১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

পঞ্চদশ সংশোধনীর কতটুকু টিকবে? রায় বৃহস্পতিবার

হাই কোর্ট ওই সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল করেছিল। বাদীপক্ষ তাতে সন্তুষ্ট না হওয়ায় বিষয়টি আপিল বিভাগে আসে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Jul 2026, 11:13 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:36 PM

আওয়ামী লীগ আমলে সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছিল যে সংশোধনীর মাধ্যমে সেই পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপরি বাতিল হবে কি না, সে বিষয়ে বৃহস্পতিবার সিদ্ধান্ত দেবে সর্বোচ্চ আদালত।

এ মামলার আপিল শুনানিতে পক্ষগুলোর যুক্তি শোনার পর বুধবার প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ রায়ের এই দিন ঠিক করে দেয়।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পাশাপাশি সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা একটি রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করে হাই কোর্ট।

ওই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হয়। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রিটকারীপক্ষ।

পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এবং মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়ে আলাদাভাবে আপিল করেন।

গত সোমবার প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে এ মামলার শুনানি শুরু হয়। তিন দিনের শুনানিতে পক্ষগুলো তাদের মতামত তুলে ধরে।

যৌথ এই শুনানিতে রিট আবেদনকারী বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি করেন শরীফ ভূঁইয়া। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শিশির মনির। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিকী। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে শুনানি করেন শাহরিয়ার কবির।

এদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক এবং অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।

কী বলছে রিটকারী পক্ষ

পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিলের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরে রিটকারীপক্ষের আইনজীবী শরীফ ভূইয়া সাংবাদিকদের বলেন, "শুনানিতে অধিকাংশ আইনজীবী বলছেন যে এটা পুরোটা বাতিল করা ঠিক হবে না, কারণ এতে কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে।

“সেটার উত্তর আমি দিয়েছি যে, সংশোধনীটা একটা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সংবিধানকে ধ্বংস করার জন্য করা হয়েছে।"

ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করা হয়েছে মন্তব্য করে এই আইনজীবী বলেন, “দেশে একটা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা চালু করার জন্য এটা করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনী পাস করার আর যে সুরক্ষা আছে সেগুলো এখানে অনুসরণ করা হয়নি।”

সংশোধনী পাসের প্রক্রিয়ায় নানা ‘ত্রুটির’ কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "সংসদে কোনো বিতর্ক হয়নি, সংসদীয় কমিটির মতামত একজনের ইচ্ছায় উপেক্ষা করা হয়েছে। তো এ ধরনের অনেক সমস্যা আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা হচ্ছে যে, এটাতে জনগণের মতামত গণভোটের মাধ্যমে নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কোনো গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি।"

সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, " এই সংশোধনী গণভোটে দেওয়ার কথা ছিল। আমাদের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে আছে যদি এমন কোনো সংশোধনী করা হয় যেটার মাধ্যমে গণভোট প্রয়োজন, অর্থাৎ এরকম কোনো অনুচ্ছেদে সংশোধনী আনা হয়, তাহলে শুধুমাত্র ওই অনুচ্ছেদের বিষয় না, পুরো সংশোধনী বিলটাই কিন্তু গণভোটে জনগণের কাছে পাঠাতে হয়। সে হিসেবে পঞ্চদশ সংশোধনীতেও কিন্তু গণভোট প্রয়োজন।"

গণভোট না হওয়ার কারণে পুরো সংশোধনীটিই ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ দাবি করে তিনি বলেন, "যদি সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হত, তাহলে জনগণের কাছে যে প্রশ্নটা যেত, সেটা হল—জনগণ পঞ্চদশ সংশোধনী সমর্থন করে কিনা। এই ভোটের ফলাফল যদি 'না' হত, তাহলে কিন্তু এই সংশোধনী সেখানেই বাতিল হয়ে যেত।"

কিছু বিষয় বাদ দিলে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে শরীফ বলেন, "এই পঞ্চম সংশোধনী কিন্তু হাই কোর্ট বাতিল করে এবং পরে হাই কোর্টের রায় স্থগিত হলেও আপিল বিভাগ ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই বাতিলটা বহাল রাখে।

“কাজেই ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কিন্তু আমাদের সংবিধানে বিসমিল্লাহ ছিল না—পঞ্চদশ সংশোধনী হওয়া পর্যন্ত, ২০১১ সালের জুন মাস পর্যন্ত। দেড় বছর বিসমিল্লাহ কিন্তু আপিল বিভাগের রায়ের কারণে সংবিধানে ছিল না; তাতে তো কোনো সমস্যা হয়নি, আমরা বাংলাদেশে যারা মুসলমান, তারা অমুসলিম হয়ে যাইনি।"

তিনি বলেন, " এখন নির্বাচিত সংসদ আছে, তারা দ্রুততম সময়ে এই শূন্যতাগুলো পূরণ করতে পারে। আগে তো দেড় বছর লেগেছে পূরণ করতে, এখন আরো দ্রুততম সময়ে করা যেতে পারে। কাজেই এই ছোটখাটো বিষয়ের কারণে একটা অবৈধ সংশোধনীকে 'অবৈধ' না বলাটা হবে আদালতের ক্ষেত্রে তার যে কর্তৃত্ব আছে সংবিধানের ব্যাপারে এবং সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে, তারা সেই দায়িত্ব পালন করা থেকে বিরত থাকার মতন একটা অবস্থা তৈরি হবে।"

পুরো সংশোধনী বাতিলের পক্ষে থাকলেও দুটি বিষয়ে আইনি সুরক্ষার পক্ষে মত দেন রিটকারীর আইনজীবী।

তিনি বলেন, " একটা হল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, আর একটা হল ১০২ অনুচ্ছেদে মানবাধিকার রক্ষা করার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার।

“আপিল বিভাগ তার নিজেরই পুরাতন রায়ের ভিত্তিতে এগুলোকে সেইভ করতে পারেন। আর বাকি সমস্ত কিছু উনারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দিতে পারেন।"

পুরো সংশোধনী বাতিল হলে চতুর্থ সংশোধনীর একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বা বাকশাল ফিরে আসার শঙ্কা কথা বলেছেন জামায়াতের আইনজীবী।

সে প্রসঙ্গ শরীফ ভূইয়া বলেন, "আমার মনে হয় না বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল আবার বাংলাদেশে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা চালু করবে। এবং চালু করলে আমরা জনগণ, নাগরিক হিসেবে সেটা প্রতিরোধ করব না? কাজেই ওটাও সংসদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায়।"

জামায়াতে ইসলামীর কী অবস্থান

জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী শিশির মনির তার শুনানিতে আদালতের এখতিয়ার এবং সংসদের দায়িত্বের মধ্যে বিভাজন টানার আহ্বান জানান।

তিনি পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল না করে যেসব অংশ মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কেবল সেগুলো বাতিল করে বাকি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার আর্জি জানান।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের কারণে সৃষ্ট অসঙ্গতি দূর করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেহেতু ইতোমধ্যে আপিল বিভাগ বাতিল করেছেন, তাই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ১২৩ অনুচ্ছেদের নির্বাচন, প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাগণের শপথ এবং বেতন-ভাতাদি বাতিল ঘোষণা করার সাবমিশন রাখা হয়েছে।”

নীতি-নির্ধারণী বিষয়গুলো সংসদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শিশির মনির বলেন, "কতগুলো বিষয় আছে নীতি-নির্ধারণী। যেমন—সোশ্যালিজম থাকবে কিনা, সেক্যুলারিজম কিংবা অ্যাবসলিউট ফেইথ অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন অলমাইটি আল্লাহ থাকবে কিনা, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম থাকবে কিনা এবং আমাদের অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি কী হবে—এই বিষয়গুলো মূলত আদালতের কাজ না।

“আদালত যদি এগুলো করতে যান, সিদ্ধান্ত নিতে যান, তখন আদালতের কাজটা পার্লামেন্টের কাজের উপরে আরেকটা বাড়তি কাজ হয়ে যায়। এই জন্য ওই অংশটুকু আমরা বলেছি পার্লামেন্টের উপর ছেড়ে দিতে।"

সংবিধানের ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদের কড়া সমালোচনা করে শিশির মনির বলেন, “কোনো গণতান্ত্রিক সংবিধানে পরিবর্তন করা যাবে না এমন বিধান থাকতে পারে না, আর পরিবর্তন করলে তা সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে—এটি সম্পূর্ণ অবাস্তব।”

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তৈরি করা ‘কর্তৃত্ববাদী’ সরকার ব্যবস্থা থেকে ‘জনগণের শাসনে’ আসতে বিষয়টিকে আদালত এবং পার্লামেন্টের কাজে ভাগ করার প্রস্তাব দেন জামায়াতের আইনজীবী।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির যুক্তি

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক তার লিখিত যুক্তিতর্কে সাংবিধানিক মৌলিক কাঠামো নিয়ে আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের ওপর ভিত্তি করেই মূলত পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়ন করে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ১৯৭২ সালের সংবিধানের মত করে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

ওই রায়ে এই নীতিগুলোকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও আইনগতভাবে তা ‘সঠিক ছিল না’ বলে তিনি দাবি করেন ।

অষ্টম সংশোধনী মামলার প্রসঙ্গ টেনে ইমরান বলেন, সংবিধানের কাঠামোগত ভিত্তি বলতে ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব, সংবিধানের আধিপত্য, গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারকে’ বোঝায়, যা অপসারণ করলে সংবিধানের মূল ভিত্তিই ভেঙে পড়ে।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা ১৯৭২ সালের আগে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত ছিল না এবং সংবিধানে ধর্মের বিষয়ে ভিন্ন কোনো নীতি গ্রহণ করা হলেও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনের কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকবে।”

বাঙালি জাতীয়তাবাদকে একটি ‘রাজনৈতিক পরিচয়’ এবং সমাজতন্ত্রকে একটি ‘আর্থ-সামাজিক দর্শন’ হিসেবে বর্ণনা করেন এই আইনজীবী।

তিনি বলেন, “এগুলোর পরিবর্তনেও কাঠামোগত ভিত্তির পতন ঘটে না । রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো বিচারযোগ্য অধিকার নয়, বরং এগুলো পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল নির্দেশিকা মাত্র।

“তাই সাংবিধানিক আকাঙ্ক্ষাকে অপরিবর্তনযোগ্য মৌলিক কাঠামোর সাথে মিলিয়ে ফেলার ভুল আদালতের পুনর্বিবেচনা করা উচিত।”

রাষ্ট্রপক্ষ কী বলছে

রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল পঞ্চদশ সংশোধনীর পেছনের উদ্দেশ্য এবং এর ফলে সৃষ্ট গণতান্ত্রিক সংকটের ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, “পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মূলত বাংলাদেশের সংবিধানের আমূল পরিবর্তন সাধন করা হয়েছিল এবং এর ফলে মানুষের বাক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আগামী দিনের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল।”

এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “এর মাধ্যমে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছিল। কিন্তু সেই পথযাত্রাকে রোধ করে আবারও একদলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্যই মূলত পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয়েছিল।”

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ—নির্বাহী বিভাগ, পার্লামেন্ট এবং বিচার বিভাগ স্বতন্ত্রভাবে কাজ করবে এবং একে অপরের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করবে না।

“সংসদ সার্বভৌম আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাখে। তবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি বা সংবিধান বহির্ভূত কোনো সংশোধনী হলে আদালত তার দীর্ঘদিনের নজিরের আলোকে তা বাতিল করতে পারে।”

হাই কোর্টের রায়ে কী ছিল

হাই কোর্টের রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়।

পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো 'গণতন্ত্র' ও 'জনগণের সার্বভৌমত্ব'কে ধ্বংস করা হয়েছে।

এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার ‘হরণ’ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।

পাশাপাশি পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করা হয় ওই রায়ে।

৭ (ক) অনুচ্ছেদে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছিল, যাকে আদালত অস্পষ্ট ও ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

৭ (খ) অনুচ্ছেদে সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি চিরতরে সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল, যা পরবর্তী সংসদের ক্ষমতা ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা খর্ব করেছে বলে হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ।

এছাড়া ৪৪ (২) অনুচ্ছেদকে আদালত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে বাতিল করে দেয় হাই কোর্ট।

সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধান পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল করা হয়েছিল।

এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪২ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বিবেচনায় তা বাতিল ঘোষণা করে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয় রায়ে।

হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এই সংশোধনী পাসের ক্ষেত্রে ‘চরম তাড়াহুড়ো’ করা হয়েছিল।

সংসদীয় কমিটিকে ১৪ দিন সময় দেওয়া হলেও মাত্র ৪ দিন পর কোনো আলোচনা ছাড়াই বিল ফেরত দেওয়া হয় এবং সংসদে বিনা বিতর্কে তা পাস হয়। এছাড়া আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরবর্তী দুই মেয়াদের জন্য বহাল রাখার যে আদেশ দিয়েছিল, আইনপ্রণেতারা তা ‘সম্পূর্ণ উপেক্ষা’ করেছিলেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে।

পুরনো খবর

পঞ্চদশ সংশোধনী: নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত সংসদের ওপর ছাড়ার আর্জি

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ও ১০২ অনুচ্ছেদ ছাড়া পুরো পঞ্চদশ সংশোধন

পঞ্চদশ সংশোধনী: আপিল শুনানি ফের মঙ্গলবার