মোগরাপাড়ায় ফের মহাসড়কে ডাকাতি, এবার শিকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
দেড় মাসের মাথায় নারায়ণগঞ্জের মোগরাপাড়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আবারও এক ব্যক্তিগত গড়িতে ডাকাতির অভিযোগ এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং ভাগ্নিকে নিয়ে ঢাকা থেকে গাড়ি চালিয়ে কক্সবাজারে যাচ্ছিলেন গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব আলম। মেঘনাসেতুর টোলপ্লাজা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মোগরাপাড়া এলাকায় তারা ডাকাতির শিকার হন।
এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বিমানবন্দর থেকে কুমিল্লা যাওয়ার পথে মোগরাপাড়া এলাকায় মেঘনাসেতুর টোলপ্লাজার যানজটে দাঁড়ানো অবস্থায় ডাকাতের কবলে পড়েন দুটি গাড়িতে থাকা তিন প্রবাসী।
ওই ঘটনার পর পুলিশ প্রথমে তাদের মামলা নেয়নি। এক সপ্তাহ পর ঘটনাটি নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা শুরু হলে পুলিশ নড়েচড়ে বসে। এরপর আরও অনেকেই জানান, গত দুই বছরের মধ্যে একই এলাকায় তারাও বিভিন্ন সময় ডাকাতের কবলে পড়েছিলেন।
তখন পুলিশ জানিয়েছিল, ওই এলাকায় ডাকাতি ঠেকাতে তৎপরতা বাড়াবে তারা। পুলিশ এ ধরনের ডাকাতদের নাম দিয়েছিল ‘থাবা পার্টি’।
সাধারণত ‘থাবা পার্টি’র সদস্যরা যানজটে আটকে থাকা গাড়িতে হামলা চালায়। তবে অধ্যাপক মাহবুব বলছেন, গাছের ডাল ফেলে তার চলন্ত গাড়ি আটকে ডাকাতি করা হয়েছে।
রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা এই অধ্যাপক জানান, গাড়ি তিনি নিজেই চালাচ্ছিলেন। তার বাঁ পাশের আসনে বসেছিলেন স্ত্রী। পেছনে ছিল ৮, ১০ ও ১২ বছর বয়সী তিন শিশু, যাদের দুজন অধ্যাপকের মেয়ে এবং একজন ভাগ্নি।
ভোর পৌনে ৪টার দিকে মোগড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডের কিছু আগে হঠাৎ রাস্তার ওপর কয়েকটি মোটা গাছের ডাল ছুঁড়ে মারে ডাকাতরা। ১০-১২টি ডাল ফেলে তারা রাস্তা আটকে দেয়। গাড়ি থামাতে বাধ্য হন মাহবুব।
তিনি বলেন, “গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে ১০-১১ জন যুবক ঘিরে ধরে। তাদের ৪-৫ জনের হাতে চাপাতি দেখা যাচ্ছিল। বাইরে থেকে ওরা গাড়ির গ্লাস নামাতে বলে।
“কিন্তু গ্লাস না খোলায় আমার বাঁ পাশের জানালায় চাপাতি দিয়ে কোপ মারে একজন। তাতে কাচ ভেঙে যায়। ওরা চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘যা আছে দিয়া দে, নাইলে ঘাড় থেকে মাথা নামায়া দিম ‘।”
এরপর মাহবুবের মানিব্যাগ, তার স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার, ভ্যানিটি ব্যাগ, তিনটি মোবাইল ফোন এবং বাচ্চাদের ছোট তিনটি ব্যাগ নিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ডাকাতরা চলে যায় বলে জানান তিনি।
“হঠাৎ এ ধরনের আক্রমণে পেছনে বসা বাচ্চাগুলো কাঁদতে শুরু করে। ওরা ট্রামাটাইজড হয়ে পড়েছে, এখনো স্বাভাবিক হতে পারছে না।”
অধ্যাপক মাহবুব জানান, ভ্যানিটি ব্যাগ ও মানিব্যাগ মিলে আনুমানিক ৫০ হাজার টাকা ছিল। এছাড়া ডেভিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড ও জাতীয় পরিচয়পত্র ছিল মানিব্যাগে।
অধ্যাপক মাহবুবের ভাই শফিউল আলম মামুন বলেন, ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে তার ভাইকে ফোন করে ঘটনাটি জানতে চাওয়া হয়। তারা বিস্তারিত জানিয়েছেন। তবে পরিবারটি এখনো ঢাকায় না ফেরায় মামলা করা হয়নি।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এরকম হলে অভিযোগ দিতে বলেন, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
এর আগেও একই জায়গায় একইরকম অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে, গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও হয়েছে। পুলিশ ওখানে ডাকাতি প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ওখানে সারা রাতই আমাদের টহল থাকে। তাও কী করে এরকম ঘটনা ঘটল সেটা আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।”
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা সেতুর টোল প্লাজার আগে এবং ইউলুপগুলোতে তৈরি হওয়া যানজটের মধ্যে এরকম ডাকাতির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যানজটের মধ্যে হুট করে দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লুটপাট করছে ডাকাতরা।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় তিন প্রবাসী মেঘনা সেতুর টোল প্লাজার যানজটে পৃথকভাবে ডাকাতির শিকার হন।
ওই রাতে সৌদি আরব থেকে ঢাকার শাহজালার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের গেয়াসউদ্দীন সবুজ, কাজী জামালউদ্দীন ও জাহিদ হাসান। তিনজনই পরস্পরের আত্মীয়।
মধ্যরাতের দিকে তারা দুটি মাইক্রোবাসে করে বিমানবন্দর থেকে বাড়িতে রওনা হয়েছিলেন। মেঘনা সেতুর যানজটে থেমে থাকা অবস্থায় তাদের দুটি গাড়িতে হামলা হয়। ডাকাতরা লুটে নিয়ে যায় ব্যাগ, ফোন, টাকা, স্বর্ণালঙ্কার।
গেয়াসউদ্দীন ও জামালউদ্দীন ছিলেন একটি গাড়িতে। তারা সোনারগাঁ থানায় গেলে পুলিশ তাদের কাছ থেকে মামলা না নিয়ে পাসপোর্ট হারানোর জিডি নিয়েছিল।
তবে ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তাদের মামলা নেয় সোনারগাঁ থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় দুজনকে।
ওই সড়কে এরকম ডাকাতির কবলে পড়েছেন, এমন আরও তিনজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ঘটনার পর তারা পুলিশের সাহায্য পাননি।
ওই রাস্তায় নিয়মিত চলাচলকারী ট্রাক ও পিকআপ চালকরা বলছেন, তারা এ রকম ঘটনা ঘটতে দেখেছেন। কখনও কয়েকজন ট্রাকচালক মিলে ধাওয়াও করেছেন। তবে পুলিশের কাছে অনেক সময়ই সাহায্য পাওয়া যায় না।
