Published : 14 Dec 2025, 12:12 AM
বাঙালির শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির লড়াইয়ে বুদ্ধিভিত্তিক মনস্তত্ত্ব গঠনে ভূমিকা রেখে যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন, জাতির সেই সূর্যসন্তানদের স্মরণে রোববার পালন করা হচ্ছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।
একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাত থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। তবে বিজয়ের প্রাক্কালে এ হত্যাযজ্ঞ ভয়াবহ রূপ নেয়। আর এ কাজে তাদের সহযোগিতা করেছিলেন এ দেশীয় দোসররা।
ডিসেম্বরের মধ্যভাগে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয় যখন অনিবার্য, তখন রাজাকার, আল-বদর বাহিনীর সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করে বাংলাদেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীদের; উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে পঙ্গু করে দেওয়া।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিকসহ বহু খ্যাতিমান বাঙালিকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে।
নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত জেনেই পাকিস্তানি বাহিনী ওই নিধনযজ্ঞ চালায়; তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার পর যেন বাংলাদেশ যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
শরীরে নিষ্ঠুর নির্যাতনের চিহ্নসহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের লাশ পাওয়া যায় মিরপুর ও রায়েরবাজার এলাকায়। পরে তা বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ৫৪তম বার্ষিকীতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও বুদ্ধিভিত্তিক পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ভূমিকা স্মরণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপ্রধান সব সূর্যসন্তান ও শহিদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করেছেন।
বাণীতে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “১৯৭১ সালের এ দিনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের দোসররা নির্মমভাবে হত্যা করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।
“বুদ্ধিজীবীরা একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম রূপকার। জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক কারিগররা মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশের মাধ্যমে একটি জ্ঞাননির্ভর সমৃদ্ধ জাতি গঠনে ভূমিকা রাখেন।”
তিনি বলেন, “এ কারণেই পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা হানাদার বাহিনী জাতিকে মেধাশূন্য করার হীন উদ্দেশ্যে ঢাকাসহ সারাদেশে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়।”
দেশের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবীদের সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড যে জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি ছিল, সে কথা তুলে ধরে সাহাবুদ্দিন বলেন, “নির্মমভাবে গুম ও হত্যা করে দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিল্পী, রাজনৈতিক চিন্তাবিদসহ বহু গুণীজনকে। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর এ ক্ষত বাংলাদেশ আজও বহন করে চলেছে।
“সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের অবিচল সাহস ও দৃঢ় অবস্থান দেশের ইতিহাসে অনন্য ও চিরস্মরণীয়। শহিদ বুদ্ধিজীবীদের রেখে যাওয়া আদর্শ ও পথ অনুসরণ করে একটি অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সুখী-সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে পারলেই তাদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে বলে আমি মনে করি।”
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তার বাণীতে বলেন, “বাঙালি জাতির বিজয়ের প্রাক্কালে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, আইনজীবী, শিল্পী, প্রকৌশলী, দার্শনিক, রাজনৈতিক ও চিন্তাবিদসহ দেশের মেধাবী সন্তানদের নির্মমভাবে গুম ও হত্যা করে।
“এ পরিকল্পিত নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে একটি ব্যর্থ জাতিতে পরিণত করাই ছিল স্বাধীনতাবিরোধীদের মূল উদ্দেশ্য।”
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “শহীদ বুদ্ধিজীবীরা স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি গণতান্ত্রিক উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সমগ্র জাতিকে সঙ্গে নিয়ে তেমনই একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু করেছে। এর মাধ্যমে আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আমৃত্যু লালিত স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
“আসুন, শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে সবাই নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ হই। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে তুলি উন্নত, সমৃদ্ধ আগামীর বাংলাদেশ।”
শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবসের কর্মসূচি
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে জাতীয় কর্মসূচির পাশাপাশি এদিন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে সারাদেশে নানা কর্মসূচি পালন করবে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।
সকাল ৭টার পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
এর পর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টার নেতৃত্বে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য এবং যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এবং সকাল সাড়ে ৮টায় রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পরে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
দিবসটি উপলক্ষে সংবাদপত্রে বিশেষ নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে। দেশের সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আলোচনা সভা হবে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে।
সকল মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে হবে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা।
দিবসের তাৎপর্য রক্ষায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এলাকায় মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহার না করার জন্য সর্বসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।