Published : 21 Oct 2024, 10:52 AM
মেট্রোরেলের একক যাত্রার যে ২ লাখ টিকেট যাত্রীরা জমা না দিয়ে নিয়ে গেছেন, সেগুলো ফিরে পাওয়ার আশায় স্টেশনে স্টেশনে বাক্স বসানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার থেকে এই উদ্যোগের এখনও সেভাবে সুফল না মিললেও মেট্রোরেল পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড-ডিএমটিসিএল আশা করছে, এর প্রচার বাড়লে আরও টিকেট ফেরত পাওয়া যাবে।
গত ১৪ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ সাংবাদিকদেরকে জানান, একক যাত্রার দুই লাখ টিকেট যাত্রীরা নিয়ে গেছেন।
সেদিন একক যাত্রার মোট টিকেটের সংখ্যা ২ লাখ ৪৮ হাজার জানানো হলেও পরে সংখ্যাটি সংশোধন করা হয়। জানানো হয়, একক যাত্রার টিকেট ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার। এই টিকেটের মধ্যে ১৩ হাজার নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এখন এক লাখ টিকেট আছে।
তিন ভাগের এক টিকেট থাকায় যাত্রীরা একক যাত্রার টিকেট কিনতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ছেন। যাত্রীর ভিড় বেশি হলে প্রায়ই তাদের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
এই অবস্থায় ডিএমটিসিএল ২০ হাজার টিকেট জাপানের সনি কোম্পানি থেকে আনিয়েছি। তবে তা সংকট মেটানোর জন্য যথেষ্ট না। প্রতিটি টিকেটের পেছনে খরচ গেছে দেড়শ টাকা।
গত ১৪ অক্টোবরই ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিকেট ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংবাদ মাধ্যমে বক্তব্য রেখেছিলেন। পরে এই বাক্সগুলো বসানো হয়।

এমনিতে নিয়ে যাওয়া টিকেট জমা দিলে জরিমানার বিধান থাকলেও যারা বক্সে দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের কোনো ধরনের জরিমানা করা হচ্ছে না।
রোববার মেট্রোরেলের আগারগাঁও স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, টিকেট ফেরত পেতে দুটো বাক্স বসানো আছে। বাক্স দুটি আগের দিন বসানো হয় বলে জানিয়েছেন টিকেট মেশিন অপারেটর।
নাম প্রকাশ না করে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মানুষ জমা দিয়ে যাচ্ছে। কেমন পড়ছে তা বলা যাচ্ছে না, রাতে চেক করা হয় তো।”
পল্লবী স্টেশনে গিয়ে অবশ্য টিকেট জমা দেওয়ার কোনো বাক্স দেখা যায়নি। যেসব যাত্রী টিকেট নিয়ে গেছেন তারা কাউন্টারে জমা দিয়ে যাচ্ছে বলে জানান সেখানকার টিকেট মেশিন অপারেটর সালেহ উদ্দিন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঘোষণার পর থেকে কম বেশি কার্ড জমা পড়েছে। অনেক কার্ড আসছে।”
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মেট্রোরেলের ১৬টি স্টেশনে দুটি করে মোট ৩২টি বাক্স বসিয়েছেন তারা।
পল্লবী স্টেশনে বাক্স না দেখার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “আমি চেক করবনে; আমাকে বলল যে, সব স্টেশনে বসানো হয়েছে।”
এখন পর্যন্ত কতগুলো কার্ড পাওয়া গেছে জানতে চাইলে তিনি রলেন, “রোববার রাত পর্যন্ত দুইশর কাছাকাছি টিকেট পাওয়া গেছে।”
যাত্রীদের মধ্যে যারা টিকেট ফেরত দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে পোস্ট করতেও দেখা যাচ্ছে।
নাঈম ইসলাম খন্দকার নামে একজন শনিবার লিখেছেন, “আমার কাছেও একটা ছিল, আজকে ফার্মগেট গিয়ে ফেরত দিয়ে আসলাম।“

এম অর্ক নামে একটি আইডি থেকে রোববার লেখা হয় “আজকে অফিস থেকে আসার পথে ২টা কার্ড পেলাম স্টেশন এর নিচে। পরে কাউন্টারে জমা দিয়ে আসলাম। এই কার্ড বাতিল করা উচিত।”
কর্তৃপক্ষের মত যাত্রীরাও টিকেট ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মেট্রোরেল বিষয়ক গ্রুপে পোস্ট করছেন।
একজনকে আবার প্রশ্ন করতে দেখা গেল, টিকেট ফেরত দিতে কোনো জরিমানা দিতে হয় কি না।
যেভাবে নিয়ে গেল এত টিকেট
মেট্রোরেলে দুই ধরনের টিকেট আছে। এমআরটি পাস কিনে শুধু রিচার্জ করে যাত্রীরা ট্রেনে চড়তে পারেন। যতক্ষণ কার্ডে টাকা থাকে ততক্ষণ ট্রেনে চড়া যায়। সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা রিচার্জের সুযোগ আছে।
এভাবে কার্ড করে চলাচলে ১০ শতাংশ ছাড়ও মেলে। এই কার্ড পাঞ্চ করে স্টেশন থেকে বের হতে হয়। পাঞ্চ মেশিনেই ভাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হয়।
আর একক যাত্রার টিকেট কেটে গন্তব্যে যাওয়া যায়। এই একক যাত্রার টিকেট মেশিনে ঢুকিয়ে বের হতে হয়। এ টিকেট মেশিনে দিলেই শুধু স্টেশন থেকে বের হওয়ার সুযোগ থাকে।

তবে একজন টিকেট দেওয়ার পর তার সঙ্গে বের হয়ে যাওয়া যায়, এমন সুযোগই নিয়ে থাকেন টিকেট নিয়ে বের হতে চাওয়া যাত্রীরা।
মেট্রোরেলভিত্তিক বিভিন্ন ফেইসবুক গ্রুপে যাত্রীরা প্রায়ই ‘মজার ছলে’ বা ইচ্ছে করে টিকেট এভাবে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে পোস্টও করেছেন। কেউ কেউ ‘স্মৃতি হিসেবে’ টিকেট নিজের কাছে রেখে দেওয়ার কথা বলছেন।
টিকেট নিজের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে পরে ফেইসবুকে বিষয়টি নিয়ে পোস্টকারীদের একজন শাকির মাহমুদ বলেন, গত দুই বছরে যাত্রা শেষে তিনি পাঁচটি টিকেট জমা দেননি।
“একজন বের হলে তার পেছনে পেছনে চলে যাওয়া যায়; কেউ দেখে না। সে কারণে মজা করে নিয়ে আসছি। আর আমি তো টিকেটের টাকা দিয়েছিই।”
পল্লবী মেট্রো স্টেশনের একজন টিকেট মেশিন অপারেটর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কোথাও যাওয়ার সময় যাত্রীরা একাধিক টিকেট কাটে; তখন তাদের কাছে টিকেট থেকে যায়।”

আগারগাঁও মেট্রো স্টেশনে টিকেট জমা দেওয়ার মেশিনের দায়িত্বে থাকা এক নারী নিরাপত্তা কর্মী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একেক জায়গায় তিনটি করে পিজির (কার্ড জমা দেওয়ার জায়গা) বিপরীতে কেবল একজন নিরাপত্তা কর্মী থাকে। ফলে তার একার পক্ষে সবার দিকে নজর রাখা সম্ভব হয় না।
“সেই ফাঁকে লোকজন টিকেট নিয়ে চলে যায়। আর একজনের পেছনে আরেকজন যাত্রী চলে যায়। ভিড় যখন বেশি হয়, তখনই এমনটা হয়।”
বিপুল পরিমাণ এই টিকেট হারিয়ে যাওয়া বা যাত্রীরা নিয়ে যাওয়ার কারণে এখন টিকেট সংকট তৈরি হয়েছে। টিকেট কম থাকার কারণে অনেক ভেন্ডিং মেশিন থাকছে বন্ধ। লম্বা সময় টিকেটের অপেক্ষায় যাত্রীদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
যাত্রীদের এই প্রবণতার কারণে টিকেট পদ্ধতি পরিবর্তনের কথাও ভাবছে ডিএমটিসিএল। তবে সেটি কী হতে পারে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলছেন, “কিউআর কোড হতে পারে, কয়েন সিস্টেম হতে পারে।”
আরও পড়ুন:
মেট্রোরেল: একক যাত্রার আড়াই লাখ টিকেটের দুই লাখই নিয়ে গেছে যাত্রীরা