পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ কী ফোয়ারার পানিতে ধুয়ে যাবে?
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক ভাস্কর্যের বদলে নির্মিত হচ্ছে পানির ফোয়ারা! সৌন্দর্যবর্ধন নাকি ইতিহাস আড়াল করার চেষ্টা?
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই মাঠে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের ৭ মার্চ অগ্নিঝরা ভাষণ দেন এবং স্বাধীনতার বীজ বপন করেন। তাই ঐতিহাসিক বিবেচনায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মাঠের প্রতিটি ইঞ্চি সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের দায় রাষ্ট্রের।
ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে ২০১৮ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যা ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
এই প্রকল্পের আওতায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে দুটি ভাস্কর্য বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটলে সেই উদ্যোগ থেমে যায়। যে দুটি স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ চলছিল, সেসব স্থানে ভাঙচুরও চালানো হয়।
এরপর গত বছরের মার্চে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জানায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাস্কর্য দুটি হচ্ছে না।
অবশেষে এখন এসে ওই দুই স্থানে পানির ফোয়ারা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রকাশিত ‘সোহরাওয়ার্দীতে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের ভাস্কর্যের বদলে বসছে পানির ফোয়ারা’ শীর্ষক খবরে বলা হচ্ছে, এজন্য প্রকল্পের নকশা পরিমার্জন করা হয়েছে। পরিবর্তিত নকশায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ‘হলোগ্রাফিক থ্রিডি’ উপস্থাপনার বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে।
কী অদ্ভুত সিদ্ধান্ত! যেখানে ইতিহাসের দায়, সেখানে বসছে ফোয়ারা?
প্রশ্ন হলো, একটি ফোয়ারা কী বলে? ফোয়ারা সৌন্দর্য দেয়, প্রশান্তি দেয়, বিকেলের হাওয়ায় জলকণার খেলা করে, কপাল ভালো হলে সেখানে রংধনুর দেখা মিলতে পারে। কিন্তু এই ফোয়ারা কখনো ইতিহাসের কথা বলে না, এর স্নিগ্ধ জলকণায় রক্তের দাগ দেখা যায় না। ফোয়ারার সামনে দাঁড়িয়ে প্রযুক্তিভিত্তিক প্রজন্ম বড়জোর একটা ছবি তুলবে।
কিন্তু ভাস্কর্যে লুকিয়ে থাকে একটি জাতির ইতিহাস ও সময়ের সাক্ষ্য। যে শিশুটি ফোয়ারার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবে, সেই শিশু পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ কিংবা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করবে, “এরা কারা? এখানে কী হয়েছিল?” আর সেই প্রশ্নের উত্তরেই শুরু হবে ইতিহাসের পাঠ। স্মৃতিস্তম্ভের কাজ কেবল সৌন্দর্যবর্ধন নয়, ইতিহাসকে স্মরণ করানো।
চব্বিশের ৫ অগাস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলোকে ক্ষতবংশত করা হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রতি ক্ষোভ দেখিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর করে বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। দেশজুড়ে সেই ভাস্কর্যগুলো আজও অবহেলিত, সংস্কারের মুখ দেখেনি। ইউনূস সরকারের শাসনামলে কোথাও কোথাও পর্দা টানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, সরকারের অর্থ অপচয়ও করা হয়েছে।
পৃথিবীর মধ্যে আমরাই এক অভাগা জাতি, যে জাতি নিজের জন্ম নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে। এই জাতিই নিজেদের পূর্বপুরুষদের রক্তদান নিয়ে হাসাহাসি ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। এই জাতি পৃথিবীর ইতিহাস পড়ে না, পৃথিবীর অন্য দেশের স্মৃতিস্মারক নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। জার্মানির বার্লিনে হলোকাস্ট স্মারক, হিরোশিমার পিস মেমোরিয়াল, নরম্যান্ডির সৈকতে যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন—সবখানেই মূল কথা একটাই: যা ঘটেছিল, তা ঘটেছিল ঠিক এখানে। কোনো দেশ সেসব জায়গায় সাজসজ্জার ফোয়ারা বসিয়ে ইতিহাসকে ঝাপসা করেনি। বরং ইতিহাসকে যতটা সম্ভব স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ করে তুলেছে।
প্রশ্ন হলো, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি কাদের এত ক্ষোভ? মানলাম ইউনূস সরকার একটি গোষ্ঠীর প্রতি দুর্বল ছিল, 'রিসেট বাটন' চাপতে তৎপর ছিল; কিন্তু বর্তমান সরকার তো নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একজন আপাদমস্তক মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার; তাহলে তার দল কেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর প্রকল্পে 'পরিমার্জন' করতে চাচ্ছে?
হ্যাঁ, ব্যয় সংকোচনের কথা বিবেচনা করে নকশার পরিমার্জন হতেই পারে। কিন্তু যখন পরিমার্জনের ফলে ঐতিহাসিক ঘটনার মূল চেতনাকেই আঘাত করা হয়, তখন সেটি আর কারিগরি সিদ্ধান্ত থাকে না। সেটি মূলত ইতিহাসের পরিমার্জনের স্পর্ধায় পরিণত হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গায়ের জোরে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ পরিমার্জন করা যায় না, ৭ মার্চের আবেদন কমানো যায় না। ইউনূস সরকার হয়তো ৭ মার্চ দিবস বাতিল করেছিল, ভাষণ বাজানো নিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল; কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ কিংবা ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। কোনো সরকার, কোনো নকশা, কোনো ফোয়ারা সেই সত্যকে বদলাতে পারবে না। তাহলে সেই ঐতিহাসিক স্থান থেকে প্রকৃত সত্য সরিয়ে ফেলার তাড়না কেন?
এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের সম্পত্তি নয়, এটি গোটা জাতির উত্তরাধিকার। সরকার আসবে, সরকার যাবে, কিন্তু ৭ মার্চ থাকবে, ২৬ মার্চ থাকবে, ১৬ ডিসেম্বর থাকবে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দলীয় টানাটানি আগে ছিল, বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে। অতীতেও বিভিন্ন সরকার নিজেদের সুবিধামতো ইতিহাসের কোনো অংশ বড় করেছে, কোনো অংশ ছোট করেছে। অনেকে মনে করেন, ইতিহাসের উপস্থাপনা একপেশে হয়ে পড়েছিল। সেই সমালোচনার জায়গা থাকতেই পারে। কিন্তু একপেশে উপস্থাপনার কথা বলে প্রকৃত ঘটনাটাকে ফোয়ারার পানিতে ঢেকে ফেলার চিন্তা যার মাথা থেকেই আসুক না কেন, তারা মূলত এ দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন দেখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই বিভাজন করতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিই বেশি আনন্দিত হবে।
যে জাতি তার বিজয়ের স্থানকে চিনতে ভুলে যায়, সে জাতি একসময় বিজয়ের মাধুর্যও ভুলে যায়। ফোয়ারার জল বয়ে যাবে, কিন্তু যে মাটি রক্তস্নাত, যেখানে ঘুমিয়ে আছে ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মায়ের সম্ভ্রম, তাকে ভুলিয়ে রাখা যায় না। পরাজিতদের আত্মসমর্পণ পরিমার্জন করা যায় না, একাত্তরও মুছে ফেলা যায় না। 'রিসেট বাটন' চাপার চেষ্টা ছিল, কিন্তু দিন শেষে এ দেশের মানুষ দেখিয়ে দিয়েছে 'একাত্তরের' বিকল্প মাপার পাল্লা পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। একাত্তর এ দেশের মাটিতে মিশে আছে, মানুষের হৃদয়ের চার অলিন্দে অনবরত প্রবাহিত হচ্ছে।
ড. নাদিম মাহমুদ: গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: nadim.ru@gmail.com
