শহর কার, কুকুর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কার?
শহর কি শুধু মানুষের, নাকি অন্য প্রাণীরও? ঢাকার গলি থেকে আদালত—পথকুকুর নিয়ে সংঘাতের দায় কার?
এই গ্রহ কার, পৃথিবী কার, পৃথিবীর শহর কার—শুধুই কি মানুষের, নাকি সবার? কিন্তু শহরকে সহাবস্থানের উপযোগী রাখার দায়িত্ব কার?
ঢাকার গলিতে গলিতে পথকুকুর নিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ চলমান। কোথাও কুকুর তাড়ানো হয়, কোথাও সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, কোথাও আবার কুকুরপ্রেমী মানুষেরাই হামলার শিকার হন। ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বনশ্রীতে পথকুকুরকে খাবার দেওয়ার সময় হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন সুমাইয়া রহমান নামে এক তরুণী। তিনি থানায় অভিযোগ করেছেন; তখন পর্যন্ত পুলিশ বলছিল, কারা জড়িত তা শনাক্ত হয়নি এবং তদন্ত চলছে। ঘটনাটি তাই অভিযোগের পর্যায়েই আছে।
সুমাইয়ার ওপর হামলার ঘটনা আমাদের যে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, সেটি হলো—একটি নগরে মানুষ ও পথকুকুরের সংঘাত যখন বারবার নাগরিক পর্যায়ে নেমে আসে, তখন সেটি কি কেবল নাগরিকদের পারস্পরিক বিরোধ বলে গণ্য হবে? নাকি এমন একটি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, যার দায়িত্ব ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা নয়?
বাংলাদেশের আইনে বিষয়টি নির্ধারিত হয়। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯-এ মালিকবিহীন প্রাণী নিধন বা অপসারণের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে; নির্দিষ্ট আইনগত কারণ ছাড়া এমন প্রাণী নিধন বা অপসারণ করা যাবে না। একই আইনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সংজ্ঞা ও প্রাণিকল্যাণ-সংক্রান্ত কিছু দায়িত্বের কাঠামোও নির্ধারিত হয়েছে।
কিন্তু পথকুকুর ব্যবস্থাপনা শুধু প্রাণিকল্যাণের বিষয় নয়। বাংলাদেশ জলাতঙ্কের জন্য স্থানীয়ভাবে স্থায়ী রূপ নেওয়া (এনডেমিক) দেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, কুকুরবাহিত জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে কুকুরের টিকাদান, কার্যকর কুকুরের সংখ্যা ব্যবস্থাপনা, কামড় প্রতিরোধ এবং মানুষের জন্য কামড়-পরবর্তী চিকিৎসা—সবগুলো নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরের টিকাদানকে কার্যকর বেঞ্চমার্ক হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।
অর্থাৎ মানুষের নিরাপত্তা এবং কুকুরের কল্যাণকে পরস্পরের বিপরীত দুই অবস্থান হিসেবে দাঁড় করালে সমস্যাটিকে ছোট করে দেখা হয়। মানুষের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; একই সঙ্গে মানুষের তৈরি নগরব্যবস্থায় বসবাসকারী প্রাণীর সংখ্যা ব্যবস্থাপনা এবং অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধও সেই ব্যবস্থার অংশ।
বাংলাদেশের নীতিতেও এর স্বীকৃতি আছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার বিভাগ কুকুর নিধনের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং মানবিক কুকুর ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে অনুসরণের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে। সেখানে ব্যাপকভাবে কুকুরের টিকাদান এবং কুকুর ধরে বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদান শেষে অবমুক্তকরণের (ক্যাচ-নিউটার-ভ্যাকসিনেট-রিলিজ বা সিএনভিআর) মতো ব্যবস্থার কথা রয়েছে।
তাহলে আলোচনার বিষয় নীতি নিয়ে নয়, নীতি বাস্তবায়নের।
কত কুকুর আছে—তার হালনাগাদ হিসাব কোথায়? কত শতাংশ টিকাপ্রাপ্ত? কোন এলাকায় কতগুলো কুকুরের বন্ধ্যাকরণ হয়েছে? সিএনভিআরের আওতা কত? একটি কর্মসূচির নির্ধারিত লক্ষ্য কী ছিল, কতটা অর্জিত হয়েছে এবং সেই ফলাফল কে প্রকাশ করে?
‘কুকুরের ব্যবস্থাপনা চলছে’—এটি কোনো পরিমাপযোগ্য ফলাফল নয়। সভা হয়েছে, নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কমিটি গঠিত হয়েছে—এসবও ফলাফল নয়। ফলাফল বলতে বোঝাবে কুকুরের সংখ্যা কতটা ব্যবস্থাপনার আওতায় এসেছে, টিকাদানের আওতা কত, বন্ধ্যাকরণ কতটা হয়েছে এবং এসব ব্যবস্থার সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক নিরাপত্তার কী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে হাইকোর্টের একটি কারণ দর্শানোর রুলে (রুল নিশি) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় পথকুকুর অপসারণের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একই সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক কুকুরের টিকাদান ও বন্ধ্যাকরণ বাস্তবায়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন এবং কাজের অগ্রগতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। এটি আদালতের হস্তক্ষেপের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিভুক্ত ধাপ।
সেপ্টেম্বরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সরকারি নথিতেও কুকুরের টিকাদান এবং সংখ্যা ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়ে সভা নির্ধারণের তথ্য পাওয়া যায়। অবশ্য ৪ অক্টোবরের নির্ধারিত ওই সভাটি ২৩ সেপ্টেম্বর স্থগিত করার নোটিশও প্রকাশিত হয়েছে।
এখন রাষ্ট্র কাজ করছে কি না, সেটিই একমাত্র প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো: এই ব্যবস্থাপনার অগ্রগতি নাগরিক কীভাবে জানবে?
দায়িত্ব যখন একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকে—স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, প্রাণিসম্পদ ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ—তখন প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান নিজের অংশটুকু করেছে বললেই পুরো ব্যবস্থার জবাবদিহি শেষ হয় না। নাগরিকের কাছে শেষ পর্যন্ত যে ফলাফলটি দৃশ্যমান হওয়ার কথা, তার সামগ্রিক দায় কোথায়—সেটিও নির্ধারিত থাকা দরকার।
আরেকটি বিষয়ও এখানে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ মানুষ। নগর, রাস্তা, বন্দর, আবাসন, বর্জ্যব্যবস্থা—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে। মানুষই আইন করেছে, নগর তৈরি করেছে এবং অন্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিজের হাতে রেখেছে। সেই ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও এসেছে।
তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল মানুষ ও প্রাণীকে সমান দূরত্বে দাঁড় করিয়ে নিরপেক্ষ থাকা নয়। ক্ষমতার অসমতা যেখানে স্পষ্ট, সেখানে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমতাহীন দুর্বল পক্ষটির সুরক্ষাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ। কিন্তু সেই সুরক্ষা মানুষের নিরাপত্তার বিপরীতে দাঁড়াবে না; বরং এমন ব্যবস্থাপনা তৈরি করবে, যেখানে মানুষের নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং প্রাণিকল্যাণ একই নীতির ভেতর পরিচালিত হয়।
এই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ নিজের স্বার্থকে একমাত্র বৈধ স্বার্থ মনে করলে সহাবস্থান আর ব্যবস্থাপনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে দখলের রাজনীতি।
পথকুকুর নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাস্তব। কামড়, জলাতঙ্ক, পরিচ্ছন্নতা এবং কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কুকুরের আচরণ—এসবকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু কুকুর সরিয়ে দেওয়া সংখ্যা ব্যবস্থাপনার সমার্থক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, কেবল কুকুর অপসারণ জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নয়; উচ্চমাত্রার টিকাদান, নজরদারি, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা আবশ্যক।
একইভাবে, কোনো নাগরিক কুকুরকে খাবার দিচ্ছেন বলে তার সঙ্গে অন্য নাগরিকের বিরোধ তৈরি হলে সেটিও ব্যক্তিগত শক্তির লড়াইয়ে ছেড়ে দেওয়ার বিষয় নয়। কোথায় খাবার দিলে জননিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার সমস্যা তৈরি হচ্ছে, কীভাবে এমন অভিযোগ জানানো হবে এবং স্থানীয় বিরোধ কীভাবে মীমাংসা করা হবে—এসবের জন্যও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রয়োজন আছে।
তার অনুপস্থিতিতে প্রতিটি নতুন ঘটনা কেবল আরেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ব্যক্তির হাতে, ব্যক্তির ক্ষোভ অন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে, এবং একটি নগর-পরিকল্পনার সমস্যা শেষ পর্যন্ত রাস্তায় ক্ষমতার সংঘাতে পরিণত হবে।
রাষ্ট্রের কাজ কুকুরকে মানুষের ওপরে তোলা নয়, মানুষকেও কুকুরের বিরুদ্ধে অসহায় করে দেওয়া নয়, কুকুরবিদ্বেষী ও কুকুরপ্রেমীদের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করাও রাষ্ট্রের কাজ নয়। রাষ্ট্রের কাজ এমন একটি ব্যবস্থাপনা তৈরি করা, যেখানে সংঘাতের কারণগুলো আগেই চিহ্নিত করা যায়, ঝুঁকি মাপা যায়, সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, রোগ প্রতিরোধ করা যায় এবং মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি নিজের পক্ষে কথা বলতে না-পারা প্রাণীর প্রতিও অযথা নিষ্ঠুরতা ঠেকানো যায়।
পৃথিবীকে শুধু মানুষের ব্যবহারের জায়গা হিসেবে দেখলে সহাবস্থান একটি আবেগের শব্দ হয়ে থাকে। শহরকে সহাবস্থানের উপযোগী রাখার জন্য কার কী দায়িত্ব, সেই দায়িত্বের মাপ কী এবং ফল না এলে জবাবদিহি কোথায়—রাষ্ট্রকেই সে হিসাব দিতে হয়।
আনা নাসরীন: লেখক, গীতিকার, সুরকার, সংগীতশিল্পী ও সংগীত পরিচালক। ইমেইল: aananasrin@gmail.com
