জুয়ায় হেরে মা-ছেলেকে টাকার জন্য খুন: পিবিআই
আইপিএল ক্রিকেটের ‘জুয়ায় হেরে’ পাওনাদের টাকা জোগাড়ের জন্য নারায়ণগঞ্জে মা ও তার ৮ বছরের ছেলেকে এক যুবক গলাকেটে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই।
হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পর তদন্তে নেমে সাদিকুর সাদি (২৪) নামে পোশাক কারখানার এক কর্মীকে গ্রেপ্তার করে জোড়া খুনের রহস্য উদঘাটন হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।
সোমবার সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত আইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, “ঘটনাস্থলের কাছে সুপারি গাছে লেগে থাকা মাটি থেকে মামলার রহস্য উদঘাটনের পথ সহজ হয়।
“আমরা ওই মাটির সূত্র ধরে এক কিশোরকে খুঁজে বের করি, যে ঘটনাস্থলের কাছে ফ্রি ওয়াইফাই কানেশন নিয়ে মোবাইলে প্রায়ই গেম খেলত।”
সেই কিশোরই জোড়া খুনের মূল সূত্র ধরিয়ে দিলে সাদিকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান তিনি।
৩ জুলাই সকালে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানা এলাকার ব্রাহ্মনদী ইউনিয়নের উজান গোপীনদি গ্রাম থেকে রাজিয়া সুলতানা কাকলী (৪২) এবং তার ছেলের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
বছর দুই আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর একমাত্র ছেলেকে নিয়েই ছিল রাজিয়ার সংসার।
গত ৯ জুলাই ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। এরপর তদন্ত শুরু করে প্রথম দিনেই রহস্য ‘উদঘাটন করে’ একজনকে গ্রেপ্তার করে সংস্থাটি।
যেভাবে এগিয়েছে তদন্ত
পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, যে ঘরে মা-ছেলে খুন হয়েছেন সেই ঘরের ঠিক পেছনে একটি সুপারি গাছের গোড়া থেকে দুই ফুট উপরে মাটি লেগে থাকতে দেখে পিবিআইয়ের তদন্ত দল।
এতে তদন্ত টিমের সন্দেহ হয় জানিয়ে বনজ কুমার বলেন, “আমরা বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারি, ওই সুপারির গাছের আশেপাশে ওয়াইফাইয়ের ফ্রি সংযোগ পেয়ে এলাকার কিছু কিশোর মোবাইলে গেইম খেলে।”
তিনি জানান, তারা সেখানে রাতেও গেইম খেলে এবং হত্যাকাণ্ডের রাতেও মোবাইল ফোনে গেইম খেলেছে- এমন এক কিশোরকে শনাক্ত করা হয়। পরে ওই কিশোরকে পিবিআইয়ের হেফাজতে নেওয়া হয়।
পিবিআই কর্মকর্তা বলেন, “১৬ বছর বয়সী ওই কিশোর আমাদের বলেছে, ঘটনার রাতে সাড়ে ১০টার দিকে যে ঘরে খুনের ঘটনা ঘটেছে, সেখান থেকে এক শিশুর চিৎকারের শব্দ শুনতে পায়।
“তার একটু পরেই ওই ঘরের বাথরুমে পানি দিয়ে কিছু ধোয়ার শব্দ শুনতে পেয়ে সুপারি গাছ বেয়ে ওঠে সে। পরে বাথরুমের ভেনটিলেটর দিয়ে পাশের বাড়ির মোবারক হোসেনের ছেলে সাদিকে হাত ধুতে দেখে।”
বনজ কুমার জানান, এতে সাদি পরকীয়ার সূত্র ধরে রাজিয়ার কাছে গেছেন বলে সন্দেহ করে ওই কিশোর।
জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “পরে সাদি দ্রুত বের হয়ে যাওয়ার সময় ওই কিশোরের সঙ্গে দেখা হলেও কোনো কথা হয়নি বা কেউ কাউকে কিছু বলেনি।
“পরের দিন খুনের ঘটনা প্রকাশ পেলে সাদি ওই কিশোরের সঙ্গে দেখা করে হুমকি দেন। ঘটনা বলে দিলে তাকেও মেরে ফেলারও হুমকি দেন সাদি।”
এই ভয়ে সেই কিশোর বিষয়টি কারও কাছে বলেনি বলে জানান পিবিআই কর্মকর্তা।
পরে ওই কিশোরের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে শনিবার সাদিকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই।
পরদিন রোববার তিনি নারায়ণগঞ্জের আমলী আদালতের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট কাওসার আলমের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় বলে সংবাদ সম্মলনে জানানো হয়।
যে কারণে খুন
গ্রেপ্তার সাদিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে জানিয়ে অতিরিক্ত আইজি বনজ কুমার বলেন, “আইপিএল ক্রিকেটে জুয়া খেলে হেরে বেশ কিছু টাকা তার ঋণ হয়েছিল। এসব টাকার জন্য পাওনাদারেরা চাপ দিচ্ছিল।
“বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করেও টাকা জোগাড় করতে না পেরে কাকলীর দ্বারস্থ হয়েছিলেন তিনি।”
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “সাদির ধারণা ছিল কাকলীর কাছে টাকা আছে। সেজন্য ওই রাতে কাকলীকে ডাক দিয়ে তার মা ব্লেন্ডার চেয়েছে জানিয়ে বাসায় ঢোকে।
“সেসময় কাকলীর ছেলে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একপর্যায়ে তাকে পাশের কক্ষে ডেকে ১০ হাজার টাকা ধার চান সাদিক। কাকলী টাকা নেই জানালে ওই যুবক তার হাত-পা ধরে যেভাবেই হোক টাকা দিতে বলেন।
“সেসময় কাকলী আলমারি খুলে সাদিকে দেখান- তার কাছে মাত্র ১০০ টাকা আছে। এরপর আলমারি বন্ধ করে চাবি আলমারির উপরে রেখে দেন।”
এসময় একটি বাক্স দেখে তাতে গহনা আছে বলে মনে করেন সাদি। সেই বাক্স নেওয়ার চিন্তা করেন এবং ঘর থেকে বের হয়ে গেলে সেটি আর নেওয়া যাবে না বা সুযোগ হবে না বলে তার ধারণা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে বনজ কুমার বলেন, “ওই নারী চেয়ারে বসে সাদির সঙ্গে আলাপ করছিলেন। এক ফাঁকে পাশেই বিছানায় থাকা একটি ওড়না দিয়ে পেছন থেকে তার গলায় ফাঁস দেন সাদি।
“ওই নারী নিস্তেজ হয়ে পড়লে পাশে থাকা ইস্ত্রি দিয়ে মাথায় আঘাত করেন। পরে রান্না ঘর থেকে বটি এনে জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
“এরপরই আলমারি খুলে ওই যুবক স্বর্ণালংকারের বাক্সটি নেন এবং পাশের ঘরে গিয়ে বটি দিয়ে প্রায় ঘুমন্ত শিশুর গলা কাটেন। সেসময় ওই শিশুটি চিৎকার দেয়।”
ওই বাক্সে দুটি সোনার আংটি, দুটি সোনার চেইন এবং এক জোড়া কানের দুল ছিল বলে জানায় পিবিআই।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, “একটি আংটি ও একটি চেইন নিজের মায়ের বলে এক স্বর্ণালংকারে কাছে বন্ধক রেখে ১৭ হাজার টাকা নেন সাদি। বাকিগুলো তার ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়।”
