২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

নারীর অবস্থার উন্নয়নে ঘরের কাজের ‘মূল্যায়ন জরুরি’

কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠেই কাজ শুরু হয়ে যায় লুবনা খানমের। দুই বছরের সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের রান্না ও ঘরের প্রয়োজনীয় কাজ সেরে এই কর্মজীবী নারীকে ছুটতে হয় অফিসে।

কাজী নাফিয়া রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Oct 2020, 11:52 PM

Updated : 10 Oct 2022, 07:26 PM

পুরানো খবর:

মহামারীতে বেড়েছে ঘরের কাজও, স্বীকৃতি কোথায়

আবার অফিস শেষে বাসায় ফিরে সন্তানের যত্ন, ঘর গোছানো-পরিষ্কার, রান্না করা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দেখভালের পর নিজের কথা চিন্তার আর সময়ই থাকে না।

একই রুটিনে চলতে চলতে ক্লান্ত এই কর্মজীবী নারী মনে করেন, নারীর ঘরের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হলে পুরুষরাও এ কাজে আগ্রহী হয়ে নারীদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসত।

“আমি বাইরে কাজ করার জন্য অর্থ পাচ্ছি। কিন্তু ঘরের কাজের মূল্য নেই, এমনকি এ কাজটার জন্য আমি যে শ্রম দিচ্ছি, সেটার কোনো স্বীকৃতি নেই। নারীর অবস্থার উন্নয়নে গৃহস্থালির কাজের মূল্যায়ন জরুরি।”

অফিস করার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সারা দিনই কাজের চাপে ব্যস্ত থাকতে হয় নরসিংদীর শিবপুরের গৃহিণী সাহিলা বেগমের। ভোর ৬টায় ঘুম থেকে উঠে থালা-বাসন ধোয়া, রান্নাবান্না, ঘর আর উঠান পরিষ্কার করেন তিনি। এরপর গবাদি পশুকে খাবার দিয়ে তিনি চলে যান ফসলের ক্ষেতে। ক্ষেত নিড়ানো, আগাছা পরিষ্কার, বীজ বপন, কীটনাশক দেওয়া আবার ক্ষেতে পানি দেওয়াসহ ফসল কাটার কাজও করেন তিনি। এরপর বাসায় ফিরে ঘরের কাজ, রান্নার জ্বালানি সংগ্রহ, কাপড় ধোয়া, সন্তান ও শাশুড়িকে দেখভালসহ নানা কাজে দিন পার হয়ে যায় তার।

সাহিলা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাসা, ক্ষেত, গরু দেখাশুনা সব কাজ আমি নিজেই করি। এই সব কাজের জন্য কোনো লোক রাখলে ঠিকই টাকা দিতে হয়, কিন্তু নিজে করলে সেইটার কোনো মূল্য নাই।”

ঘরের কাজ সামলাতে নারীরা দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করলেও এর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি না থাকায় গৃহস্থালির সেবামূলক কাজের মূল্যায়ন পাচ্ছেন না তারা।

নারীর এসব কাজের স্বীকৃতি দিতে নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন নারী অধিকার কর্মীরা। যথাযথ স্বীকৃতি পেলে সমাজে নারীর অবস্থান আরও ভালো হত বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবির কেন্দ্রীয় নারী সেলের সদস্য লুনা নূর মনে করেন, গৃহস্থালির কাজ পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলেও ‘ঘরের কাজ’ বলে এর কোনো মূল্যায়ন করা হয় না। বরং যারা এ কাজ করছেন, সেই নারীদেরই অবমূল্যায়ন করা হয়।

“গৃহশ্রমকে আসলে শ্রম হিসেবে ধরা হচ্ছে না। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এত শ্রমবিভাজন যে, কাজকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়- বাইরের কাজ আর ঘরের কাজ। নারী গৃহস্থালির কাজের জন্য যে শ্রম দিচ্ছে, সেটাকে মূল্যহীন একটি বিষয় মনে করা হয়। কিন্তু এর সাথে নারীর অসম্মান, অনিশ্চয়তা ও পরাধীনতার বিষয়টি জড়িত।”

মানুষের জীবনে অর্থের অত্যাবশ্যক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে জানিয়ে এই নেত্রী বলেন, “যে বাইরে কাজ করছে সে কাজের বিনিময়ে অর্থ পরিবারের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। ফলে সে যখন আয় করছে তখন সে পরিবারের একজন নীতিনির্ধারক হয়ে যাচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়িয়েই পুরুষ বাইরে কাজ করায় তাকে কর্তা বলা হচ্ছে।

“একই সাথে নারী যদি গৃহস্থালির কাজ না করত তাহলে কিন্তু পরিবারের পুরো কাঠামোই ভেঙে যেত। পরিবারটা এক ধরনের অনিরাপত্তা, অনিশ্চয়তার মধ্যে চলে আসত। এই নারী যদি ঘরের কাজ না করে বাইরে কাজ করত তাহলে কিন্তু সে একটা আর্থিক মূল্য পেত এবং ঘরের কাজ করানোর জন্য অর্থের বিনিময়ে তাকে একজন নিয়োগ করতে হত। এই অর্থটাই কিন্তু নারীরা নিজে না নিয়ে পরিবারে কাজে লাগাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “মানুষের অবস্থান তার অর্থনৈতিক মুক্তি, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার ওপর অনেকটা নির্ভর করে। সেখানে নারী গৃহস্থালির কাজ করায় এবং অর্থ উপার্জন না করায় তার একটি অধস্তন অবস্থা মনে করা হয়।”

সমাজ ও পরিবারে নারীর অধস্তন অবস্থান দূর করার জন্য গৃহশ্রমের মূল্য নির্ধারণ জরুরি মন্তব্য করে লুনা নূর বলেন, “নারীর কায়িক শ্রমের ভিত্তিতে অথবা তার সময়ের ভিত্তিতে এই স্বীকৃতি হতে পারে। সেজন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে নীতিমালা হওয়া দরকার। বাজেটেই সেটার প্রতিফলন হতে হবে।

“অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে গৃহশ্রম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও এর কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ না করায় নারীর এই অবদানটা অর্থনৈতিকভাবেও স্বীকৃতি পাচ্ছে না। তাই দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে নারীর সম্মানকে নিশ্চিত করার জন্য এবং দেশের অর্থনীতিতে তার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য এর মূল্য নির্ধারণ প্রয়োজন।”

বেইজিং সম্মেলনের প্ল্যাটফর্ম অব অ্যাকশনে ১৯৯৫ সালে নারীর কাজের পরিধি, মূল্যহীন কাজকে দৃশ্যমান ও মূল্যায়িত করতে যথাযথ পরিসংখ্যান পদ্ধতি বের করার কথা বলা হয়েছিল।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাতেও ঘরের কাজকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি মূল্যায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

নারীর এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, “নারীর ঘরের কাজ অগোচরে থাকে, সেজন্য এটাকে স্বীকৃতি দিতে হবে প্রথমে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য স্বীকৃতির দরকার।”

এজন্য নীতিমালা করা জরুনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

“নারীর এই অদৃশ্য কাজের একটা মূল্য ধরে সেটা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাহলে বোঝা যাবে, অর্থনীতিকে চালু রাখতে এর কতটা অবদান। বাজেটে এর প্রতিফলন দেখতে চাই আমরা। এটা হলে মেয়েরা ‘ঘরে বসে থাকে, কোন কাজ করে না’ এই মানসিকতার পরিবর্তন হবে।”

২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ‘কেয়ার ওয়ার্ক অ্যান্ড কেয়ার জবস ফর দ্য ফিউচার ডিসেন্ট ওয়ার্ক’ প্রতিবেদনে জানায়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নারীরা পুরুষের চার গুণের বেশি সময় গৃহস্থালি ও বেতনবিহীন কাজে ব্যয় করেন।

ঘরের কাজের স্বীকৃতি নারীর সামগ্রিক অবস্থানে পরিবর্তন আনবে বলে মনে করেন একশনএইড ইন্টারন্যাশনালের পাওয়ার প্রজেক্টের দক্ষিণ এশিয়ার অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর মো. হেলাল উদ্দিন।

তিনি বলেন, “ঘরের সেবামূলক কাজে শ্রম, মেধা, সময় সবই দিচ্ছে নারীরা। তাহলে সেটার কেন স্বীকৃতি থাকবে না? স্বীকৃতি না থাকায় নারী বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাসার কাজের কারণে অনেক সময় শিক্ষার সুযোগ পায় না, উৎপাদনমূলক সম্পদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। নিজের বিনোদন, বিশ্রাম, যত্নের জায়গা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর একটা প্রভাব আছে।

“তার আয় এবং আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ, পরিবারে সিদ্ধান্তগ্রহণে ভূমিকা, সামাজিকভাবে অবস্থান তৈরি করা- এসব থেকে সে বঞ্চিত হচ্ছে। এই অধিকারগুলো যেন সে পায়, সেজন্য এই কাজগুলোর স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন দরকার। স্বীকৃতি হলে ধীরে ধীরে সমাজের মনোজগতে পরিবর্তন আসবে। নারীর সামাজিক মর্যাদা ও গুরুত্বেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”

নারীর গৃহস্থালি কাজ মূল্যায়িত না হওয়ার জন্য সমাজ ব্যবস্থাকেই দায়ী করেছেন তিনি।

“গৃহকর্মী কাজ করলে বেতন পাচ্ছে, কিন্তু বাসায় সে কাজ নারীরা করলে তাদের উপার্জন হচ্ছে না। আমরা ধরেই নিয়েছি এটা নারীরা করছে এবং তারাই করবে- এই চিরায়ত পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাই একটা ভূমিকা রাখছে।

“রাষ্ট্রীয়ভাবে এটা মূল্যায়ন করতে হলে কতগুলো আইন ও নীতিকাঠামোর মধ্যে এটাকে নিয়ে আসতে হবে। যেহেতু কোন জায়গায়ই এটা নাই, তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে এটাকে মূল্যায়িত করা যাচ্ছে না।”

অন্যান্য দেশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “অনেক দেশ জিডিপিতে এটাকে যুক্ত না করলেও জিডিপির পাশাপাশি গণনা করে দেখাচ্ছে। তারা গৃহস্থালির সেবামূলক কাজকে পুনর্বণ্টন ও স্বীকৃতি দেওয়ার কাজটা করেছে। জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন- এটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এজন্য ভর্তুকি দিচ্ছে, বিশেষ করে কোভিডের প্রেক্ষাপটে।

“স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, যোগাযোগের মাধ্যম, গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার করে কীভাবে একে সহজ করা যায়, সেটা তারা করেছে।”

দেশে এ ধরনের মূল্যায়নের উদ্যোগ না থাকলেও ২০১৪ সালে প্রতিস্থাপন ও গ্রহণযোগ্য মূল্য পদ্ধতিতে বাংলাদেশ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক গবেষণায় নারীদের ঘরের কাজের আর্থিক মূল্যায়নের চেষ্টা করে।

এতে দেখা যায়, জাতীয় আয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না, নারীর এমন কাজের আনুমানিক বার্ষিক মূল্য (২০১৩-১৪ অর্থবছর) জিডিপির প্রায় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশের সমপরিমাণ। যা যোগ হলে জাতীয় উৎপাদনে নারীর অবদান ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছাবে।

আর গত নভেম্বরে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিং (সানেম) গবেষণা প্রতিবেদনে জানায়, নারী-পুরুষের মজুরিবিহীন কাজ হিসেব করলে জিডিপিতে এর অবদান দাঁড়াত ৪৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এর মধ্যে অর্থ ছাড়া গৃহকর্মে নারীর অবদান ৮১ দশমিক ৪ শতাংশ।

যা বলছেন অর্থনীতিবিদরা

দেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদানকে স্পষ্ট করার জন্য গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে এ কাজের মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বৈশ্বিক রীতি না থাকায় বিকল্প ব্যবস্থার মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান বলেন, “সারা বিশ্বে এটার দাবি উঠেছে। কিছু দেশ এর স্বীকৃতিও দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এটা পরিমাপ করা খুব কঠিন। এজন্য বিশ্ব স্বীকৃত কোনো পদ্ধতি এখনও তৈরি হয়নি। জাতিসংঘের যে ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস আছে, এখনও সেটাকে ওভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।

“সারা পৃথিবীর মাথা পিছু আয় একটা পদ্ধতির মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। সেজন্য গ্লোবালি সবাই কাজটাকে জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত না করলে তো হবে না। এখনই এটাকে আমাদের অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে গেলে, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যরা সেই পদ্ধতিতে জিডিপির হিসাব না করলে আমাদের ডেটাটা ওদের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যাবে।”

সে কারণে বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতির কথা বলেন এই অধ্যাপক।

“আলাদা জরিপ করে এর পরিমাণটা বের করে অ্যাডভোকেসিকে পুশ করা যায়। এতে হয়ত, একদিন গিয়ে বিষয়টা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এটা পুশ করার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা যেটা দেখছি, আসলে সুবিচার হচ্ছে না। নারীদের ওপর অনেক চাপ পড়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে কোভিডের এ সময়টায়। ঘরে বসে একদিকে অফিসের কাজ, বাড়ির সব কাজও করছে, আবার হয়ত বাচ্চা কাঁদছে। আগে তারা স্কুলে-প্রাইভেটে থাকত, এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু বস তো তা বুঝবে না।

“এখন এটা নিয়ে যে জরিপ বা গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, সেটার ফলে অ্যাডভোকেসিটা আরও জোরালো হবে। ফলে অ্যাডভোকেসির চাপ পড়বে এবং সরকার বলবে যে, আমি একা স্বীকৃতি দিয়ে তো লাভ নেই, অন্যান্য দেশ যদি না দেয়। তখন সরকার জাতিসংঘের সাথে কথা বলবে এর পরিবর্তনের জন্য।”

আতিউর রহমান বলেন, “এর স্বীকৃতি দিলে সমাজ ও দেশের জন্য নারীর অবদানটা আরও স্পষ্ট হবে। তবে বাংলাদেশে এক ধরনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আমার মনে হয়, অন্যান্য দেশের চেয়ে জেন্ডারে অগ্রগতি ভালো। এর স্বীকৃতির ব্যাপারে যথেষ্ট যুক্তি আছে এবং এর প্রয়োজনীয়তা অনেক। তবে গ্লোবাল সিস্টেমের মধ্যে থেকে এটা করাতে হয়ত আরও সময় লেগে যাবে।”

এ আলোচনায় পুরুষদের উৎসাহী হয়ে যোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

তিনি বলেন, “নারী-পুরুষের মধ্যে গৃহস্থালির কাজগুলো কীভাবে ভাগ হবে, তার ধরা-বাধা নিয়ম করা কঠিন। বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। যেখানে নারীরা পুরুষের সাথে সমানভাবে বাইরের কাজে যোগ দিচ্ছে, সেখানে অবশ্যই বাসার কাজে বিভাজনটাও সমান হওয়া দরকার।

“যেখানে নারীরা শুধু গৃহকর্মই করে, তাদের কাজটাও যে বাইরের উপার্জনক্ষম পুরুষের কাজের চেয়ে কম প্রয়োজনীয় নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি প্রয়োজনীয়; বিশেষ করে সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে, সেটার মূল্যায়ন দরকার। সেজন্য পুরুষদের মনোভাবের পরিবর্তন প্রয়োজন।”

গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্যায়ন করে জিডিপিতে অন্তর্ভুক্তির দাবির বিষয়ে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটির সাবেক এই সদস্য বলেন, “এটা এক ধরনের স্বীকৃতি হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ একটা দেশ আন্তর্জাতিকভাবে জিডিপি মাপার যে নিয়ম আছে, তার বাইরে বিষয়টাকে অন্তর্ভুক্ত করলে জিডিপি অনেক বেড়ে যাবে। সেটা অন্য দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।

“তাছাড়া জিডিপিতে কী আছে না আছে, তা কয়জন লোক জানে? অশিক্ষিত পুরুষ নারীকে নির্যাতন করে। জিডিপিতে কী আছে, তা দিয়ে তার কি কিছু যায় আসে? আইনে বা সরকারি নিয়ম-কাঠামোতে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে ভালো অনেক কিছু আছে, কিন্তু তা দিয়ে জনমনে খুব প্রভাব হয় না। কাগজে-কলমে কী থাকে, তা দিয়ে বাংলাদেশে কোনো কিছুর পরিবর্তন হয়? আলাপ-আলোচনা করলে সরকারের সচেতনতা সৃষ্টি হয়, নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা থাকে- সেগুলোই বাস্তবায়িত হয়। এজন্য এগুলোকে প্রচার-প্রচারণায় আনতে হবে।”

সামাজিক আন্দোলন ও গৃহকর্ম সহজ হলে অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে মনে করেন অর্থনীতির এই অধ্যাপক।

তিনি বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে অনেক দূর থেকে সুপেয় পানি আনতে হয়- এগুলো শিশু ও নারীরা করে থাকে। এ কাজগুলোকে সহজ করা সরকারের দায়িত্ব।”

গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি ও এ সংক্রান্ত নীতিমালার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই।”

একই তথ্য জানিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, “বিষয়টা মাথার মধ্যে আছে, যেহেুতু বিষয়টা আলোচিত। কোন দেশে এটা করছে, এ ধরনের কোনো মডেল আমি এ পর্যন্ত পাইনি।

“আমি বিষয়টিকে সম্মান করি, আবার মনে করি সাংস্কৃতিক কারণে এর পরিমাপ করা খুব কঠিন। আমরা মা-বোনদের কর্মী মনে করি না। তারা আমাদের জন্য যা করে, তা পরিমাপযোগ্য নয় বলে আমার মনে হয়। আমরা এর বিরুদ্ধে নই, বরং পরিমাপ করা গেলে আমাদের জিডিপি আরও বাড়বে।”

নারীর গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি দিয়ে কাজ হিসেবে মেনে নিয়ে এর জন্য ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

“প্রথম স্তর হল স্বীকার করা ও সম্মান দেওয়া। সেটা আমাদের সরকার করছে। নারীর ক্ষমতায়ন যেটাকে বলা হয়, সেটা আমরা করছি। বৈজ্ঞানিকভাবে মাপ-জোখ করে শ্রমিকের মতো বা উৎপাদনের মতো ধরে ধরে করার পদ্ধতি আমার জানা নেই।”