Published : 22 Jul 2025, 05:29 PM
ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বিমান বাহিনীর জঙ্গি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ জনে।
আর আহত ৬৮ জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
বিমান দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের বিষয়ে তথ্য দেওয়ার জন্য ফোকাল পারসন হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সরকার ফারহানা কবীর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ তথ্য জানান।
এর আগে দুপুরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান ২৯ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিলেন।
সেই তথ্য সংশোধনের কথা জানিয়ে সরকার ফারহানা কবীর বলেন, উত্তরার লুবনা জেনারেল হাসপাতাল ও কার্ডিয়াক সেন্টারে মৃত দুইজনের মধ্যে একজনকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তার নাম ওমাইয়ার নুর আশফিক। আরেকজনকে এখনো শনাক্ত করা হয়নি। এই স্থানান্তরের কারণে একজনের তথ্য দুইবার যোগ হওয়ায় সংখ্যায় বিভ্রাট তৈরি হয়, যা পরে সংশোধন করা হয়েছে।
বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান দুপুরের ব্রিফিংয়ে বলেন, যারা চিকিৎসাধীন, তাদের মধ্যে ১০ জনকে 'শঙ্কামুক্ত' বলে মনে করা হচ্ছে।
৩০ জনের অবস্থা এখনও 'অস্পষ্ট', তাদের ১০ জনের অবস্থা 'আশঙ্কাজনক' বলে জানিয়েছেন তিনি। আর বাকিদের অবস্থা ‘মাঝারি’ ধরনের।
নিহতদের মধ্যে ১৫ জনের লাশ সিএমইচএ এবং ১০ জন বার্ন ইনস্টিটিউটে মারা গেছেন বলে তথ্য দিয়েছেন তিনি।
এদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর এদিন বিকালে ৩১ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। সোমবার থেকেই আইএসপিআরের তথ্যের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের পার্থক্য থেকে যাচ্ছে।
এই গড়মিলের বিষয়ে প্রশ্ন করলে সায়েদুর রহমান বলেন, "সংখ্যাটায় খুব বেশি পীড়াপীড়ির কিছু নেই। বিভ্রান্তি দূর হতে আমাদের একটু সময় দেন, কিছুক্ষণের মধ্যে দূর হয়ে যাবে।"
বার্ন ইনস্টিটিউটে সাংবাদিকদের সামনে এসে মৃত্যু সংখ্যা নিয়ে 'অস্পষ্টতার' বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম।
পরে এ বিষয়ে জবাব দিতে সাংবাদিকদের সামনে সায়েদুর রহমান বলেন, "এখানে আসার আগে আমরা আইএসপিআরের সাথে কথা বলেছি। আইএসপিআরের তথ্যে যে একটি হাসপাতাল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সেটি হচ্ছে লুবনা।
"লুবনা হাসপাতালের তথ্যের বিষয়ে এখানে আসার আগ মুহূর্তে আমরা যোগাযোগ করেছি। তাদের ওখানে তাদের হিসেবে রেজিস্ট্রিতে কোথাও কোনো মৃত নেই। কিন্তু উনারা মুখে বলছেন সেখানে দুজন শিশু ব্রট ডেড ছিল, যাদেরকে তাদের অভিভাবকরা নিয়ে এসেছেন।"
"ওই দুইজন আসলে পরবর্তীতে আমাদের কোনো হাসপাতালে আসেননি বিধায় ওই দুইজনের রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে না।"
যারা লুবনা হাসপাতালে মারা গেছেন বলা হচ্ছে, সেই অভিভাবকদের 'নামগুলো তালিকাভুক্তির জন্য' সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সায়েদুর।
সিএমএইচের একজন এবং উত্তরা আধুনিক হাসপাতালের একজন মৃত্যুর তথ্য নিয়েও পার্থক্য থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, "উত্তরা আধুনিকে, সেখান থেকে একজনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সিএমএইচে। সেটি নিয়ে আইএসপিআরের সঙ্গে আমাদের তথ্যের পার্থক্য হয়েছে।"
"আমরা আসার আগে নিশ্চিত হয়েছি সিএমএইচে ১৫ জনেরই মৃতদেহ আছে। যদিও আইএসপিআরের তথ্যে সেখানে বলা হয়েছে ১৬ জন।"
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী সায়েদুরের ভাষ্য, "তথ্যের পার্থক্যগুলো দূর হতে হয়ত একটু সময় লাগবে। যেহেতু মৃতদেহ এবং দেহাবশেষ নিয়ে আমাদের কিছু পার্থক্য আছে।"

অন্যান্য হাসপাতালের ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে তেমন কোন 'আপডেট নেই' জানিয়ে তিনি বলেন, "কিন্তু এই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে দুইজনকে আমরা কেবিনে শিফট করতে পেরেছি যেটাকে আমরা একটা উন্নতি বলে মনে করি।"
"ভর্তি রোগীর মধ্যে ১০ জনকে শঙ্কামুক্ত বলে আমরা মনে করি। ৩০ জন একটা অস্পষ্ট জায়গায় আছে, যার মধ্যে ১০ জনকে মনে করছি এখনও শঙ্কার মধ্যে আছে। বাকিদের অবস্থা মাঝামাঝি জায়গায়।"
অন্যান্য হাসাপতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে 'মাল্টিডিসিপ্লিনারি' আটটি টিম যোগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সায়েদুর বলেন, "ইতোমধ্যে এ হাসপাতালের সঙ্গে যাদের চুক্তি আছে, সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাদেরকে কেস রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে।
"তাদের একজন সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং দুইজন নার্স আজ রাতে এসে পৌঁছাবেন। আশা করবো তারা আগামীকাল থেকে এই টিমে যোগ দিতে পারবেন।"
এক পশ্নের জবাবে আহতদের চিকিৎসায় ৭০-৮০ রকমের সরঞ্জম প্রয়োজন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আইএসপিআরের তথ্যে আহতের সংখ্যা ১৬৫ জন বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে সায়েদুরের ভাষ্য, উত্তরা আধুনিকে ৬০ জন, লুবনাতে ১৩ জন ছিল তালিকায়। যাদের বেশিরভাগদেরকেই পরে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
রেকর্ড কিপিং এবং মুভমেন্টের কারণে এই 'ডুপ্লিকেশন' হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, "ঢাকা মেডিকেলের ৩ জনকে বার্ন ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয়েছে। সিএমএইচ থেকে তিনজন পাঠানোর কথা বলেছে।"
নিহতদের মধ্যে এখনও ৬ জন অশনাক্ত জানিয়ে সায়েদুর বলেন, "তাদের শনাক্তের জন্য 'ডিএনএ স্যাম্পল রাখা হচ্ছে, যারা দাবি করবে ডিএনএ ম্যাচ করে শনাক্ত করা হবে।
“অশনাক্তদের মধ্যে ৪ জনের জন্য স্বজনরা এখন পর্যন্ত 'নিখোঁজের' দাবি করেছেন, দুইজনের বিষয়ে কেউ এখনও কোনো দাবি করেননি।”
যারা দাবি নিয়ে এসেছেন, তাদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করতে যে সময় লাগে, সেই সময়টা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
শুরুতে সাংবাদিকদের সামনে এসে এই ঘটনাটিকে 'অবর্ননীয়' হিসেবে বর্ণনা করে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, "গতকাল এসে দেখি বার্ন ইনস্টিটিউটে লোকারণ্য। ভিড়টা কম হলে রোগীদের আনতে সুবিধা হত।"
পরে তিনি ২৯ জন মৃত্যুর তথ্য দিতেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে বাকি তথ্যের জন্য বিশেষ সহকারী সায়েদুরকে কথা বলার সুযোগ দেন।
সোমবার দুপুরে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়। এতে সার্ধশতাধিক হতাহতের ঘটনা ঘটে, যার বেশিরভাগই শিশু। এ ঘটনায় মঙ্গলবার দেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে।