০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী: মাতৃভাষায় পড়ার উদ্যোগ এগোচ্ছে না কেন?

খাগড়াছড়ির মধু ত্রিপুরা নিজের মায়ের ভাষায় কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারলেও তা লিখতে কিংবা পড়তে জানেন না। প্রায় দুই যুগ ধরে ঢাকায় বসবাস করা এই গণমাধ্যমকর্মীর দুই সন্তানের জন্য বাস্তবতা আরও কঠিন।

কাজী নাফিয়া রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Feb 2022, 01:40 AM

Updated : 25 Oct 2022, 10:15 AM

দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ২০১৭ সালে মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল পাঁচ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা; কিন্তু প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে ওদের পড়ালেখা এতোদিনেও আনন্দময় হয়ে ওঠেনি। সান্ত্বনা এটুকুই- ঘরে নিজের ভাষার বই আছে!

২০১১ সালের সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, দেশের ১ দশমিক ১০ শতাংশ মানুষ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর, সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় ১৭ লাখ। তাদের বেশিরভাগেরই নিজের ভাষার অক্ষরজ্ঞান নেই। অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর ভাষার লিখিত রূপও নেই।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ১৪টি ভাষা রয়েছে বিপন্ন অবস্থায়। অবশ্য আদিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠগুলোর দাবি, এ সংখ্যা আরও বেশি। 

ধুকতে থাকা এই ভাষাগুলো টিকিয়ে রাখতে আশা দেখিয়েছিল ২০১০ সালের শিক্ষানীতি; যেখানে ‘আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করাকে সরকার প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিল।

তবে এক যুগে লক্ষ্য পূরণে অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই। শিক্ষানীতি প্রণয়নের সাত বছর পর ২০১৭ সালে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যবই পায় শিশুরা। পরের পাঁচ বছরে পাঠ্যক্রমে নতুন আর কোনো ভাষা যুক্ত করা যায়নি।

যে পাঁচ ভাষায় পাঠ্যবই হয়েছে, তা পড়ানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। নিজ ভাষায় পড়ালেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকা।

পাশাপাশি আরও কিছু কারণে শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় পাঠদানে আগ্রহী করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে আছে ভাষাশিক্ষার জন্য রুটিনে ক্লাস অন্তর্ভুক্ত না করা, কয়েকটি বইয়ে পাঠ্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকা, একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাধিক ভাষার শিক্ষার্থী থাকার মত বিষয়।

সংকট কোথায়?

শিক্ষক সংকটের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর যারা শিক্ষিত ব্যক্তি, তাদের অধিকাংশই নিজ ভাষায় কথা বলতে পারলেও পড়তে বা লিখতে পারেন না, যেমনটা খাগড়াছড়ির মধু ত্রিপুরার ক্ষেত্রে ঘটেছে।

ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর এই সদস্য জানান, প্রাতিষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক কাজে ককবরক ভাষার ব্যবহার না থাকায় এর বর্ণের সাথে তার পরিবারের পরিচয় নেই।

“পড়ালেখা তো করছি বাংলা আর ইংরেজিতে। সে কারণে কথাবার্তা বলার বাইরে আমাদের ভাষার ব্যবহার নেই। ফলে লেখা বা পড়াটা শেখা হয়নি। আর আমাদের সময় তো এটার লিখিত রূপ ছিল না। এখন সরকার এসে করল, আগে হলে আমরা পড়তে পারতাম নিজের ভাষায়। বাচ্চারা ঢাকায় বড় হচ্ছে, এখানেই পড়ছে। তাদের সামনে তো সুযোগ আরও কম।”

মধু ত্রিপুরার দুই মেয়ে ঢাকার ভিকারুননিসা স্কুলে পড়ছে। সে হিসেবে তাদের নিজেদের ভাষায় পড়ার সুযোগ নেই। তবে তিনি মনে করেন, এই উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষার সমৃদ্ধিতে তা বড় ভূমিকা রাখবে।

“এলাকার বাচ্চারা এখন নিজের ভাষায় পড়তে পারছে, ভাষার চর্চা করতে পারছে; এটা একটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু অন্য যে ভাষাগুলো আছে, সেগুলোর বইও বের করা উচিত।”

সরকারি হিসাবে, দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের প্রায় ৪০ শতাংশের বাস পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এছাড়া রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বেশ কিছু অঞ্চলে তারা আছেন। তবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ব্যাপক জনবসতি না থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে নিজের ভাষায় পড়ার সুযোগ কম।

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার শুকনাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ক্যাহ্লাসাই চৌধুরী মারমা জানান, একট ভাষার শিক্ষক যখন অন্য ভাষায় যখন পড়াতে যান, তখনই তিনি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

তিনি বলেন, “কর্তৃপক্ষ নজর দেয়নি যে, কে কোন সম্প্রদায়ের? যেমন- আমি মারমা, কিন্তু আমাকে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের একটি স্কুলে দেওয়া হয়েছে। আমি মারমা ভাষাসহ অন্যান্য ভাষাগুলো জানায় আমার পড়াতে অসুবিধা হচ্ছে না। আমার স্কুলে দুইজন সহকারী শিক্ষক আছে, যারা ত্রিপুরা ভাষায় স্থানীয় একটি এনজিও থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

“আমার স্কুলে তেমন সমস্যা না হলেও অন্যান্য স্কুলে হচ্ছে। স্কুলে বই এসেছে, শিক্ষার্থীও আছে। কিন্তু অনেক শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন না। স্থানীয় যে প্রশিক্ষণগুলো হচ্ছে, তাও খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে হচ্ছে।”

চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার এই প্রশিক্ষক বলেন, “শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় এবং অনেক শিক্ষকের নিজের ভাষায় অক্ষরজ্ঞান না থাকায় শিক্ষকরা সমস্যায় পড়ছেন।”

তবে নিজের ভাষায় পড়তে পারায় শিক্ষার্থীরা স্বতঃফূর্তভাবে পাঠ্যবই পড়তে পারছে বলে জানান তিনি।

“এটা তাদের জন্য অনেক আনন্দের। যখন শিশুদের নিজেদের ভাষায় সমস্যা হয়, তখন তারা বাংলাতেই পড়ে। আর প্রাক প্রাথমিকে নিজেদের ভাষার জন্য শিক্ষক থাকে।”  

সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সরকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য ও খাগড়াছড়ির সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায়ও পাঠ্যবই প্রণয়নে বেশ আশাবাদী।

তিনি বলেন, “আমি ত্রিপুরা, কিন্তু নিজেই তো ভাষাটা পারি না- এমন একটা অবস্থা হয়ে গেছে। আমরা বাংলায় যেমন কথা বলছি, কিন্তু নিজের ভাষাটায় কথা বলাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমরা অন্যান্য ভাষাগুলোতেও পাঠ্যবই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈ সং-ও বলছেন, পর্যায়ক্রমে সব ভাষায়ই পাঠ্যবই হবে।

“আমাদের যে পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যবই দেওয়া হল, সেগুলো চালাতে গিয়েই হিমশিম অবস্থা। শিক্ষক নেই। আমি নিজে বলতে পারি, কিন্তু লিখতে পারি না। বাংলা বা ইংরেজি শিখেই বড় হয়েছি। তাই শিক্ষক তৈরি করতেই সময় লাগছে। সরকার বই ছাপিয়েছে, শিক্ষকদের কাজটাও হবে।

“একটু সময় লাগবে। তবে প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে অন্যান্য ভাষায়ও পাঠ্যবই করা হবে।”

৩৯ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশায় থাকা মংথ মারমা বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বয়স্কদের ৩০ শতাংশেরই নিজস্ব ভাষার অক্ষরজ্ঞান নেই। এসব পরিবার থেকে আসা শিশুদের বর্ণপরিচয় নিতেই প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হচ্ছে।

“এক্ষেত্রে তাদের আমরা প্রতিটি বিষয়ে নিয়মিত পড়াতে পারছি না, যেহেতু অক্ষরজ্ঞান নেই। তাদের প্রতিনিয়ত বাংলাই পড়াতে হচ্ছে। অক্ষরজ্ঞানের সুযোগ পেলেই তাদের উন্নয়ন হবে।”

রাঙামাটির রাজস্থলির তাইতংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষক জানান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের নিজের ভাষায় পড়ার আগ্রহ কম থাকার পেছনে বর্তমান পাঠ্যসূচিও একটি কারণ।

অন্যান্য পাঠ্যবই বাংলা-ইংরেজিতে হওয়ায় এবং প্রাইভেট শিক্ষকদের চাপ থাকায় শিশুরা শেষ পর্যন্ত নিজের ভাষা শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আবার চাকরির চিন্তায় বাংলা ও ইংরেজিকে গুরুত্ব দিতেই হয়, আরেকটি ভাষার চাপ নিতে চায় না অনেকে।

“সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনদিন যদি তাদের ভাষা শিক্ষার একটি ক্লাস সরকার রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করে দেয়, তাহলেই শিক্ষার্থীরা লাভবান হবে।”একই ধরনের মত দিলেন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বেলচুড়ি হেমেন্দ্র হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবুল চন্দ্র ত্রিপুরা। তার কথায়, অনেক পড়ার চাপে নিজের ভাষার জন্য আলাদা সময় দেওয়াটা শিশুদের জন্য কষ্টসাধ্য।

“তাদের ভাষাশিক্ষার জন্য রুটিনে একটি ক্লাস অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নইলে কোন সময়টায় এটা পড়াব আমরা? প্রাক-প্রাইমারি থেকে অন্তত তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত যেহেতু মাতৃভাষার পাঠ্যবই, তাই এ শ্রেণিগুলোতে আলাদা করে নিজ নিজ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাশিক্ষার ক্লাস রাখা জরুরি।”

এসব সংকটের পিছনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার উপযোগী করে সামগ্রিক শিক্ষাক্রমকে তৈরি না করার দায়ও দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ শিকদার।

তিনি বলেন, “পাঠ্যবই হয়েছে, কিন্তু অন্যান্য প্রক্রিয়াগুলো ধাপে ধাপে না হলে হবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য গাইডলাইন তৈরি করা জরুরি। শিক্ষকরা বই কীভাবে পড়াবেন, সে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সেসব পদক্ষেপ নেই। এই শিক্ষকদের অধিকাংশই মাতৃভাষায় লিখতে-পড়তে পারেন না। তাদের মাতৃভাষায় পড়া শিখাতে হবে।”

পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাঠ্যবই তৈরির কারিগরি কমিটির সদস্য সৌরভ মনে করেন, পাঠ্যবই তৈরি হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

“প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আমরা বার বার একটি সেল গঠন করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, ময়মনসিংহে পিটিআই এর সাথে ট্রেনিংয়ে যুক্ত করতে বলেছি। কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

“জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস এলে তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। ফেব্রুয়ারি চলে গেলে আমরা ভুলে যাই। যখন প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়, তখন আরেকজন নতুন কর্মকর্তা এসে সেটি বুঝে নিতে চান। এভাবেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তিন বছর চলে গেছে। কিন্তু আমরা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শুরু করতে পারিনি।”

২০১৩ সালে আদিবাসী শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ডেটাবেইজ তৈরির পরামর্শ দেওয়া হলেও তা শুরু হয়নি জানিয়ে সৌরভ বলেন, “ডেটাবেইজ ছাড়া আমরা কাজ আগাতে পারব না। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। যারা এটি নিয়ে কাজ করবেন। সেই উইং বা শাখা না হলে এই কাজটা করা কঠিন হয়ে যাবে।

“আমাদের আরেকটি কথা ছিল, ট্রায়াল রান করার। এটা হচ্ছে, যে বইগুলো হল, সেগুলো শিক্ষার্থীবান্ধব কি না। শিক্ষকরা পড়তে পারবেন কি না বা পড়াতে পারবেন কি না, চাপ হয়ে গেল কি না। সেই ট্রায়াল রান করা হলে সমস্যাগুলো ধরা পড়ে। সেটাও কিন্তু করা হয়নি।

“২০১৩ সালে কাজ শুরু করে ২০১৭ সালে বই তৈরি করেও ২০২২ সালে আমরা বাস্তবায়ন করতে পারছি না। এটাও সত্যি, ২০২০ সাল থেকে এই কাজটা স্থবির হয়ে আছে।”

অন্যান্য ভাষায় বই প্রণয়নের আগে এই পাঁচটি ভাষার সফল বাস্তবায়ন করা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।

“এ সম্পর্কে এনসিটিবি বা সরকারের আগে ধারণা ছিল না, তাই এটা বাস্তবায়ন হলে আমরা পরবর্তী ধাপে যাব। পরবর্তীতে অন্যান্য যে জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা বেশি, যাদের রিসোর্স পার্সন আছে, লিটারেচার আছে, তাদের নিয়ে কাজ করব আমরা। সাঁওতাল ভাষায় লিপির সমস্যার কারণে এটা আটকে গেছে, তাদেরও আমরা নেব।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যন্ত মাতৃভাষায় পড়ালেখা করাতে হবে। প্রাক-প্রাথমিকে ১০০ ভাগ হবে তাদের মাতৃভাষা। প্রথম শ্রেণিতে ৩০ শতাংশ বাংলাভাষা শেখাতে হবে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা ও ইংরেজি বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়ে যাবে। এভাবে মাতৃভাষা থেকে বেরিয়ে সে মূল স্রোতধারায় চলে আসবে।

তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ পরিচালনাকারী এই ভাষাবিজ্ঞানী মনে করেন, মাতৃভাষার চর্চা নিজেদেরকেই ধরে রাখতে হবে, সবকিছু রাষ্ট্র করে দিতে পারবে না।

“ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যবই থাকলে কোনো না কোনোভাবে নিজের মাতৃভাষা আয়ত্ত্বে আনার একটা সুযোগ পাবে। কিন্তু যে ভাষাগুলো বিলুপ্তির পথে, সেগুলো তো এখনও পাঠ্যবইয়ের সুযোগ পাচ্ছে না।”

যা বলছে এনসিটিবি

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান ফরহাদুল ইসলামের ভাষায়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যে পাঁচটি ভাষার পাঠ্যবই হয়েছে, তার ব্যবস্থাপনার অবস্থা ‘খুব খারাপ’।

“সরকার যে উদ্দেশ্যে এত খরচ করে বইটা তাদের মত করে দিল, সেভাবে তারা পাঠদানে যাচ্ছে না। সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে কাজটা করল, শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছিল, সেটা সফল হয়নি।

 “সরকার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরও তাদের নিজ ভাষার বিষয়ে অনীহা আছে। তারা সরকারের এই উদ্যোগকে যে ভালোভাবে গ্রহণ করবে, তা তারা করে না। তারা মনে করে, সরকারই সব করবে। তাদের কোনো দায়-দায়িত্ব নাই। এই মানসিকতার পরিবর্তন না করলে সরকার যতই উদ্যোগ নিক না কেন, তা ফলপ্রসূ হবে না।”

চলতি বছর পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ লাখ ১২ হাজার বই বিতরণ করার তথ্য দিয়েছে এনসিটিবি। জানিয়েছে, শুরুতে সাঁওতাল ভাষা নিয়ে পাঠ্যবই প্রণয়নের পরিকল্পনা থাকলেও লিপি নিয়ে জটিলতায় তা আটকে যায়। একই সমস্যা তৈরি হয় মনিপুরিদের ভাষার ক্ষেত্রেও।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মাতৃভাষায় পাঠ্যবই তৈরির প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে গেছে।

এর কারণ দেখিয়ে ফরহাদুল বলেন, “আমরা মনিপুরি ভাষায় পাঠ্যবইয়ের কাজটা যখন করতে গেলাম, তখন তাদের মধ্যে দুটি ভাগ তাদের ভাষায় করতে বললেন। অর্থাৎ একটি ভাষার মধ্যে দুটি শাখা। এক পক্ষ বলছে, তাদেরটা করতে হবে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সরকার অনেক দূর এগিয়ে কাজটি আর করতে পারল না।”

নৃ-গোষ্ঠীর পাঁচটি ভাষায় পাঠদানের জটিলতার বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী জাকির হোসেন ও সচিব আমিনুল ইসলাম খানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।