১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

আর্থিক প্রলোভনে জুলাই শহীদদের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ, কী বলছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান?

কয়েকদিন আগে ‘প্রতারণার’ অভিযোগে স্থানীয়রা একজনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে।

আর্থিক প্রলোভনে জুলাই শহীদদের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ, কী বলছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান?
রিকশার পাদানিতে ফেলে গোলাম নাফিজকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টার সেই ছবি ছুঁয়ে যেন ছেলের স্পর্শ নিতে চাইছেন তার মা নাজমা আক্তার।

বিডিনিউজ২৪

ইমরান নাফিস

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Aug 2026, 12:49 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:54 PM

আর্থিক সুবিধা দেওয়াসহ নানা ‘প্রলোভন’ দেখিয়ে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ এবং শহীদ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করছে বলে দুই শহীদ পরিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।

মঙ্গলবার এই দুটি পরিবারের অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘অ্যাকশন ফর ইনোভেটিভ রিসোর্স লিমিটেড (এআইআর)’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এ কাজ করছে।

সম্প্রতি তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সিলেটের গোলাপগঞ্জে স্থানীয়দের হাতে আটক হয়েছেন এআইআর-এর এক কর্মী। একইভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও মিরপুরে দুই শহীদ পরিবারের কাছেও গিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা। 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলামের দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদ পরিবারগুলোকে ‘ভয়ভীতি’ দেখাচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে ‘বাধাগ্রস্ত’ করা।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে দাবি করেন, “এআইআর-এর পেছনে রয়েছে কানাডাভিত্তিক সংগঠন গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্স (জিসিডিজি)। আর এই সংগঠনটির শীর্ষ কর্তা হলেন সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. হাবিবে মিল্লাত।”

তবে এআইআর-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নূর হোসাইন দাবি করেছেন, “যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা জরিপ কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলেন। অভিযোগ ওঠায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”

মো. হাবিবে মিল্লাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেছেন।

ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ

চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ দেওয়ার পর শহীদ মিরাজ হোসেনের ছোট ভাই ও যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল পাভেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার কাছেও তথ্য চেয়ে যোগাযোগ করেছিল এআইআর-এর এক কর্মী। সিলেটের ঘটনা জানা থাকার কারণে আমি কোনো তথ্য দিইনি। আমার পরিচিত শহীদ পরিবারকেও জানিয়ে দিয়েছি তারা যেন কোনো তথ্য না দেয়।”

একই অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন মিরপুরের বাসিন্দা ও শহীদ শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফের বাবা নাসির উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুই-তিন দিন আগে একটি মেয়ে আমার বাসায় এসে বলেন, আমি একটি সার্ভে কোম্পানি থেকে এসেছি। কোন কোম্পানি থেকে এসেছেন, জানতে চাইলে মেয়েটি বলেন মিরপুর-১ নাম্বারে অবস্থিত এআইআর থেকে এসেছি। মেয়েটি মামলার কাগজ ও জাতীয় পরিচয়পত্র চাইলে আমার স্ত্রী সরল বিশ্বাসে সেগুলো দিয়ে দিই। পরে সিলেটের ঘটনা জানতে পেরে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ নিয়ে এসেছি।”

সিলেটে গ্রেপ্তার

কানাডার একটি সংস্থায় চাকরি করেন—এমন পরিচয়ে সিলেটের গোলাপগঞ্জ এলাকায় জুলাই শহীদদের তথ্য সংগ্রহ করছিলেন এআইআর-এর কর্মী পলাশী মজুমদার।

গত ২১ অগাস্ট কানিশাইল গ্রামে গিয়ে জুলাই শহীদ তাজ উদ্দিনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয়দের হাতে আটক হন পলাশী। পরে তাকে গোলাপগঞ্জ থানায় সোপর্দ করা হয়। 

পরদিন ২২ অগাস্ট পলাশীর বিরুদ্ধে ‘প্রতারণার’ অভিযোগে মামলা করেন আরেক জুলাই শহীদ জয় আহমেদের বড় ভাই মনোয়ার মিয়া।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, কানাডার একটি সংস্থায় কাজ করেন, এমন পরিচয় দিয়ে পলাশী মজুমদার জুলাই শহীদ পরিবারের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিভিন্ন তথ্য ও নথি সংগ্রহের কাজ করছিলেন। কানাডার ওই সংস্থাটির পক্ষ থেকে জুলাই শহীদ পরিবারের বাড়ি-ঘর নির্মাণসহ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলে তথ্য নিচ্ছিলেন তিনি।

এজাহারে বলা হয়েছে, পলাশী মজুমদারের কথায় সরল বিশ্বাসে শহীদ পরিবারের সদস্যরা জাতীয় পরিচয়পত্র, মামলার কপি ও সরকারি গেজেটের ফটোকপি তার হাতে তুলে দেন। 

২১ অগাস্ট দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে কানিশাইল এলাকায় শহীদ তাজ উদ্দিনের বাড়িতে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তার আচার-আচরণে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরবর্তীতে তার পরিচয় ও সংস্থার স্বপক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র প্রমাণে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ডেকে আনতে ব্যর্থ হলে উপস্থিত জনতা তাকে আটক করে গোলাপগঞ্জ থানা পুলিশে সোপর্দ করে।

গোলাপগঞ্জ থানার ওসি মো. ছাবেদ আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে মামলাটি ইতোমধ্যে জেলার গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়েছে। আর পলাশী মজুমদারকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর ওই দিনই আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।”

প্রধান কৌঁসুলি যা বলছেন

শহীদ পরিবারের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম দাবি করেন, সিরাজগঞ্জের সাবেক এমপি আওয়ামী লীগ নেতা হাবিবে মিল্লাত গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্স নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। কানাডা থেকে সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। 

তার দাবি, “এই সংগঠনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন রকমের কর্মীবাহিনী নিয়োগ করে থাকে। সেই কর্মীবাহিনী আওয়ামী লীগের নেতাদের নির্দেশে জুলাই শহীদ পরিবারের তথ্য নিতে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে ভোটার আইডি কার্ড, শহীদের তথ্য, শহীদের পিতা-মাতার তথ্য জোগাড় করছে। 

“মিরপুরে ‘অ্যাকশন ফর ইনোভেটিভ রিসোর্স লিমিটেড’ নামে গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্সের একটি সার্ভে কোম্পানি রয়েছে।”

তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার দাবি, “শহীদ পরিবারের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো অথবা জুলাই শহীদ পরিবারের মধ্যে ভয়ভীতি ছড়ানোর জন্য এই জাতীয় তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম চালানো হতে পারে বলে আমাদের নোটিস এসেছে। বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার জন্য হতে পারে।”

প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ইতোমধ্যে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, দুই-একদিনের মধ্যেই পুলিশের মহাপরিদর্শককে চিঠি দেবেন, যাতে এ বিষয়টি সব থানাকে অবহিত করা হয় এবং এ প্রতিষ্ঠানটিকে যদি বাংলাদেশে কোনো তৎপরতা চালাতে দেখা যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইনগত ব্যবস্থা নেয়।

সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবে মিল্লাতের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে শিগগিরই আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব।” 

আমিনুল ইসলাম বলেন, “এই কাজটা তারা একটা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে করছে। শহীদ পরিবারের মানুষ যাতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বিচারপ্রার্থী না হয় অথবা তারা যাতে সাক্ষ্য দিতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যেই এই কাজগুলো করে যাচ্ছে। এটি সুস্পষ্টভাবে আমাদের বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার শামিল।”

কী বলছে এআইআর

এআইআর এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর হোসাইন তথ্য সংগ্রহের কথা স্বীকার করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জুলাই-সংক্রান্ত গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছিলাম। তবে এ নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির অভিযোগ ওঠায় আপাতত পুরো কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছি। যেহেতু কমপ্লেইন আসছে, কাজ না করাটাই ভালো।”

সারা দেশেই তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল তুলে ধরে তিনি বলেন, “তথ্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ের জন্য মৃত্যুসনদ, আন্দোলনের ছবি, সংবাদ প্রতিবেদন, ভিডিও, হাসপাতালের নথি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা এ ধরনের প্রমাণ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।”

তার ভাষ্য, তথ্য সংগ্রহের কাজ বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত মূলত তা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ছিল এবং ১৫ থেকে ২০ দিন কাজ হয়েছিল।

গবেষণার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নূর হোসাইন বলেন, “সরকার, ইউএনডিপি ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার জুলাই-সংক্রান্ত নিহতের সংখ্যা ও তালিকায় পার্থক্য রয়েছে। জুলাই আন্দোলনে নিহত হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম এখনো সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিভিন্ন মিসইনফরমেশন আছে। আমাদের কাজের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যমান তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্য মিলিয়ে দেখা।”

এআইআর নিবন্ধনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “২০২৩ সালের ডিসেম্বরের দিকে লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। নিবন্ধন জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস থেকে নেওয়া হয়েছে।”

তবে নিবন্ধন নম্বর জানাতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে হাবিবে মিল্লাতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “এটা কোনো অবস্থাতেই নাই। এটা ব্যাক ডেটেড না, আপনারা যাচাই-বাছাই করেন। আমি তাকে চিনি না এবং পূর্বে তার নামও শুনি নাই।”

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এআইআর গবেষণার কাজটি পেয়েছেন বলে দাবি তার।

তবে গবেষণা প্রস্তাব আছে কি না জানতে চাইলে নূর হোসাইন বলেন, এ সংক্রান্ত কিছু নেই।