Published : 23 Jul 2025, 06:53 PM
জনতা ব্যাংকে নিজের মেয়াদকালে ‘সর্বোচ্চ মুনাফা’ হয়েছে বলে আদালতের কাছে দাবি করেছেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত।
বুধবারের শুনানিতে তিনি বলেছেন, “আমার সময় জনতা ব্যাংকের সর্বোচ্চ প্রফিট (মুনাফা) হয়েছে; সর্বোচ্চ গ্রোথ হয়েছে। আর বলা হচ্ছে আমি নাকি জনতা ব্যাংক ডুবিয়েছি।”
ঋণ জালিয়াতির মামলায় এদিন ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে রিমান্ড শুনানি হয় এ অর্থনীতিবিদের।
১০ জুলাই রাতে ধানমন্ডির বাসা থেকে অধ্যাপক আবুল বারকাতকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
পরের দিন তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মম শাহজাহান মিরাজ।
তবে মামলায় জামিন বা রিমান্ড শুনানির এখতিয়ার সিএমএম আদালতের না থাকায় তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার মহানগর হাকিম মো. জুয়েল রানা।
পরে দুদকের পক্ষ থেকে মামলা শুনানির জন্য মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতে নেওয়া হয়। আজ তাকে মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতে হাজির করা হয় রিমান্ড ও জামিন শুনানির জন্য। তবে ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ জাকির হোসেন গালিব রিমান্ড শুনানি গ্রহণ করেননি। তিনি জামিন শুনানি গ্রহণ করেন। পরে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করেন। আর রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য মামলাটি সিএমএম আদালতে পাঠান।
পরে বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে তাকে সিএমএম আদালতে তোলা হয়। কাঠগড়ায় তোলা হলে আগে থেকে আদালতে বসে থাকা দুই মেয়ে বাবার কাছে যান। তখন এজলাসে বিচারক ছিলেন না। এসময় বড় মেয়ের কোলে থাকা নাতিকে কোলে নেন বারকাত।
বড় মেয়ের সঙ্গে কথা বলা শেষে ছোট মেয়েকে কাছে ডাকেন এ অর্থনীতিবীদ। পরে ৩ টা ৪২ মিনিটে ছোট মেয়ের মাথা নিজের বুকে টেনে নেন।
এরপর বিচারক এজলাসে উঠবেন বলে আদালতের কর্মচারি সবাইকে জোরে ডেকে হুশিয়ারি করেন। এসময় বাবার কাছ থেকে মেয়েরা চলে গিয়ে পেছনে বেঞ্চে বসেন।
বিকাল ৩ টা ৪৮ মিনিটে বিচারক এজলাসে এলে রিমান্ড শুনানি শুরু হয়।
দুদকের পক্ষে প্রসিকিউটর (পিপি) মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর আসামির ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের পক্ষে শুনানি করেন।
তিনি আদালতকে বলেন, আবুল বারকাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবীদ। জনতা ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি ২৯৭ কোটি টাকার অবৈধ ঋণ জালিয়াতি করেছেন। তিন কোটি টাকার সম্পদের বিপরীতে এত কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করেন। ব্যাংক উন্নত না করে ঋণে পর্যবসিত করেছেন। তার রিমান্ড প্রয়োজন।
আবুল বারকাতের আইনজীবী শাহিনুর রহমান তখন রিমান্ডের বিরোধিতা করেন।
পরে আদালত আবুল বারকাতের বক্তব্য শুনতে চান।
তিনি বলেন, “জীবনে প্রথম এভাবে আদালতে দাঁড়িয়ে আছি। আমি একজন শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪২ বছর শিক্ষকতা করেছি। ঘটনাচক্রে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হই। এটাও অর্থনীতি বিভাগে পড়ে। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বপালনকালের যত কথা বলা হচ্ছে, লোনের বিষয়ে বলা হচ্ছে আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। গত ২০ ফেব্রুয়ারি বাসায় বসে টেলিভিশনের স্ক্রলে মামলার বিষয়ে জানি।”
এ অর্থনীতিবিদ বলেন, চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে দুই শতাধিক বোর্ড মিটিং করেছি। এরমধ্যে এই ঋণের বিষয়টাও ছিল। পরে বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকে এনওসির জন্য পাঠাই। এ মামলায় যাদের নাম বলা হচ্ছে, তা প্রশ্নাতীত। ব্যাংকে যারা ছিলেন, তাদের নাম শুনেছি, চিনি না।
“চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে ২০১৩ সালে আমার সময়ে জনতা ব্যাংকের সর্বোচ্চ প্রফিট (লাভ) হয়েছে, সর্বোচ্চ গ্রোথ হয়েছে। আর বলা হচ্ছে আমি জনতা ব্যাংক ডুবিয়েছি, সর্বনাশ করেছি। জেনেশুনে আদৌ আমি কিছু করিনি।”
এসময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামছুদ্দোহা সুমন আদালতকে বলেন, “দুইটা ব্যাংক- বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জনতা ব্যাংককে ধ্বংস করেছে। রিমান্ডে নিলে তথ্য বের হবে।”
একথা শুনে হাসেন আবুল বারকাত।
শামছুদ্দোহা সুমন বলেন, “তাকে রিমান্ডে নিলে ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জয়, সুভাষ সিংহ, হাসিনা, রেহানাসহ অনেকের নাম বের হয়ে আসবে।”
পরে আদালত বলেন, “বিপুল পরিমাণ ঋণ জালিয়াতির ঘটনা। যে প্রপার্টির জন্য ঋণ দেওয়া হয়েছে তা খুব কম। এমন ঘটনা নজীরবিহীন। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে তার অ্যাকশন নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। তার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হল, যা পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করতে হবে।”
জালিয়াতির মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে অ্যাননটেক্স গ্রুপের নামে ২৯৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি এ মামলা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, আবুল বারকাতসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন দুদকের উপপরিচালক নাজমুল হুসাইন।