১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার বলছে, সার আছ, বিরোধীরা বলছে, কৃষকের হাতে যাচ্ছে না

সংকটের কারণ হিসেবে কালোবাজারি, মজুদদারি, ডিলারদের অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কথা সংসদে তুলে ধরেন বিরোধীরা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 09 Sep 2026, 11:31 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:57 AM

দেশে সারের সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে, যেখানে ক্ষমতসীনদের তরফে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার কথা বলা হলেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তা ঠিকঠাক কৃষকের হাতে না পৌঁছানোর অভিযোগ তুলেছেন। 

বিরোধী দলের সদস্যরা সংকটের কারণ হিসেবে কালোবাজারি, মজুদদারি, ডিলারদের অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কথা বলেছেন। 

বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ বিধিতে সারের সংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের নানা বক্তব্য উঠে আসে। 

সরকারের হিসাবে, আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে সারের চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। একই সময়ে ৫১ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন সারের জোগানের ব্যবস্থা রয়েছে। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন সার বেশি রয়েছে।

পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান পাঁচ সদস্যের সমর্থন নিয়ে ‘দেশজুড়ে তীব্র সার সংকট’ নিয়ে আলোচনার নোটিস দেন।

তিনি বলেন, ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপিসহ প্রয়োজনীয় সার সময়মতো না পাওয়ায় এবং অতিরিক্ত দামের কারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে।

‘সার আছে, তাহলে কৃষকের হাহাকার কেন’

কুড়িগ্রাম-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুল আলম বলেন, সরকার পর্যাপ্ত মজুদের কথা বললেও কৃষকরা সার না পেয়ে কালোবাজার থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

তিনি বলেন, “সার যদি অতিরিক্ত মজুদ থাকে, তাহলে এখানে যে কৃষকদের হাহাকার, এখানে কি কোনো ফেইলর আছে?”

নিজেই এর উত্তর দিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই ফেইলর আছে।”

পরিকল্পনা, সরবরাহ, কালোবাজারি ও ডিলার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ করেন তিনি।

জেলা ও উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে সংসদ সদস্যদের আবার উপদেষ্টা করার পাশাপাশি ইউনিয়নভিত্তিক ডিজিটাল চাহিদা মানচিত্র ও সার পরিবহনে ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালুর প্রস্তাব দেন মাহবুবুল।

‘৩,৭৫৯ ডিলার পলাতক’

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯ সার ডিলার পলাতক থাকায় সংশ্লিষ্ট ডিলার পয়েন্টগুলো শূন্য রয়েছে। তাই নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ২৯ অগাস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সার নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২২টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনায় ২০৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে সারের দাম ভারত ও মিয়ানমারের তুলনায় কম হওয়ায় সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের প্রবণতার তথ্যও সরকারের কাছে রয়েছে বলে জানান তিনি। দুটি ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার এবং কিছু সার জব্দ করা হয়েছে।

‘সার নেই নয়, ব্যবস্থাপনা নেই’

পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বিরোধী দলের বক্তব্য দেশে সার নেই এমন নয়, মূল সমস্যা ব্যবস্থাপনায়।

“আমাদের আজকের ডিবেটটা হচ্ছে, (সার) আছে, কিন্তু এটার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নাই।”

বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কোথাও কোথাও কৃষকদের ন্যায্যমূল্যের চেয়ে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।

নতুন ডিলার নিয়োগে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ পাওয়ার কথাও বলেন তিনি।

তার প্রশ্ন, সার পর্যাপ্ত থাকলে কৃষকদের সড়ক অবরোধ করতে হচ্ছে কেন এবং অবৈধ মজুদ থেকে সার জব্দ হচ্ছে কেন।

‘সারের কোনো সংকট নেই’

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শরিফুল আলম শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে বলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ রয়েছে।

তিনি জানান, বিসিআইসির সাতটি সার কারখানার মধ্যে ঘোড়াশাল-পলাশ ও শাহজালাল সার কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

যমুনা ও আশুগঞ্জ সার কারখানা সাময়িক বন্ধ রয়েছে। কাঁচামালের অভাবে টিএসপি ও ডিএপি সার কারখানাও সাময়িক বন্ধ।

শরিফুল আলম বলেন, “বর্তমান সরকারের আমি মনে করি, সারের কোনো সংকট নাই। সারের পর্যাপ্ত উৎপাদন, আমদানি, মজুদ রয়েছে।”

পরে তিনি বলেন, “সংকট তীব্র নয়, সার আছে। ব্যবস্থাপনা ত্রুটি কিছু থাকতে পারে।”

সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা করার প্রয়োজন নেই বলেও মত দেন তিনি।

‘সমস্যা মজুদের নয়, ব্যবস্থাপনার’

পরে নাজিবুর রহমান বলেন, সরকারের মজুদের হিসাব তারা বিশ্বাস করতে চান, তবে মূল সমস্যা ব্যবস্থাপনায়।

তিনি বলেন, “আমাদের সার সংকট মূলত সারের সমস্যা না, ব্যবস্থাপনার সমস্যা, দুর্নীতির সমস্যা, হরিলুটের অপচেষ্টার সমস্যা।”

সার মিয়ানমারে পাচার এবং এর বিপরীতে দেশে মাদক আসার অভিযোগও তোলেন তিনি।

কেন্দ্রীয় গুদাম থেকে ডিলার পর্যন্ত রিয়েল টাইম ডিজিটাল ট্র্যাকিং, জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে কৃষকের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সার দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ডিলার নিয়োগের প্রস্তাব দেন নাজিবুর।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, সার বিতরণে অনিয়ম ঠেকাতে ৬৪ জেলায় মনিটরিং সেল করা হয়েছে।

নতুন ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, আবেদন প্রক্রিয়াই এখনও শেষ হয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আলোচনা শেষে স্পিকার বলেন, এক ঘণ্টার জন্য নির্ধারিত আলোচনা প্রায় দেড় ঘণ্টা চলেছে।