বিজিএমইএ ভবন ভেঙে হাতিরঝিলের মূল নকশা ফেরাতে হবে
জলাধার রক্ষা আইন লঙ্ঘন করে হাতিরঝিল প্রকল্প এলাকায় গড়ে ওঠা বিজিএমইএ ভবন ভাঙার হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে।
২০১১ সালের ৩ এপ্রিল বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের বেঞ্চ ভবনটি ভাঙার নির্দেশ দেয়।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিজিএমইএ ভবন ভাঙার হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় আজ প্রকাশিত হয়েছে। বিবাদী পক্ষের আবেদনে ওই রায়ের কার্যকরিতা স্থগিত ছিল।”
রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি নিয়ে এখন বিবাদী পক্ষ নিয়মিত আপিল করতে পারবে জানিয়ে তিনি বলেন, যদি আবেদন হয় তাহলে আপিল বিভাগে তা নিষ্পত্তি হবে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, “বিজিএমইএ ভবনটি সৌন্দর্যমণ্ডিত হাতিরঝিল প্রকল্পে একটি ক্যান্সারের মতো। এ ধ্বংসাত্মক ভবন অচিরেই বিনষ্ট না করা হলে এটি শুধু হাতিরঝিল প্রকল্পই নয়, সমস্ত ঢাকা শহরকে সংক্রামিত করবে।”
বিজিএমইএ যাদের কাছে ওই ভবনের ফ্ল্যাট বা অংশ বিক্রি করেছে, দাবি পাওয়ার এক বছরের মধ্যে তাদের টাকা ফেরত দিতে হবে।
রায়ে বলা হয়েছে, ক্রেতাদের সঙ্গে ওই চুক্তি ছিল বেআইনি। কারণ, ওই জায়গায় ভবন নির্মাণ বা কোনো অংশ কারো কাছে বিক্রির কোনো অধিকার বিজিএমইএর ছিল না।
“তবে ক্রেতারা যেহেতু নিজেরাও জানত বা তাদের জানা উচিত ছিল যে, এ জমির উপর বিজিএমইএর কোনো মালিকানা নেই এবং ভবনটি বেআইনিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। সুতরাং তারা কোনো ইন্টারেস্ট পাওয়ার দাবিদার না,” বলা হয়েছে রায়ে।
এতে আরো বলা হয়, “আর্থিক পেশিশক্তির অধিকারী বলে একটি শক্তিশালী মহলকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে এমন যুক্তি অগ্রহণযোগ্য।
“একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে বিজিএমইএর আইনের প্রতি আরো বেশি শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। তারা তা না করে আইনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে।”
মামলার বিবাদী পক্ষ বিজিএমইএর অন্যতম আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হাই কোর্টের রায়ের পর অনুলিপি হাতে না পাওয়ায় তারা রায়ের কার্যকারিতা স্থগিতের আবেদন করলে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ তা স্থগিত করেন এবং পরে বিভিন্ন মেয়াদে সময় বাড়ানো হয়।
“এখন রায়ের ‘সার্টিফায়েড’ কপি হাতে পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব আমরা লিভ টু আপিলের আবেদন করব।”
তিনি জানান, তামাদি আইন অনুযায়ী রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের দুই মাসের মধ্যে আপিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
নিজস্ব মালিকানা না থাকা, ইমারত তৈরি বিধিমালা ও জলাধার রক্ষা আইন লঙ্ঘন করায় বিজিএমইএ ভবনটি ভাঙতে আদালত রায় দেয়।
আদালত বলেছে, ভবনটি নির্মাণ করে ফৌজদারি অপরাধ করা হয়েছে। কীভাবে ভবনটি তৈরি হলো, কারা এর পেছনে রয়েছে, তা খুঁজে বের করতে ঢাকার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ মহাপরিদর্শককে নিদের্শ দেয়া হয়েছে।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ ভবনটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নকশা অনুযায়ী করা হয়নি বলে রাজউক বলে আসছিল। পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনও ভবনটি ভাঙার দাবি জানিয়ে আসছিল।
১৯৯৮ সালে বিজিএমইএ তাদের প্রধান কার্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য সোনারগাঁও হোটেলের পাশে বেগুনবাড়ী খালপাড়ের এ জায়গাটি নির্ধারণ করে এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছ থেকে ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকায় জমিটি কেনে। ওই বছরের ২৮ নভেম্বর ভবনটি তৈরির কাজ শুরু হয়।
এই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নগর উন্নয়ন আইন-১৯৫৩ মানা হয়নি। ভবন নির্মাণ আইন-১৯৫২ অনুযায়ীও ভবনটি অবৈধ, কারণ রাজউক ভবনটির নকশা অনুমোদন করেনি।
পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন বলে আসছে, উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ ভঙ্গ করে প্রাকৃতিক জলাধারের শ্রেণী বা প্রকৃতি পরিবর্তনের জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়াই বিজিএমইএ ভবন নির্মাণের জন্য বেগুনবাড়ী খালের একাংশ ভরাট করে ফেলা হয়েছে এবং এতে এর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
হাই কোর্টের নির্দেশনা
আদালত বলেছে, যেহেতু এ জমির মালিকানা স্বত্ব বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষের নেই, তাই অবশ্যই তাদের ওই জমি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। যে জমির ওপর ভবনটি তৈরি করা হয়েছে তা বেগুনবাড়ি খালের পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং হাতির ঝিল প্রকল্পে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। তাই ভবনটি ভিত থেকে ভেঙে ফেলতে হবে।
বেগুন বাড়ি খাল পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে এনে হাতির ঝিল প্রকল্পকে মূল নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে বলেছে আদালত।
বিজিএমইএ ভবনের কিছু কিছু অংশ ইজারা এবং বিক্রির মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়েছে উল্লেখ করে আদালত বলে, যারা এই ভবনে বিক্রি এবং ইজারার মাধ্যমে দখল পেয়েছেন তাদের বিনিয়োগের আগেই চিন্তা করা উচিত ছিল।
তবে তারা চাইলে চুক্তি আইন ও জালিয়াতির অভিযোগে প্রতিকার চাইতে পারেন বলে আদালত জানিয়েছে। অবশ্য এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।
এই ভবনের মাধ্যমে ফৌজদারি যে অপরাধ হয়েছে তা তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার এবং ঢাকার ডিসিকে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে হাই কোর্ট।
জলাধার রক্ষা আইন লঙ্ঘনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও বলেছে আদালত।
ভবনটি ভাঙার সময় শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সে কাজ করতে বলেছে আদালত।
হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ
আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছে, বিজিএমইএ ভবন নির্মাণে বহু জালিয়াতি হয়েছে। ১৯১০ সাল বা তৎপরবর্তীকালে এই জায়গা অধিগ্রহণ করা হয় ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের জন্য। ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ে ছিল এর মালিক। বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের জন্য তখন ওই জমি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আদালত আরো বলে, বিজিএমইএ যে কাগজপত্র রাজউকে দিয়েছে তাতে তারা দাবি করেছে ২০০১ সালে তারা জমিটি ইপিবির কাছ থেকে কিনেছে। কী করে তা সম্ভব হল, তা তদন্ত করে দেখা উচিত বলে মনে করে আদালত।
এর পেছনে একটি অপরাধী চক্র জড়িত রয়েছে মন্তব্য করে আদালত বলে, সেটি ভূমি দখলের মতোই একটি ঘটনা। রাজউকের কাছে পাঠানো দরখাস্তে বলা হয়েছে যে জমির সাফকবলা দলিল সংযুক্ত করা হল, কিন্তু এটা পাওয়া যায়নি। এটি সম্ভবও নয়, কারণ ২০০১ সালে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ওই জমির মালিক ছিল না।
আদালত বলেছে, অধিগ্রহণ করা জমি জনস্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় না। জনস্বার্থে কাজে না লাগলে এই জমি ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে চলে যাওয়ার কথা।
সেটি না করে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ওই জমি বিজিএমইএর কাছে বিক্রি করেছে, যা আইনের সুস্পষ্ট খেলাপ। এটা কোনোভাবেই বলা যায় না যে, জনস্বার্থে বিজিএমইএ ভবন তৈরি করা হয়েছে।
শুধু মালিকানাই নয়, আরো কিছু কারণে এ ভবন উচ্ছেদযোগ্য। তা হলো- জলাধার ভরাট করে এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে এবং বিজিএমইএ যদি এর মালিকও হত, তাও তারা এখানে ভবন করতে পারত না। তুললে সেটা ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে গণ্য হত।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, সুতরাং কাজটি করে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ ফৌজদারি অপরাধ করেছে। রাজউকের এফিডেভিটে বলা হয়েছে, ভবনটি অননুমোদিত। অনুমতি না নেয়ায় বিজিএমইএকে জরিমানাও করা হয়েছে। কিন্তু বেআইনি স্থাপনা জরিমানার মাধ্যমে বৈধতা পায় না।
বিজিএমইএ যে দলিলের মাধ্যমে নকশা অনুমোদন বোঝানোর চেষ্টা করেছিলো, সেটি আদৌ নকশার অনুমোদন নয়। সেই পত্র দ্বারা রাজউক কেবলমাত্র দালান নির্মাণে অনাপত্তি জানিয়েছিল। অনাপত্তি ও নকশা অনুমোদন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তাই এটি স্পষ্ট করেই বলা যায়- রাজউক আদৌ কোনো নকশা অনুমোদন করেনি।
আদালত আরো বলেছে, “অতীতে র্যাংগস ভবন ও যমুনা ফিউচার পার্কের বিষয়ে আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, জরিমানা দিয়ে অননুমোদিত ভবন নির্মাণ বৈধ করা যায় না।”
