২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

যুক্তরাজ্যে শওকতের ২৫ মিলিয়ন ডলার: বিএফআইইউ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রশ্নে রুল

“শুধু বিএফআইইউ—তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে এই ২৫ মিলিয়ন ডলার হারালাম, যেটি আমরা উদ্ধার করে আনতে পারতাম,” বলেন রিটকারীর আইনজীবী সানজিদ সিদ্দিকী।

যুক্তরাজ্যে শওকতের ২৫ মিলিয়ন ডলার: বিএফআইইউ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রশ্নে রুল
শওকত আলী চৌধুরী

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2026, 04:34 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:32 PM

ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে থাকা ২৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনার বিষয়ে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাই কোর্ট।

একইসঙ্গে এ অর্থ স্থানান্তর ও অর্থপাচারের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ এইচ এম রেজওয়ানুল সাইদ দুদকে যে আবেদন করেছিলেন তা ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. হামিদুর রহমান নেতৃত্বাধীন হাই কোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।

মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও এর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং শওকত আলী চৌধুরীকে বিবাদী করা হয়েছে।

আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ আলী, সৈয়দ মামুন মাহবুব ও এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।

ব্যারিস্টার সানজিদ সিদ্দিকী বলেন, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে থাকা সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে দেশটির ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) শওকত আলী চৌধুরীর নামে একটি ব্যাংক হিসাবে ২৫ মিলিয়ন ডলারের ‘আনডিসক্লোজড ফান্ড’ পায়।

রিট আবেদনে বলা হয়, শওকত আলী সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের নাগরিক এবং এস আলম নামে পরিচিত সাইফুল আলমের সহযোগী। অর্থের উৎস সম্পর্কে এনসিএকে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পাশাপাশি তদন্তের সময় শওকত ওই অর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের মাশরেক ব্যাংক ও এমিরেটস এনবিডিতে স্থানান্তরের চেষ্টা করেন।

তখন যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ সন্দেহজনক ওই লেনদেন সাময়িকভাবে আটকে রেখে বিএফআইইউকে বিষয়টি জানায়। 

মামলায় বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের তরফে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে ওই অর্থ বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে এবং সেজন্য চার সপ্তাহ সেই অর্থ আটকে রাখা হবে বলে এনসিএ জানিয়েছিল। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে বিএফআইইউ আর এনসিএর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি এবং বাংলাদেশ সরকারও কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি।

ব্যারিস্টার সানজিদ সিদ্দিকী বলেন, এরপর এনসিএ ওই ২৫ মিলিয়ন ডলার ছেড়ে দেয় এবং শওকত তা দুবাইয়ে তার হিসাবে স্থানান্তর করেন। পরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শওকতের ওই বিদেশি সম্পদের বিষয়ে অবগত হয়। শওকত পরে আয়কর রিটার্নে বিদেশে থাকা ২৫ মিলিয়ন ডলারকে সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেন।

রিট আবেদনে বলা হয়েছে, এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বৃহৎ করদাতা ইউনিটে ১৩৬ কোটি টাকা আয়কর এবং ৩০৬ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দেন শওকত। 

তবে ওই অর্থের উৎস এবং কীভাবে তা বিদেশে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে দুদক বা অন্য কোনো তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করেনি বলে আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

বিদেশি সম্পদ ঘোষণা করে কর ও জরিমানা দেওয়া হলেও অর্থের উৎস ও বিদেশে স্থানান্তরের পদ্ধতি অনুসন্ধান করা হয়নি দাবি করে রিট আবেদনে বলা হয়েছে, শওকতের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(১) ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারার অপরাধের বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারত।

ব্যারিস্টার সানজিদ বলেন, “গত ১৩ অগাস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রেজওয়ানুল সাইদ শওকতের বিরুদ্ধে ২৫ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাজ্য থেকে দুবাইয়ে স্থানান্তরের বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য দুদক ও বিএফআইইউতে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু বিএফআইইউ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ২৩ ধারায় দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি।”

এনসিএর তথ্য ও নথি থাকার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি এবং আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে অভিযোগ করে এই আইনজীবী বলেন, “এজন্য যেহেতু বাংলাদেশ সরকারকে একটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা এই সুযোগটি নিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিএফআইইউর যারা কর্মকর্তা, যারা এই অবহেলার সাথে জড়িত এবং যারা সঠিক সময়ে কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে বাংলাদেশের এই অর্থটি বাইরের দেশেই রয়ে গেল, তাদের বিরুদ্ধে আমরা একটা ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিংস চেয়েছি।”

দুটি সংবাদ প্রতিবেদন যুক্ত করে রিটে আবেদনে যুক্তরাজ্যের এনসিএর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৫ মিলিয়ন ডলার ফ্রিজ বা জব্দে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া, বিদেশি অর্থের উৎস ও বিদেশে স্থানান্তরের পদ্ধতি তদন্ত না করা এবং অর্থপাচারের অভিযোগে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়াকে কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারির আরজি জানানো হয়।

একইসঙ্গে এনসিএর তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া বিএফআইইউ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়। এছাড়া রিট আবেদনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদন্ত শুরু করে আদালতের আদেশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা চাওয়া হয়।

রুল জারির বিষয়ে সানজিদ বলেন, “হাই কোর্ট রুল দিয়েছেন যে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের যে কর্মকর্তারা, যাদের ব্যর্থতার কারণে আজকে টাকাটি বাংলাদেশে ফেরত আনা গেল না, তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।

“শুধু বিএফআইইউ—তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে এই ২৫ মিলিয়ন ডলার হারালাম, যেটি আমরা উদ্ধার করে আনতে পারতাম।”