নতুন প্রজ্ঞাপনে কমিশনের তদন্তের জন্য বিবেচ্য ঘটনা ঘটার সময় বাড়ানো হয়েছে।
Published : 15 Sep 2024, 11:21 PM
ক্ষমাতচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ‘গুমের’ ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশনের উদ্দেশ্য ও দায়িত্বে পরিবর্তন এনেছে সরকার।
ওই কমিশন গঠন করে গত ২৭ অগাস্টের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ। তবে হাই কোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিশন আগের মতই রয়েছে।
রোববার নতুন প্রজ্ঞাপনে কমিশনের তদন্তের জন্য বিবেচ্য ঘটনা ঘটার সময় বাড়ানো হয়েছে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৫ অগাস্ট সরকার পতনের দিন পর্যন্ত সময়ের ঘটনা কমিশনের বিবেচনায় আনা যাবে। এর আগে সময়টি ছিল শুরুতে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি ৫ অগাস্ট পর্যন্ত।
তদন্ত কমিশনকে সময় দেওয়া হয়েছে নতুন প্রজ্ঞাপনের দিন থেকে তিন মাস।
কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য তুলে ধরে নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, তদন্তকারী সংস্থা এবং অনুরূপ যে কোনো বাহিনী বা সংস্থার কোনো সদস্য বা সরকারের মদদে, সহায়তায় বা সম্মতিতে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তি-সমষ্টি কর্তৃক 'আয়নাঘর' বা যেকোনো জ্ঞাত বা অজ্ঞাত স্থানে বলপূর্বক গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান, বলপূর্বক গুমের ঘটনার সহিত জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিতকরণ ও তাহাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ প্রদান এবং বলপূর্বক গুম হওয়ার ঘটনা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের সুপারিশসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যাদি” সম্পাদনের জন্য এই কমিশন গঠন করা হয়েছে।
আগের প্রজ্ঞাপনে উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল, “আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থা তথা বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বিশেষ শাখা, গোয়েন্দা শাখা, আনসার ব্যাটালিয়ন, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা বাহিনী, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), কোস্ট গার্ডসহ দেশের আইন প্রয়োগ ও বলবৎকারী কোনো সংস্থার কোনো সদস্য কর্তৃক জোরপূর্বক গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানের” জন্য এ কমিশন।
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনকালে ‘ক্রসফায়ারের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নেওয়ার পর লাশ উদ্ধার বা নিখোঁজের ঘটনাগুলো আলোচনায় ছিল।
এসময় হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন, গোপন বন্দিশালায় দীর্ঘদিন আটকে রাখার ঘটনাগুলোও উঠে আসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে ‘আয়নাঘর’ নামে গোপন বন্দিশিবির তৈরি করে নির্যাতনের অভিযোগও আসে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
গুমের ঘটনা তদন্তে কমিশন করল সরকার
'গুম হওয়া' ৬৪ জনের তালিকা গেল তদন্ত কমিশনে
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ অগাস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ‘গুমের’ এসব ঘটনা তদন্ত কমিশন গঠনের কথা বলে আসছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। জাতিসংঘের গুম বিষয়ক কনভেনশনে পক্ষভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।
জাতির উদ্দেশে গত ২৬ অগাস্ট দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ সরকারি বাহিনীর যে সদস্যরা ‘গুম, খুন, নির্যাতনের’ মত অপরাধে যুক্ত ছিলেন, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদী সরকারের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, অপহরণ এবং আয়নাঘরের মত চরম ঘৃণ্য সকল অপকর্মের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত সকলের বিচার নিশ্চিত করা হবে। তালিকা প্রস্তুত করে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে। দুর্নীতি ও সম্পদ পাচারের বিচার করা হবে।”
পাঁচ সদস্যের কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন হাই কোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, মানবাধিকার কর্মী নূর খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাবিলা ইদ্রিস ও মানবাধিকার কর্মী সাজ্জাদ হোসেন।
গুমের তথ্য চেয়ে গণবিজ্ঞপ্তি কমিশনের
জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদে বাংলাদেশ
গুম: জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত চান ফখরুল
কমিশনের কার্যপরিধি হিসেবে নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ”বিগত ৬ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখ থেকে ৫ অগাস্ট ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, তদন্তকারী সংস্থা এবং অনুরূপ যে কোনো বাহিনী বা সংস্থার কোনো সদস্য বা সরকারের মদদে, সহায়তায় বা সম্মতিতে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তি-সমষ্টি কর্তৃক 'আয়নাঘর' বা যে কোনো জ্ঞাত বা অজ্ঞাত স্থানে বলপূর্বক গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান, তাহাদের সনাক্ত করা এবং কোন পরিস্থিতিতে গুম হইয়াছিল উহা নির্ধারণ করা, এবং সে উদ্দেশ্যে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যসহ যে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের নিকট হইতে তথ্য সংগ্রহ করা।”
বলপূর্বক গুম হওয়ার ঘটনাগুলোর বিবরণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিল করার পাশাপাশি এক্ষেত্রে সুপারিশ প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কমিশনকে।
প্রজ্ঞাপনে কমিশনের কার্যপরিধিতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান পাওয়া গেলে তাহাদের আত্মীয়স্বজনকে অবহিত করা; গুম হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে অন্য কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত তদন্তের তথ্য সংগ্রহ করা; গুম হওয়ার ঘটনার সহিত জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা এবং তাহাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ প্রদান করা এবং গুম হওয়ার ঘটনা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, “তদন্ত কমিশন বাংলাদেশের যে কোন স্থান পরিদর্শন এবং যে কোন ব্যক্তিকে কমিশনে তলব করিতে ও জিজ্ঞাসাবাদ করিতে পারিবে।”
তদন্তকাজ শেষ করে এই প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে তিন মাসের মধ্যে সরকারের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে কমিশনকে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তদন্ত কমিশনকে সাচিবিক সহায়তাসহ সকল প্রকার সহায়তা প্রদান করিবে ও কমিশনের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করিবে এবং কমিশনকে সহায়তার উদ্দেশ্যে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত যে কোনো ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করিতে পারিবে।
“তদন্ত কমিশনের সভাপতি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারক এবং কমিশনের সদস্যগণ হাই কোর্ট বিভাগের একজন বিচারকের মর্যাদা এবং অন্যান্য সুবিধা ভোগ করিবেন।”