Published : 27 May 2026, 03:15 PM
কোরবানি ঈদের দিন একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক পশু জবাই হওয়ায় এ সময় রাজধানীতে বাড়ে কসাইয়ের কদর।
বিপুল চাহিদা মেটাতে যে কারণে পেশাদার কসাইয়ের পাশাপাশি বাইরের জেলাগুলো থেকে এসময় রাজধানীতে এসে অনেক কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ হয়ে যান ‘মৌসুমি কসাই’। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ঈদ সামনে রেখে এরইমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হয়েছেন এ ধরনের ‘মৌসুমি কসাইরা’। কোরবানির পশুর মাংস কাটাকুটির জন্য তাদের সঙ্গে দরদাম ঠিক করে সময় নির্ধারণের কাজ চলছে এখন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের জেলা থেকে সাধারণত ঈদের দিন কয়েক আগেই চলে আসেন ‘মৌসুমি কসাইরা’। প্রথম কয়েক দিন কোরবানির পশুর হাটে ব্যাপারিদের সঙ্গে কাজ করেন তারা। সেখানেই ঈদের দিন কসাইয়ের কাজ করার জন্য পশুর ক্রেতাদের সঙ্গেও চুক্তি করেন কেউ কেউ। অবার অনেকে দলবদ্ধভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রতি বছর রাজধানীতে কোরবানির গরুর মাংস কাটার কাজ করছেন।
সোমবার রাতে রাজধানীর আজিমপুরে একদল মৌসুমি কসাইয়ের দেখা পাওয়া যায়। তারা প্রত্যেকে এসেছেন রংপুর, গাইবান্ধা আর কুড়িগ্রাম থেকে।
এই দলের ‘ওস্তাদ’ আইয়ুব আলী বলেন, “কসাইয়ের কাজ করার জন্য প্রতিবছর তিন থেকে চারশ লোক ঢাকা আসে। বেশিরভাগ লোক গরুর ব্যাপারিদের সঙ্গে আগেই চলে আসেন। পুরো সপ্তাহ তারা হাটে কাজ করে। যারা গরু কিনে তাদের বলা হয়, কসাই আছে। কেনার সময় অনেকেই বুকিং করে যায়।”
এই দলের থাকা কৃষক ফিরোজের বাড়ি গাইবান্ধা। তিনি বলেন, “শনিবার ঢাকায় এসে ওস্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। বাড়িতে চাষবাষ করি। ঈদে-কোরবানে ঢাকায় আসি। গত চার বছর ধরে এই কাজে ঈদের সময় ঢাকায় আসি। মাংস কাটাকাটি শেখা হয়ে গেছে প্রায়।”
শুধু কৃষক নয়, ঈদের এই ছুটিতে বাড়তি আয়ের আশায় ‘মৌসুমি কসাই’ হয়ে ওঠেন দাড়োয়ান, রিকশা-ভ্যান চালক ও দিনমজুরসহ অনেকেই।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর শনিরআখড়া হাটে কথা হয় সুজন মিয়ার সঙ্গে। তার বাড়ি হাতিয়া। গ্রামে দিনমজুরের কাজ করেন। গত তিন দিন ধরে ব্যাপারির সঙ্গে হাটে কাজ করছেন। কোরবানির পশু কেনা দুইজনের সঙ্গে এরইমধ্যে তাদের গরুর মাংস কাটার চুক্তি হয়েছে।
সুজন বলেন, “নিজ এলাকায় কোরবানি কম হয়। তাই কয়েক বছর ধরে ঈদের কয়েকদিন আগে হাটে চলে আসি। আমরা তিনজন একসঙ্গে কাজ করি। এখন পর্যন্ত দুইটা গরু বানানোর (মাংস কাটা) কাজ নিয়েছি। ঈদের দিন সকালে একটা, বিকালে একটা। প্রতিটা গরু ৮ হাজার করে।”
পেশাদার কসাইরা বলছেন, কোরবানির সময় দাম, আকার ও ওজন অনুযায়ী পশু কাটাকাটির মজুরি নির্ধারণ হয়। একটি মাঝারি গরু জবাই থেকে শুরু করে মাংস রান্নার উপযোগী করে দেওয়া পর্যন্ত ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা নেন তারা।
আবার অনেক কসাই গরুর দামে প্রতি হাজার টাকার বিপরীতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করছেন।
তবে জবাই ও মাংস কাটাকুটি থেকে শুরু করে বণ্টন পর্যন্ত কাজ করার জন্য ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা মজুরিতে পাওয়া যাচ্ছে মৌসুমি কসাইদের।
গোলাপবাগের ধলপুর মালতিলতা কাঁচাবাজারের মাংস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ বাবুল। তিনি এলাকায় কসাই বাবুল নামে পরিচিতি। কোরবানি ঈদ এলেই এলাকায় তার চাহিদা বেড়ে যায়। তার অধীনে সাত জন কসাই কাজ করেন।
সোমবার রাতে তিনি বলেন, “ঈদের দিন প্রচুর কাজ থাকে। সবাই সকালেই গরু জবাই করতে চায়। ঈদের দিন এত কসাই কই থেকে আসবে! আজ পর্যন্ত ঈদের দিনের ছয়টা কাজ পাওয়া গেছে। এখন আর ঈদের দিনের কাজ নিচ্ছি না। ঈদের পরের দিন যারা জবাই করবে, তাদের কাজই নিচ্ছি।”
কত টাকা নিচ্ছেন এমন প্রশ্নে বাবুল বলেন, “গরুর দাম নিয়ে কথা। আবার ঈদের দিনে এক রেট, ঈদের পরে দিনে আরেক রেট। দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার গরু হলে নেই ২০ হাজার টাকা। এক ঘণ্টায় জবাই থেকে শুরু করে মাংস কাটার কাজ শেষ করে দেব। ঈদের পরের দিন কাটলে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে করে দেই। ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা দামের ছাগলের জন্য নেই আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা।”
মৌসুমি কসাই ও পেশাদার কসাইয়ে মধ্যে পার্থক্যের বিষয়ে মোহাম্মদ বাবুল বলেন, “আমাদের বানানো মাংস আর ছুটা (মৌসুমি) কসাইয়ের কাটা মাংসের মধ্যে অনেক তফাৎ। আমরা হাড্ডি থেকে মাংস আলাদা করি এবং হাড়গুলো অত্যন্ত সুন্দর করে বানিয়ে দেই। চামড়ায় এক টুকরা মাংসও লেগে থাকে না, চামড়াও নষ্ট হয় না।”
সোমবার রাতে ধলপুর মালতিলতা কাঁচাবাজারে কসাইয়ের খোঁজে এসেছিলেন ইসরাফিল আহমেদ। বংশাল রোডেই তার বাসা। গোলাপবাগ বাজার থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছেন একটি গরু।
তিনি বলেন, “পেশাদার কসাইরা বেশি মজুরি চায়। আমি দুই বছর ধরে অপেশাদার কসাই দিয়েই কাজ করাই।
“অনেক বছর ধরে কাজ করছে এমন অপেশাদার কসাই হলে তেমন সমস্যা হয় না। মজুরিও কম, ১০/১২ হাজার টাকা দিলেই হয়। সঙ্গে কয়েক কেজি মাংস।”
কোরবানির পশু কাটতে গিয়ে আহত শতাধিক ‘মৌসুমি কসাই’ ঢাকা মেডিকেলে