অনিন্দ্য রহমান
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
ঢাকা, জুলাই ১৯ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশে কাটতির শীর্ষে থাকা ঔপন্যাসিক ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। জন্ম ১৯৪৮ এর ১৩ই নভেম্বর নেত্রকোনা জেলায়। বেস্টসেলার উপন্যাসের অব্যর্থ কারিগর হুমায়ূনের দ্বিতীয়রহিত সাফল্যের ক্ষেত্র ছোট গল্প, টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে বিস্তৃত।
একনিষ্ঠ ও বিশাল পাঠকশ্রেণী তৈরির মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে। রসায়নশাস্ত্রের একসময়কার অধ্যাপক নিজস্ব কথনরীতি এবং নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের নিবিড় বর্ণনার জন্য সমালোচকদের চোখেও বিশিষ্ট। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’র ভূমিকায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন সাহিত্য ইতিহাসবিদ আহমেদ শরীফ। তিনি লেখেন, ‘বাঙলা সাহিত্যক্ষেত্রে এক সুনিপূণ শিল্পীর, এক দক্ষ রূপকারের, এক প্রজ্ঞাবান দ্রষ্টার জন্মলগ্ন যেন অনুভব করলাম’।
মাত্র চারটি উপন্যাস লিখেই ১৯৮১ এ পান বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার পান হুমায়ূন। কোনো কোনো সমালোচক তার উপন্যাসকে ‘উপন্যাসোপম বড় গল্প’ [বিশ্বজিৎ ঘোষ], এমনকি ‘অপন্যাস’ [হুমায়ূন আজাদ] বলে অভিহিত করলেও, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যের কোনো আলোচনাই তাকে বাদ রেখে সম্ভব হয়নি।
সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের দীর্ঘ সামরিক শাসনের সময় হুমায়ূন ‘সামাজিক দ্বন্দ্বে’ অংশ নেননি বলে একটি সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন লেখক আহমদ ছফা। কিন্তু এই সময়ের মধ্যবিত্তের জীবনের নিস্পন্দ রোমান্টিকতাকে নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন তার প্রধানত সংলাপনির্ভর উপন্যাসমালায়। কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘অনেক উৎকৃষ্ট রচনাই অত্যন্ত জনপ্রিয়। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সস্তা চতুর্থ শ্রেণীর লেখকদের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন’।
হুমায়ূন আহমেদের দুই শতাধিক উপন্যাসের ভেতর ‘শ্রেষ্ঠ’গুলোকে আলাদা করা কঠিন। ছন্নছাড়া অথচ নিজস্ব দর্শনসমৃদ্ধ হিমু এবং আধিভৌতিক রহস্যের উন্মোচক মিসির আলী নামের দুই চরিত্র নিয়ে তার বেশকটি আলোচিত উপন্যাস রয়েছে।
হুমায়ূনের উপন্যাসের অতুল্য কাটতি জন-রুচির অব্যর্থ প্রতিফলন। বিচিত্র স্রোতের পরও স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি মধ্যবিত্তের বিকাশের অনুষঙ্গী শ্রেণীচেতনা ও সাংস্কৃতিক রুচির যদি কোনো গড় সম্ভব হয়, তবে হুমায়ূন ও তাঁর নির্মিত চরিত্রাবলী সে-গড়ের প্রতিভূ।
১৯৮৪ সালে বিটিভিতে ‘এইসব দিনরাত্রি’র মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকের নাট্যকার হিসেবে আবির্ভূত হন হুমায়ূন আহমেদ। একটি সাক্ষাৎকারে লেখক হিসেবে নিজের জনপ্রিয়তার জন্য টিভি নাটকের অবদানের কথা বলেছেন হুমায়ূন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত তার লেখা জনপ্রিয় ধারাবাহিকের ভেতর রয়েছে ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’ ইত্যাদি। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের ঘটনাপ্রবাহ দর্শকদের এতটাই আলোড়িত করেছিলো যে তারা নায়কের ট্র্যাজিক পরিণতি মানতে না পেরে রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি জায়গায় বিক্ষোভ পর্যন্ত করে। বেসরকারি টেলিভিশনের যুগ শুরু হলে হুমায়ূন আহমেদ নিজেই নাটক পরিচালনা শুরু করেন। এ পর্যায়ে অবশ্য আগের একক জনপ্রিয়তার আসন থেকে তাকে নেমে আসতে হয়।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে হুমায়ূন আহমদ নামটির সঙ্গে যুক্ত হয় চলচ্চিত্র পরিচালকের পরিচয়। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া অনুদানের ছবি ‘আগুনের পরশমণি’ আটটি শাখায় জিতে নেয় জাতীয় পুরস্কার। একই বছর একুশে পদক পান তিনি। পরবর্তী বছরগুলোয় তার নিজের প্রতিষ্ঠান নুহাশ চলচ্চিত্র ও ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় আরো কয়েকটি ছবি বানান। সবশেষ কাজ করছিলেন ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ নামের একটি ছবি নিয়ে।
উপন্যাস, টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রের পাশাপাশি শিশু সাহিত্য এবং সায়েন্স ফিকশন রচয়িতা হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদের নাম গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত। সম্প্রতি শিশুদের একটি গানের রিয়ালিটি শোতে বিচারক হিসেবেও দেখা গিয়েছিল তাঁকে।
১৯৭১ এ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন হুমায়ূন আহমেদের পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সাহিত্যের দাবী তাঁর প্রতি ভক্ত ও পাঠকের কম ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ছোটগল্প, উপন্যাস লিখেছেন এবং তৈরি করেছেন একাধিক ছবি। 'জোছনা ও জননী'র গল্প মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তাঁর বৃহত্তম উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধবৈরী সময়ে একটি ধারাবাহিকে 'তুই রাজাকার' অভিব্যক্তিটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
ইতিহাসাশ্রয়ী সাহিত্যে তাঁর আগ্রহ ছিল। ক্ষয়িষ্ণু জমিদারী পরম্পরা নিয়ে উপন্যাস ‘অয়োময়’ থেকে শুরু করে মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের জীবন নিয়ে ‘বাদশাহ নামদার’ উপন্যাসে এই ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়।
তবে সবশেষ মুক্তিযুদ্ধবিরোধিদের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘দেয়াল’ নানা সমালোচনার জন্ম দেয়। একটি জাতীয় দৈনিকে উপন্যাসটির অপ্রকাশিত দুটি পরিচ্ছেদের প্রকাশ ঘটলে, ইতিহাসের ‘সঠিক’ প্রতিচ্ছবির অভাব বিবেচনায় আদালত একটি মতামত ব্যক্ত করে। হুমায়ূন আহমেদও আদালতের সাথে একমত হন। বঙ্গবন্ধু-হত্যা নিয়ে তাঁর এই উপন্যাসটি অসংখ্য মানুষের প্রার্থিত ছিল। ক্যান্সারের সাথে লড়তে লড়তেই তিনি 'দেয়ালে'র প্রত্যাশিত পরিমার্জনে হাত দিয়েছিলেন। মৃত্যুতে তা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ছাত্র হুমায়ূন আহমেদ দুই পক্ষে ছয় সন্তানের জনক। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে হুমায়ূন জ্যেষ্ঠ। এক ভাই জাফর ইকবাল একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, ছোটভাই আহসান হাবীব কার্টুনিস্ট। তাঁর মা আয়েশা ফয়েজেরও একটি স্মৃতিকথামূলক বই বেরিয়েছে।
ঢাকা অদূরে গাজীপুরে ‘নুহাশ পল্লী’ নামে হুমায়ূনের শুটিং উপযোগী খামার বাড়িতে নানা সময় আপ্যায়িত হয়েছেন সাহিত্যিকসহ দেশ বিদেশের নামকরা অনেক ব্যক্তি। নিসর্গের প্রতি তাঁর আমৃত্য অনুরাগের কথা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানা যায়। হুমায়ূনে তাঁর নিজ গ্রামে শহীদ পিতার নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।
হুমায়ূনের সাহিত্যকর্মের একটি বিশেষ দিক তাঁর সৃষ্ট চরিত্রবালীর ভেতরে নৈতিক দ্বন্দ্ব। জনপ্রিয়তার গৎ বজায় রেখেও, এবং আরামপ্রিয় পাঠককে সরাসরি কোনো দুরূহ প্রশ্নের মুখে ঠেলে না দিয়েও, বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতিতে ব্যক্তি যে নৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়, তার চিত্র এঁকেছেন তিনি। সেসব দ্বন্দ্বের লেখক যে সমাধান দিয়েছেন তা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু, এও মানবেন অনেকে, বাংলাদেশের নাগরিক সংস্কৃতিতে নৈতিকতার প্রশ্নটিই যেখানে পাইকারি হারে অনুপস্থিত, এবং যা ক্রমশ প্রকট উপযোগবাদি হয়ে উঠছে, সেখানে পুরাতন সমাজের ফেলে আসা নৈতিক মানদণ্ড আঁকড়ে রেখেই হুমায়ূন তাঁর স্বাতন্ত্র বজায় রেখেছিলেন। হুমায়ূন সচরাচর পাঠকের রক্ষণশীলতাকে আঘাত করেননি।
প্রাত্যহিক নীতিনৈতিকতা, জীবনের ছোটখাট লক্ষ্য নিয়ে ব্যস্ত সাদামাটা মানুষের সময়টারই হয়ত প্রস্থান ঘটেছে স্যাটেলাইট বা আরও পরের সোশাল নেটওয়ার্কের কোলাহলমুখর সময়ে। হুমায়ূন তাই আমাদের জাতীয় জীবনের ফেলে আসা নিম্নকণ্ঠ সারল্যের অনন্যসাধারণ প্রতীক। যেসময়ে রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত একটি নাটকের প্রচারের সময় দেশজুড়ে রাস্তাঘাট খাখা করত, সেই ফেলে আসা সময়ে অখণ্ড জাতীয় ঐক্যের কিছু অসাধারণ মুহূর্তের রচয়িতা হুমায়ূনই, আর কে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এআর/এমআই/১৪২০ ঘ.
bdnews24