Published : 12 Jul 2025, 08:25 PM
পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে মাথা থেঁতলে হত্যার ঘটনায় দুই আসামি তারেক রহমান রবিন এবং টিটন গাজী দুজনেই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।
আদালতে জবানবন্দি দেওয়া অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার রবিন বলেছেন ‘তিনি ফেঁসে গেছেন’; আর টিটনের ভাষ্য, ব্যবসায়ী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে তিনি কোনো ‘আঘাত’ করেননি বা অন্য কাউকে মারধরের নির্দেশও দেননি।
দুই দিনের রিমান্ড শেষে রবিন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা কোতয়ালী থানার এসআই মনির হোসেন জীবন। রবিন এই ঘটনায় পুলিশের করা অস্ত্র মামলার আসামি।
ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিব উল্লাহ গিয়াস রবিনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
রবিন পরে সাংবাদিকদের বলেন, “আমি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না। আমি দোষী, সারা বাংলাদেশের মানুষ জেনে গেছে।”
তার কাছ থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রবিন বলেন, আর ৮ দিন পর তার পর্তুগালের ফ্লাইট, বিদেশ যাওয়ার জন্য তার ২২ লাখ টাকা এ বাবদ খরচ হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের জড়িতদের কারো সঙ্গে তার ‘সম্পর্ক নেই’ জানিয়ে রবিন বলেন, “আমি ফাইসা গেছি। ঘটনাস্থলে ছিলাম না। সন্দেহের কারণে আমাকে গ্রেপ্তার করেছে। আমার জীবনটা শেষ। আম্মু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। আর কিছু বলতে চাই না।”
বুধবার বিকালে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের সামনে প্রকাশ্যে কংক্রিট বোল্ডার দিয়ে শরীর ও মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয় ভাঙারি ও পুরনো তারের ব্যবসায়ী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে। এরপর এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
এ ঘটনায় তার বড় বোন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। আর পুলিশ দায়ের করেছে অস্ত্র মামলা।
এই ঘটনায় পুলিশ ও র্যাব চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে, তাদের মধ্যে দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে পাঠিয়েছিল আদালত। তারা হলেন, মাহমুদুল হাসান মহিন ও তারেক রহমান রবিন
রিমান্ড শেষে রবিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেন।
এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের পাঁচজনকে বহিষ্কারের কথা জানিয়েছে বিএনপি।
এ দিন আদালতে রিমান্ডের শুনানির সময় টিটন গাজী বলেছেন, তিনি ওই ঘটনার সময় কেবল দাঁড়িয়ে ছিলেন।
একজনের ফোন পেয়ে সেখানে যাই, আমি আঘাত করিনি
টিটনের সাত দিনের রিমান্ডে চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতয়ালী থানার ইন্সপেক্টর নাসির উদ্দিন।
আবেদনে বলা হয়, “ভাঙারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ৯ জুলাই বিকেল পৌনে ৬টার দিকে টিটন গাজীসহ অন্যান্যরা মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ব্যবসায়ী মো. সোহাগকে এলোপাতারি মারধর করতে থাকে। লাঠি, হেলমেট, ইটও সিমেন্টের কংক্রিট দিয়ে মাথায় ও শরীরে আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। মৃতদেহের ওপর লাথি মারে এবং লাফিয়ে লাফিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে। যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এমন দৃশ্য জনমনে এক আতঙ্ক সৃষ্টি করে, যার ফলে বিভিন্ন সংগঠন এমন হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং জড়িতদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। এ আসামি মামলার ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।"
এদিন দুপুর আড়াইটার দিকে টিটনকে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় এনে রাখা হয়। দুপুর ৩টা ৩৮ মিনিটের দিকে তাকে এজলাসে তোলা হয়। কাঠগড়ার সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকেন টিটন।
৩টা ৫৩ মিনিটের দিকে বিচারক এজলাসে ওঠেন।
রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর কাইয়ুম হোসেন নয়ন রিমান্ড মঞ্জুরের পক্ষে শুনানি করেন।
তিনি বলেন, “আসামি এজাহারনামীয়। কোতয়ালী-বংশাল এলাকায় ভাঙ্গারীর ব্যবসার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে, চাঁদা তোলা নিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর আগে চাঁদা না দিলে ভিকটিমকে জীবন নাশের হুমকি দেয়া হয়। ভাঙারি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওতে দেখলাম, পাশবিকভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে ইট, রড, সিমেন্ট, পাথর নিয়ে হামলা করে। আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগের কথা শুনেছি, এবার তা দেখলাম। লাশের উপর নৃত্য করার দৃশ্যও দেখলাম। তার সর্বোচ্চ রিমান্ড মঞ্জুরের প্রার্থনা করছি।”
এপর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা টিটন গাজীকে সামনে ডেকে আনেন বিচারক, তার আইনজীবী আছে কি না তা জানতে চান।
টিটন জানান, তার কোনো আইনজীবী নেই।
এরপর তার কোনো বক্তব্য আছে কি না জানতে চাইলে টিটন গাজী আদালতকে, “যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছে, মনোযোগ সহকারে দেখবেন। আমি কোনো আঘাত বা মারধর করিনি। ভিডিওতে দেখবেন, আমি পেস্ট কালারের গেঞ্জি পড়া। আমার এ ঘটনায় কোনো ভূমিকা ছিল না। আমি কাউকে মারার হুকুম দেয়নি। শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম।"
পরে আদালত টিটনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।
বিচারক এজলাস থেকে নেমে যাওয়ার পর টিটন গাজী জানিয়েছেন, মনির নামের একজন তাকে ফোন দেন। সেই ফোন পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। তবে কি কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা জানা নেই বলে ভাষ্য টিটনের।
প্রকাশ্যে মাথা থেঁতলে হত্যা: রবিনের স্বীকারোক্তি, রিমান্ডে আরেকজ
মিটফোর্ডে ব্যবসায়ী খুনের দুই মামলায় ২ জন রিমান্ডে
হত্যা-জখম: 'অ্যাকশনতো' হচ্ছে 'সঙ্গে সঙ্গে', বললেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
মিটফোর্ডে ব্যবসায়ী হত্যার বিচার হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে: আই
প্রকাশ্যে মাথা থেঁতলে হত্যা: চারজন গ্রেপ্তার, বহিষ্কার বিএনপির ৫ জন
মিটফোর্ডে হাসপাতালের সামনে ব্যবসায়ীকে মাথা থেঁতলে হত্যা
সরকার 'প্রশাসনকে নিষ্ক্রিয়' রেখেছে যাতে অরাজক পরিস্থিতি থাকে: যুব