Published : 24 May 2026, 01:45 AM
দশকের পর দশক ধরে ফুটপাত আটকিয়ে যারা ব্যবসা চালিয়ে আসছেন, সেই হকারদের ‘টেকসই পুনর্বাসনে’ এবং নগরে শৃঙ্খলা রক্ষায় উদ্যোগ নিয়েছে নবগঠিত বিএনপি সরকার।
এজন্য ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ শিরোনামে প্রথমবারের মতো নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। তাতে স্থান পেয়েছে-হকারদের নিবন্ধন, ব্যবসা পরিচালনার নির্দিষ্ট সময় ও স্থান এবং প্রশাসনিক তদারকির মতো বিষয়।
তবে এবারের উদ্যোগও সফল হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে; হকারদের ‘কাঙ্ক্ষিত’ সহযোগিতা না মিললে এবং নগর সংস্থার ব্যবস্থাপনা ঠিক মতো না হলে তা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কেন্দ্রীয় হকার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন বলেন, “সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনায় মূল সড়কের পাশে হকার না রাখার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট মার্কেট বা পুনর্বাসন স্থান তৈরির ক্ষেত্রে জায়গা সংকটও রয়েছে।”
হকার পুনর্বাসন উদ্যোগের সফলতার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে উভয় পক্ষের সমঝোতা প্রয়োজন।
“একতরফা পরিকল্পনা দিয়ে ফল পাওয়া যাবে না, দুই পক্ষের সম্মতি লাগবে।”

নতুন নীতিমালায় কী আছে?
স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা নতুন এই নীতিমালায় পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, হকারদের জীবনমান উন্নয়ন এবং নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের অধীনে গঠিত ‘হকার ব্যবস্থাপনা কমিটি’ নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্রসহ হকারদের নিবন্ধন দেবে। আর আবেদনকারীকে ১৮ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে।
আবেদনের এক মাসের মধ্যে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং একটি পরিবারের জন্য একজনই হস্তান্তর-অযোগ্য লাইসেন্স পাবেন। শর্ত ভঙ্গ করলে, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার ক্ষতি করলে বা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়ন না করলে নিবন্ধন বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে।
হকারদের জন্য নির্ধারিত তথ্য ফরমে নাম, ঠিকানা, জন্ম তারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কী ধরনের পণ্য বিক্রি করবেন, কোন এলাকায় ব্যবসা করবেন এবং পরিবারের সদস্যের সংখ্যাসহ বিভিন্ন তথ্য দিতে হবে।
স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, প্রধান সড়ক এড়িয়ে অভ্যন্তরীণ বা অ্যাকসেস সড়কগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যানজট এড়াতে মেট্রোস্টেশন, বাসস্টপেজ বা গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে ৩০-৪০ ফুট দূরে হকার জোন ঠিক করতে হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ফুটপাতের পুরোটা দখল করা যাবে না, পথচারীদের জন্য ৫-৮ ফুট জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে।
ঢাকার জনবহুল এলাকায় দিনের বেলায় হকার বসার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে মিরপুর, গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, সদরঘাট, বাইতুল মোকাররম মসজিদের মতো এলাকায় অফিস শেষে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নৈশকালীন বা ‘নাইট মার্কেট’ বসানো যাবে। তাছাড়া যেসব বাণিজ্যিক এলাকায় দিনের বেলা প্রচণ্ড ভিড় থাকে, কিন্তু রাতে জনশূন্য হয়ে পড়ে, সেসব এলাকার নির্দিষ্ট লেইনে নৈশকালীন মার্কেট বসানো যাবে।
শুক্রবার, শনিবার এবং সরকারি ছুটির দিনে সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে নীতিমালায়। সরকারি অফিসের সামনের প্রশস্ত রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনের চত্বর বা সিটি করপোরেশন নির্ধারিত স্থানে এসব বাজার বসবে।
এই বাজার পারিবারিক কেনাকাটাকেন্দ্রিক হবে উল্লেখ করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, খাবারের পাশাপাশি হস্তশিল্প ও গৃহস্থালি পণ্যের প্রাধান্য থাকবে।

পরিচয়পত্র প্রদান শুরু
নীতিমালা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন একটি ‘হকার ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করিবে এবং এই কমিটির অধীনে ডিজিটাল পরিচয়পত্রসহ নিবন্ধন প্রদান করবে। হকারদের আবেদনের এক মাসের মধ্যে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে এ কমিটি।
গত ৩০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির ৩০২ জন হকারকে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও হকারকে এ পরিচয়পত্র দেওয়ার কথা বলেছে দুই সিটি করপোরেশন।
ডিএসসিসির অনুষ্ঠানে সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেছিলেন, “আজ ১০০ হকারকে কিউআর কোড সম্বলিত ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সকল হকারকে প্রদান করা হবে।
“এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশ সহজেই তাদের বৈধতা ও বসার স্থান যাচাই করতে পারবে।”
হকারদের বসার জন্য ইতোমধ্যে সাতটি স্থান ঠিক করে দিয়েছে ডিএসসিসি। এর মধ্যে গুলিস্থানের রমনা ভবনের লিংক রোড, গুলিস্তান টুইন টাওয়ার গলি, বায়তুল মোকাররম পূর্ব গেইট সংলগ্ন লিংক রোড, নিউ মার্কেটের দক্ষিণ গেইট সংলগ্ন এক পাশে, শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির অভ্যন্তরে মাঠ সংলগ্ন রাস্তায় প্রতিদিন হকাররা বসতে পারবেন।
আর সান্ধ্যকালীন বেচাকেনা হবে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বিপরীত পাশে এজিবি কলোনি মাঠ, মতিঝিলের ইসলাম চেম্বারের সামনের জায়গা ও রাজউক ভবনের পেছনে।
তবে বেশ কয়েকবছর আগে থেকেই এই স্থানগুলোর বেশিরভাগই হকারদের পুনর্বাসনের জন্য স্থান নির্ধারণ করা ছিল। এসব স্থানে হকাররা নিয়মিত বেচাকেনাও করতেন।
আর ঢাকা উত্তর সিটির তরফে মিরপুর ১০, ১ ও ২ নম্বর সেকশনের মূল সড়কের তালিকাভুক্ত ৮২৯ জন হকারের মধ্যে প্রধম ধাপে ৩০ এপ্রিল ২০২ জনকে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেছেন, এর মধ্যে ১০২ জনকে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৩ ওয়াসা রোডে পুনর্বাসন করা হবে। মিরপুর ১ থেকে বাকি ১০০ জনকে গাবতলী কাঁচা বাজার সংলগ্ন ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
বাকিদেরও পর্যায়ক্রমে পরিচয়পত্র দিয়ে নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর করার কথা বলেছেন তিনি।
হকার পুনর্বাসন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন সেদিন ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেছেন, “আমরা আগেই হকারদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত নিয়েছি। তারা নিজেরাও অবৈধভাবে ব্যবসা করতে চান না। সে অনুযায়ী পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।”

পরিচয়পত্র নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ
পরিচয়পত্র ইস্যু নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাশিম কবির।
তিনি বলেন, “পুলিশের কাছে যে যাইতাছে, তার নামই তালিকায় ঢুকতাছে। কে আসল হকার, তার কোনো যাচাই-বাছাই নাই।”
শাহীন নামের এক হকার বলেন, “যাদের কাছে ফোন গেছে, তারাও গিয়া কার্ড পায় নাই। তালিকা কারা করছে, কীভাবে করছে—কিচ্ছু জানি না।”
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, পুনর্বাসন কার্যক্রমে সবাইকে শতভাগ সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়।
“তালিকা সিটি করপোরেশন তৈরি করেনি। পুলিশ সরেজমিনে গিয়ে যাচাই-বাছাই করে তালিকা করেছে।”
আর ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, মিরপুর-১ ও ১০ নম্বর এলাকায় হকারদের স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা করা হয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের সমন্বয়ে করা তালিকায় ৮২৫ জন হকারের নাম পাওয়া গেলেও জায়গা সংকটের কারণে প্রথম ধাপে ২০২ জনকে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা একতরফাভাবে কিছু করিনি। যেদিন তাদের ডাকা হয়েছিল, সেদিন ওই ২০৪ জন উপস্থিত ছিলেন।”

ঈদ পর্যন্ত আগের জায়গায়
মিরপুর-১০ এলাকার যে ১০২ জন পরিচয়পত্র পেয়েছেন, তাদের একজন রাজিব সম্প্রতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আপাতত তারা আগের স্থানেই ব্যবসা করছেন।
“আমরা একটা টাইম নিয়েছি মেয়রের কাছ থেকে; কোরবানির ঈদ পর্যন্ত সময় নিয়েছি। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি।”
পুলিশ বা প্রশাসনের তরফ থেকেও কোনো বাধা আসেনি জানিয়ে তিনি বলেন, “এখনো এরকম কিছু আসে নাই।”
কোরবানির পর মিরপুর-১৩ এলাকায় যাবেন তো, এমন প্রশ্নের উত্তরে হকার রাজিব বলেন, “এটা পরের সিদ্ধান্ত। এখানে অনেক হকার আছে, এটা একজনের সিদ্ধান্ত না।”
মিরপুর-১০ এলাকার আরেক হকার মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা সময় নিয়ে আসছি। এখন আর কোনো সমস্যা করে না।”
মিরপুর-১৩ এলাকায় যেতে অনীহার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, “ওখানে তো হকার আছেই। রাস্তা এমন না যে অনেক জায়গা আছে। আগে দেখুক—কোথায় বেশি সমস্যা হচ্ছে।”
সিটি করপোরেশন নির্ধারিত এলাকায় গেলে ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা মিজানুরের।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওখানে কাস্টমার হবে না। আর কয়জনকে জায়গা দেবে?”
সাত বছর ধরে মিরপুর-১০ এলাকায় ব্যবসা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তার সন্তান স্থানীয় একটি স্কুলে পড়ে। স্থানান্তর হলে পরিবারের ওপরও প্রভাব পড়বে।
“আমি যদি বাচ্চাকে পড়াইতে না পারি, তাহলে বাচ্চা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?”
ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, “হকাররা কোরবানির ঈদ পর্যন্ত সময় চেয়েছে, বিষয়টি সেই পর্যায়েই আছে।”
কোরবানির ঈদ পর কী হবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে হকার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিএসসিসির তরফে হকারদের জন্য বায়তুল মোকাররম পূর্ব গেইট সংলগ্ন যে লিংক রোড ঠিক করে দেওয়া হয়েছে, সেই এরশাদ রোডে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন অনেক হকারই।
একজন বলেন, মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপের কারণে সেখানে ব্যবসা করা ‘কঠিন হবে’।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ডিএসসি প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, “মাদকের আড্ডা থাকলে সেটাও থাকবে না।”

‘সামনের দিনে কি অইবো জানি না’
অতীতেও হকার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা উচ্ছেদ, বিক্ষোভ, সংঘাতের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থেকেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আগামীর দিনগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হকাররা।
আবরার ফাহাদ অ্যাভেনিউয়ে (বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউ) এলাকায় হকাররা স্থায়ী চৌকি নিয়ে আগের মতোই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিছু স্থানে ফুটপাতসহ মূল সড়কের প্রায় অর্ধেক দখল করেই চলছে বেচাকেনা।
সেখানকার হকার মো. ইউসুফ বলেন, “সিটি করপোরেশন শুধু দাগ কাটছে, কিন্তু এখনও আমাগোর জায়গা বরাদ্দ দেয় নাই।”
বর্ষা মৌসুম আসায় বৃষ্টি থেকে পণ্য রক্ষায় পলিথিন টানাতে বাধ্য হওয়ার কথা বলছেন হকাররা। কিন্তু পুলিশ তাতে বাধ সাধছে।
ক্ষোভ ঝেরে আব্দুল হান্নান নামের একজন বলেন, “বৃষ্টির পানিতে তো পুঁজিসুদ্ধা নষ্ট হইবো। তখন বউ-ছেলে-মেয়েরে খাওয়ামু কী?”
মহাখালীর এক তরুণ হকার বলেন, “উচ্ছেদ অভিযান গতমাসে যেসময় শুরু হইলো, আমরা ব্যবসা বন্ধ রাখছি প্রায় এক মাস।
“পেটে লাত্থি পড়ছে, ভাই। সামনের দিনে কি অইবো জানি না।”
মালিবাগের হকারদের সঙ্গে কথা বলে গেছে, সিটি করপোরেশন থেকে তাদের এখনও কিছু বলা হয়নি।
ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, “মালিবাগ এলাকায় এখনো অভিযান শুরু হয়নি। তাই সেখানে নোটিসও যায়নি।
“আপাতত গুলিস্তান ও বায়তুল মোকাররম এলাকার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ চলছে।”
আর ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, “আমরা প্রথমে মিরপুর-১ ও ১০ নম্বর নিয়ে কাজ করছি। পুরো ঢাকা শহরে একসঙ্গে ঝামেলা হয়ে যাবে। পর্যায়ক্রমে আমরা কাজ করে যাব।”

পথচারী ও বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ফুটপাত দখল হওয়ায় হেঁটে চলা যে কঠিন হয়ে দাঁড়ায় সেই ভোগান্তির কথা বলছেন পথচারীরা।
বায়তুল মোকাররম এলাকায় পাপন সরকার নামে এক পথচারী বলেন, “মানুষ যখন কিনতে দাঁড়ায়, তখন আর ফুটপাতে হাঁটার জায়গাটা থাকে কোথায়!”
সরকার এবার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে পরিস্থিতি বদলে যাবে বলে মনে করছেন না পথচারীরা
আবরার ফাহাদ অ্যাভেনিউয়ে (বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউ) পথচারী আহম্মদ সুমন বললেন, “৩৯ বছরের জীবনে এসব জারিজুরি কম দেখিনি। এখন আর কারো ওপর ভরসা নেই।”
তবে হকারদের উপস্থিতিকে নিরাপত্তার স্বার্থে ইতিবাচকভাবে দেখেন স্থায়ী ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ।
বায়তুল মার্কেট এলাকায় ‘মনোরম স্ন্যাকস’র কর্মী জিতু বললেন, “ওরা থাকলে রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত ব্যবসা হয়, এলাকাও নিরাপদ থাকে। নাহলে তো চোর-বাটপার দিয়ে এলাকা ভরে যেত।”
পথচারীর অধিকার নিশ্চিতে সরকারকে তাগিদ দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মতো ঢাকাতেও হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা থাকতে পারে, তবে ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে ফুটপাত কোনোভাবেই হকারদের দখলে যেতে দেওয়া উচিত নয়।
“পথচারীর অধিকার পথচারীকেই ফিরিয়ে দিতে হবে। ঢাকার মতো শহরে ফুটপাত দখল করে হকার বসানো বা রাস্তার অংশ ব্যবহার করতে দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে।”
ঢাকায় রাস্তার পরিমাণ কম এবং সবসময় যানজট লেগে থাকে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “রাস্তার উপর হকার বসতে দিলে কার্যত চলাচলের জায়গা আরও সংকুচিত হয়।”
ড. আকতার মাহমুদ বলেন, কিছু দেশে নির্দিষ্ট নকশা ও সীমিত পরিসরে নিবন্ধিত হকারদের বসার সুযোগ দেওয়া হলেও ঢাকায় তা বাস্তবায়ন কঠিন।
“এখানে একজনকে বসতে দিলে আরও ১০ জন এসে বসবে। কার্যকর নজরদারির সক্ষমতাও আমাদের নেই।”

হকারদের জন্য বিভিন্ন ওয়ার্ড ও জোনভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত পুনর্বাসনের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে খোলা প্লট বা নির্ধারিত এলাকায় নিম্নতলাভিত্তিক হকার মার্কেট গড়ে তোলা যেতে পারে।
তার ভাষায়, “হকার মার্কেট সাধারণত ভূমিতলেই কার্যকর হয়। দোতলা-তিনতলায় মানুষ সিঁড়ি বেয়ে উঠে তাৎক্ষণিক কেনাকাটা করতে যায় না। হকার ব্যবসার চরিত্রই হচ্ছে চলাচলের পথে আকর্ষণ তৈরি করা।”
তবে নির্দিষ্ট কিছু সড়কে সীমিত সময়ের জন্য নৈশকালীন মার্কেট চালুর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।
অধ্যাপক আকতার বলেন, “যেসব রাস্তা সন্ধ্যার পর তুলনামূলক কম ব্যবহৃত হয়, সেগুলো চিহ্নিত করে ৪-৫ ঘণ্টার জন্য অস্থায়ী বাজারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে ব্যবস্থাপনাটা খুব পরিকল্পিত হতে হবে।”
ঢাকার বিপুল সংখ্যক হকারকে পুরোপুরি পুনর্বাসন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন ড. আকতার মাহমুদ।
তিনি বলেন, “প্রত্যেক এলাকায় কতজন হকার বসতে পারবে, সেই সংখ্যা নির্ধারণ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবাইকে পুনর্বাসন করা সম্ভব নয়।”
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “হকার কার্ড দিয়ে পুনর্বাসন করছি—এই ন্যারেটিভটাই ক্ষতিকর।”
তিনি বলেন, ‘হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এতে মৌলিক দুর্বলতা রয়ে গেছে।
“নীতিমালা দরকার, কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে— কে প্রকৃত হকার? অনেকে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে বসেন, আবার অনেকে জায়গা দখল করে অন্যকে বসিয়ে ভাড়া খায়।”
তার মতে, হকার নিয়ন্ত্রণের আড়ালে থাকা চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্যের বিষয়টি নীতিমালায় একেবারেই অনুপস্থিত।
“এই পুরো চক্র নিয়ে কোনো আলাপই নেই। ফলে সমস্যার মূল জায়গাটাই অমীমাংসিত রয়ে গেছে।”
বাস্তবে সবার জন্য জায়গা বের করা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি প্রকৃত দরিদ্র হকারদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও বিকল্প কর্মসংস্থানের আওতায় আনার পরামর্শ দেন।
নীতিমালায় পথচারীদের চলাচলের জায়গা নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “ঢাকার মতো মেগাসিটিতে ৫-৬ ফুট হাঁটার জায়গা রেখে দিলে হবে না। রাষ্ট্রকে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে, ‘ফুটপাত জনগণের চলাচলের জন্য’। এ নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার।”