তারা।

সাইফুদ্দিন তার বাবা-মাকে আশ্বস্ত করেন যে, তিনি এনআরবি ব্যাংক থেকে কোনো টাকা ধার করেননি। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা জানান, ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা সাইফুদ্দিনের নামে ক্রেডিট কার্ডের তথ্যও তাদের দেখিয়েছেন।

‘হতবাক’ সাইফুদ্দিন পরদিন এনআরবি ব্যাংকের গুলশান কর্পোরেট শাখায় যান। সেখান থেকে তাকে বলা হয়, তার জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়কর (টিআইএন) সনদ এবং সিটি ব্যাংকের একটি ব্যাংক স্টেটমেন্ট ব্যবহার করে গত বছরের ২৬ জুলাই একটি ক্রেডিট কার্ডের আবেদন করা হয় তার নামে।

এই ব্যবসায়ী বলছেন, ওই আবেদনে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তার সঙ্গে জমা দেওয়া এনআইডি কার্ডের ছবির নেই। তার স্ত্রী হিসেবে যে নারীর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তার সঙ্গেও জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবির কোনো মিল নেই।

কেরানীগঞ্জের জিনজিরার একটি বাড়ির বিদ্যুৎ বিলের কাগজ জমা দেওয়া হয়েছে ওই আবেদনের সঙ্গে। সাইফুদ্দিন বলছেন, ওই এলাকায় তার কোনো বাড়ি নেই। ক্রেডিট কার্ডের আবেদনের সঙ্গে যে ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেওয়া হয়েছে, সেটি তার একটি সঞ্চয়ী হিসাব। অথচ আবেদনপত্রে সেটি ‘স্যালারি অ্যাকাউন্ট’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

ব্যাংকে গিয়ে ওই কাগজপত্র দেখার পর সাইফুদ্দিন উত্তরা পশ্চিম থানায় জিডি করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, আয়কর সনদ, সিটি ব্যাংকের একটি ব্যাংক স্টেটমেন্ট ব্যবহার করে ‘কে বা কারা’ এনআরবি ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে চার মাসে তিন লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন।

গত ২০ জানুয়ারি বাদল নামে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা ফোন করে সেই খবর দেন এবং পরদিন এনআরবি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ম্যানেজার ওহায়দুল আকবরের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার ‘সত্যতা’ পাওয়ার কথা জিডিতে লিখেছেন সাইফুদ্দিন।

কীভাবে ঘটেছে?

ওই ক্রেডিট কার্ডের আবেদনপত্রে দেখা যায়, এনআরবি ব্যাংকের হয়ে ক্রেডিট কার্ডের আবেদনপত্রটি বুঝে নিয়েছেন ব্যাংকের কর্মকর্তা বিপ্লব রায়। তার সামনেই গ্রাহক সাইফুদ্দিন ওই ফরমে স্বাক্ষর করেছেন বলে তিনি আবেদন ফরমে লিখিত দিয়েছেন।  

সাইফুদ্দিন বলছেন, গৃহঋণ পাওয়ার জন্য গত বছর একটি ব্যাংকের তৃতীয় পক্ষের প্রতিনিধিকে এনআইডির কপি, টিআইএন সনদ ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ঋণ তিনি পাননি।

এই ব্যবসায়ীর ভাষ্য, উত্তরায় ‘আজুবা ইলেকট্রনিক্স’ নামের একটি দোকানে তিনি ব্যাংকের প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিছুদিন পরে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবিএল) কর্মকর্তা পরিচয়ে তাকে ফোন করেন একজন। ওই ব্যক্তি তাকে বলেন, তার ব্যাংক স্টেটমেন্টে যে লেনদেন দেখানো হয়েছে, তা দিয়ে তিনি গৃহঋণ পাবেন না। তার আর কোনো ব্যাংক হিসাব আছে কি না তাও জানতে চান ওই ব্যক্তি।

এরপর তিনি তাকে তার সিটি ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাব থাকার বিষয়টি বলেন। তিনি ওই হিসাবের একটি স্টেটমেন্ট চাইলে সেটি ব্যাংক থেকে তুলে সরবরাহ করেন সাইফুদ্দিন। তারপরও সাইফুদ্দিনের নামে ঋণ দেওয়া যাবে না জানিয়ে ওই ব্যক্তি তার স্ত্রীর ব্যাংক তথ্য চান।

সাইফুদ্দিন বলেন, “আমার কাছে যখন আমার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব চেয়েছে, তখন আমি বলেছি এত ঝামেলার দরকার নেই। ও চাকরি করে ওর নামে লোন করতে চাই না।”

এরপর গত ২১ জানুয়ারি এনআরবি ব্যাংকে গিয়ে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন সনদ আর সিটি ব্যাংকের স্টেটমেন্ট দেখে ‘অবাক হন’ বলে সাইফুদ্দিনের ভাষ্য।

তিনি বলেন, চাকরিজীবী না হলেও সিটি ব্যাংকের স্টেটমেন্টে তার কয়েকটি লেনদেনকে মাসের বেতন হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্টেটমেন্টের ওই কপিতে ‘জালিয়াতি’ করা হয়েছে বলে তার ধারণা।

সাইফুদ্দিন বলেন, “আমি এনআরবি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তারা এই স্টেটমেন্টটি ভেরিফাই (যাচাই) করেছেন কি না। জবাবে তারা বলেছেন, তার থার্ড পার্টির মাধ্যমে এসব করে থাকেন। তবে ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সিটি ব্যাংকের এই স্টেটমেন্টটে টেলিফোনে ভেরিফাই করেছেন।”

সাইফুদ্দিনের নামে আইএফআইসি ব্যাংকে খোলা আরেকটি অ্যাকাউন্টের তথ্য ক্রেডিট কার্ড তোলার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। সেই অ্যাকাউন্টের তিন লাখ টাকার একটি তারিখবিহীন চেকও এনআরবি ব্যাংকের নথিতে রয়েছে।

এই ব্যবসায়ী বললেন, তার জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে তার নামে আইএফআইসি ব্যাংকে ওই অ্যাকাউন্ট খোলা হলেও তিনি নিজে সেটি খোলেননি।

“সম্ভবত গ্যারান্টি হিসেবে চেকটা নিয়েছে এনআরবি ব্যাংক। কিন্তু আইএফআইসি ব্যাংকের ওই অ্যাকাউন্টটা ওই চক্র করেছে আমার নামেই।”

এনআরবি ব্যাংকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে সাইফুদ্দিন বলেন, “তারা কী ভেরিফাই করেছেন কী না জানি না। তবে ওটা তো আমার স্যালারি অ্যাকাউন্ট না। আমি তো চাকরিই করি না। আর তারা আমার নামে তারা চাকরির কাগজপত্রও হাজির করেছে।”

সাইফুদ্দিনের নামে ক্রেডিট কার্ড তুলতে যে আবেদন করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, তিনি ‘গ্যালারি ইলেকট্রনিক্স’ নামের একটি কোম্পানির সহকারী মহাব্যবস্থাপক। সেই চাকরিতে তার নামে ভিজিটিং কার্ড আর স্যালারি সার্টিফিকেটও জমা দেওয়া ব্যাংকে। সেখানে সাইফুদ্দিনের বেতন দেখানো হয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার টাকা।

এর সবাই জাল বলে সাইফুদ্দিনের ভাষ্য। তিনি বললেন, তার নামে যে ফোন নম্বর এনআরবি ব্যাংকে দেওয়া হয়েছে, সেখানে ফোন করে তিনি বন্ধ পেয়েছেন।

আবেদন পত্রে সাইফুদ্দিনের স্ত্রী এবং সাপ্লিমেন্টারি কার্ডের গ্রহীতা হিসেবে বিথী আক্তার নামে এক নারীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি দেওয়া হয়েছে। বিথী আক্তারের ক্ষেত্রেও যে পাসপোর্ট সাইজের ছবি দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবির ‘মিল নেই’। আবেদনপত্রে বিথী আক্তারের যে মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে সেটিও বন্ধ পেয়েছেন সাইফুদ্দিন।

আবেদনপত্রে রেফারেন্স হিসেবে শাওন ও আবিদ হাসান নামে দুজনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে শাওনকে ‘কাজিন’ ও আবিদকে সহকর্মী হিসেবে দেখানো হয়েছে। আবিদ হাসানের নম্বর হিসেবে দেওয়া দুটি ফোন নম্বরই বন্ধ। শাওনের নম্বর খোলা থাকলেও সেখানে ফোন করলে কেউ ধরেন না বলে জানান সাইফুদ্দিন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে বিথী আক্তার, শাওন বা আবিদ হাসান পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

যা বলছে এনআরবি ব্যাংক

সাইফুদ্দিনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এনআরবি ব্যাংকের কেডিট কার্ড বিভাগের ব্যবস্থাপক ওহায়দুল আকবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিনি আমাদের কাছে এসছিলেন। তার ওই আবেদনের তথ্যে আমরা কিছু মিসম্যাচ পেয়েছি। সেগুলো নিয়ে কাজ চলছে।”

তিনি বলেন, “সাইফুদ্দিন সাহেব, যিনি নিজেকে ভিক্টিম হিসেবে দাবি করছেন, তার বক্তব্যেও কিছু গড়মিল রয়েছে। আমরা সবগুলো নিয়েও কাজ করছি।”

এনআইডি কার্ডের সঙ্গে আবেদনকারী ব্যক্তির ছবির মিল নেই– সাইফুদ্দিনের এমন দাবির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওহায়দুল আকবর বলেন, “এনআইডি কার্ডের ছবিটাতো অনেক আগের। আর হয়ত পরে তিনি ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি রেখেছেন, আরও মোটা হয়েছেন। এমনটা তো হয়।”

কিন্তু এনআইডি কার্ডে আবেদনকারীর স্ত্রী হিসেবে যে নারীর ছবি দেওয়া হয়েছে তারও এনআইডির সঙ্গে ছবির মিল নেই। এনআইডির নারীকে একটু বয়স্ক মনে হলেও আবেদন ফরমে যে নারীর ছবি রয়েছে তার বয়স অনেক কম মনে হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওহায়দুল আকবর বলেন, “ওগুলো মেজর ইস্যু না।”

রেফারি হিসেবে যাদের নাম ফরমে দেওয়া হয়েছে, তাদেরও মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে এনআরবি ব্যাংকের কর্মকর্তা ওহায়দুল বলেন, “এখন কে ফোন খোলা রাখবে আর ডিফল্টার হবে এগুলো তো আমরা আগে থেকে বলতে পারি না। আমরা তো জ্যোতিষ না। যখন আবেদন করেছিল তখন তো খোলাই ছিল।”

সাইফুদ্দিন অভিযোগ করেছেন, তার নামে জমা দেওয়া বিদ্যুৎ বিল তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়ে ওহায়দুলের ভাষ্য, “আমরা পল্লী বিদ্যুতে খোঁজ নিয়েছি। ওই নামে বাড়ি রয়েছে। সেই বিলটি সঠিক।”

সাইফুদ্দিনের দেওয়া তথ্যে নানা গড়মিল রয়েছে দাবি করে ওহায়দুল বলছেন, “তার এনআইডি, তার টিআইএন সার্টিফিকেট, তার ব্যাংক স্টেটমেন্ট এসবের দায় তো তারই। তার নামে আইএফআইসি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের চেক তারা সিকিউরিটি হিসেবে দিয়েছে। একজনের সব ডকুমেন্ট কী করে অন্যের কাছে যায়।”

তবে সাইফুদ্দিন দাবি করছেন, তার নামে আইএফআইসি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টটিও ‘জালিয়াতরা’ খুলেছে। এ প্রসঙ্গে ওহায়দুলের উত্তর, “আমার সন্দেহ আছে।”

ওই অ্যাকাউন্ট নিয়ে আইএফআইসি ব্যাংকের বক্তব্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানতে পারেনি। সাইফুদ্দিন দাবির সত্যতাও যাচাই করা যায়নি।

কোনো কার্ডের আবেদন করা হলে, সেই ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করার দায় ব্যাংকের কি না– সেই প্রশ্ন করা হয়েছিল এনআরবি ব্যাংকের কেডিট কার্ড বিভাগের ব্যবস্থাপক ওহায়দুল আকবরকে।

জবাবে তিনি বলেন, “আমরা যেসব মিসম্যাচ পেয়েছি, সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। আমাদের ইন্টারনাল কিছু বিষয়ও রয়েছে। সব প্রকাশযোগ্য নয়।”