২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮ আশ্বিন ১৪৩৩

গোপালগঞ্জে স্কুল শিক্ষকদের সমিতির কোটি টাকা নিয়ে কর্মচারী ’উধাও’

এই সংগঠনে ৭৯২ জন সদস্য আছেন। এখন পর্যন্ত ৩৩২ সদস্যের লেনদেনের হিসাবে গরমিল পাওয়া গেছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 23 Sep 2026, 11:35 AM

Updated : 23 Sep 2026, 11:35 AM

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মাধ্যমিক শিক্ষক কর্মচারীদের পরিচালিত একটি সমিতির কোটি টাকা নিয়ে এক কর্মচারী উধাও হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত ৩১ জুলাই থেকে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কোটালীপাড়া মাধ্যমিক শিক্ষক-কর্মচারী ক্রেডিট ইউনিয়নের সভাপতি সরওয়ার হোসেন তালুকদার।

আত্মগোপন করা উত্তম সরকার কোটালীপাড়া উপজেলার বান্দল গ্রামের নিমাই সরকারের ছেলে। ২০১৮ সালের মে মাস থেকে তিনি ক্রেডিট ইউনিয়নের অর্থ আদায়কারী পদে চাকরি করতেন।

সরকারি নিবন্ধনভুক্ত ক্রেডিট ইউনিয়নটির পরিচালনা পর্ষদের অভিযোগ, নিয়োগ পাওয়ার পরে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের জামানত ও ঋণের কিস্তির টাকা ইউনিয়নের ফান্ডে জমা না দিয়ে নিজে আত্মসাৎ করতে থাকেন উত্তম সরকার।

পরে এ বছরের জুলাই মাসে পরিচালনা পর্ষদ ফান্ডে রক্ষিত অর্থ ও ক্যাশ বই মিলিয়ে প্রায় কোটি টাকার গড়মিল পায়। তখন উত্তম সরকারের কাছে হিসাব চাওয়া হলে তিনি গা ঢাকা দেন।

Image

উত্তম সরকার।

ক্রেডিট ইউনিয়নের সভাপতি সরওয়ার হোসেন তালুকদার বলেন, “২০০৯ সালের ২৫ জুন যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনে ৭৯২ জন সদস্য আছেন। এখন পর্যন্ত ৩৩২ সদস্যের লেনদেনের হিসাবে গরমিল পাওয়া গেছে। এ সব হিসাবে ৯৭ লাখ ৮ হাজার ৭শ' টাকা গরমিলের তথ্য পাওয়া গেছে।

“আরো ৪৬০ সদস্যের হিসাব নিরীক্ষা করা হচ্ছে। সেখানে গরমিল পাওয়া গেলে এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।”

তিনি জানান, শেয়ারের মাধ্যমে সদস্যদের দেওয়া অর্থই এ সংগঠনের আর্থিক ভিত্তি। ক্রেডিট ইউনিয়নের একজন শিক্ষক বা কর্মচারীর ১০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত শেয়ার রয়েছে। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ১০ হাজার টাকা।

শিক্ষক-কর্মচারীর যখন টাকার প্রয়োজন হয়, তখন সংগঠনের সঞ্চিত ফান্ড থেকে তাদের ঋণ দেওয়া হয়। বছর শেষে হিসাব নিকাশ করে শেয়ার প্রতি লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়।

পিঞ্জুরী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নীহাররঞ্জন বারুরী বলেন, “আমি ২৪ হাজার টাকা ও আমার স্ত্রীর নামে ৫৫ হাজার টাকা ক্রেডিট ইউনিয়নে জামানত রেখেছিলাম। কিন্তু এই টাকা ক্যাশ বইতে পোস্টিং না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।”

কোটালীপাড়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক অসীম বিশ্বাস বলেন, “আমার ১ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা ক্যাশ বইতে জমা না দিয়ে আমার টাকা মেরে দেওয়া হয়েছে। এই টাকা আমার খুবই কষ্টের টাকা। আমি আমার টাকা ফেরত চাই।“

ওয়েস্ট কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক আবু জাফর হাওলাদার বলেন, “আমার ১ লক্ষ ৬৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছে। অল্প অল্প করে সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে আমি ক্রেডিট ইউনিয়নে এই টাকা জমা রেখেছিলাম।

“কিন্তু উত্তম এ টাকা ক্যাশ বইতে জমা করেনি। শুধু আমার পাস বইতে উঠিয়ে দিয়েছে। এখন আমরা উত্তমকে খুঁজে পাচ্ছি না। তাকে খুঁজে না পেলে আমি এই কষ্টের টাকাও পাব না। আমরা চাই উত্তম ফিরে এসে আমাদের হিসাব নিকাশ বুঝিয়ে দিয়ে যাক।”

এ বিষয়ে জানার জন্য উত্তমের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তিনি অজ্ঞাত স্থান থেকে মোবাইলে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি মিথ্যা বলে দাবি করেন।

তিনি বলেন, “আমি দৈনিক ঋণের কিস্তি বা জামানতের যে টাকা আদায় করতাম তা ম্যানেজার ইদ্রিসুর রহমানের কাছে জমা দিতাম। এখানে অর্থ আত্মসাতের আমার কোনো সুযোগ নেই। ”

তবে তার দাবিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলছেন ইদ্রিসুর রহমান। তিনি বলেন, “দৈনিক যে অর্থ আদায় হতো তা ক্যাশ বইতে লিখে উত্তমের ব্যাংকে জমা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু উত্তম সব সদস্যের বেলায় এই কাজটি করেননি। প্রায় শতাধিক সদস্যের টাকা ও মেরে দিয়েছে। এ ছাড়া গত ডিসেম্বর মাসে আমি ম্যানেজারের পর থেকে পদত্যাগ করেছি।”

ক্রেডিট ইউনিয়নের সভাপতি সরওয়ার হোসেন তালুকদার বলেন, “আমরা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে যতটুকু সত্যতা পেয়েছি তাতে উত্তম সরকারই অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে প্রমাণিত হয়। তা ছাড়া সে যদি টাকা আত্মসাৎ না করেই থাকেন তাহলে আত্মগোপনে রয়েছে কেন?”

এবিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সরওয়ার হোসেন বলেন, “বৃহস্পতিবারের মধ্যে আমাদের সম্পূর্ণ নিরীক্ষা সম্পন্ন হবে। তখন টাকা গরমিলের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হিসাব স্পষ্ট হওয়ার পর আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ”

এছাড়া সামাজিকভাবেও এটি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, “এ বিষয় নিয়ে আমরা উত্তমের বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বিষয়টি ফায়সালা করবেন বলে আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে উত্তমের পরিবারের পক্ষ থেকে ফায়সালা না দিলে আমরা আইনি পদক্ষেপ নিব।”