দেশে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা কত?

দেশে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত পূরণের নিয়ম থাকলেও বেসামরিক নাগরিকদের হাতে থাকা বৈধ অস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারের কোনো দপ্তরের কাছে নেই।

লিটন হায়দারবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Oct 2019, 04:55 AM
Updated : 29 Oct 2019, 07:09 AM

জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এসেছে। জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা একটি তালিকায় প্রায় ৭০ হাজার বৈধ অস্ত্রের তথ্য এলেও তালিকাটি চূড়ান্ত নয় বলে মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০১৬ অনুযায়ী নাগরিকত্ব, বয়স, আয়কর দেওয়াসহ বেশ কিছু শর্ত পূরণের পর জেলা প্রশাসক ছোট (পিস্তল-রিভলবার) এবং বড় (শটগান) অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়ে থাকেন। পিস্তল-রিভলবারের লাইসেন্সের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রও লাগে।

লাইসেন্স দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে গোয়েন্দা তদন্তও হয়। একজন ছোট-বড় মিলিয়ে দুটির বেশি অস্ত্রের লাইসেন্স পান না। কোনো মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত আসামিও লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন না।

জিকে শামীমকে গ্রেপ্তারের সময় তার এই বৈধ অস্ত্রটি পাওয়া গিয়েছিল

আর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হবে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধানকে। যারা সেই অস্ত্র ব্যবহার করবেন, তাদের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সুপারিশের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তিপত্র নিতে হবে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীম ও তার সাত দেহরক্ষী আটটি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেখা যায়, অস্ত্রগুলো বৈধ হলেও সেগুলো দেহরক্ষীদের নিজ নিজ নামে লাইসেন্স করা, প্রতিষ্ঠানের নামে নয়।

ওই ঘটনার পর নীতিমালা স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে বলা হয়, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে কারও দেহরক্ষী হওয়া যাবে না, বেসরকারি সংস্থায় নিরাপত্তাকর্মীর চাকরিতেও সেই লাইসেন্স ব্যবহার করা যাবে না।

অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় যথাযথভাবে নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়ায় অপরাধীরাও বৈধ অস্ত্রের মালিক হয়ে যায় বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ এসেছে সংবাদমাধ্যমে।

আবার অতীতে সরকার বদলের পর আগের অনেক লাইসেন্স বাতিল হলেও অস্ত্রের কোনো হিসাব রাখা হয়নি। 

নাগরিকদের হাতে এ মুহূর্তে কতগুলো বৈধ অস্ত্র আছে তা জানতে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে যোগাযোগ করে স্পষ্ট কোনো তথ্য পায়নি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) জাকারিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে অস্ত্রের পরিস্যংখ্যান জানিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয় বলে তার জানা নেই।

একই কথা বলেন সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. তাহমিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “জেলা প্রশাসক কার্যালয় আমাদের অধীন হলেও বৈধ অস্ত্রের ব্যাপারে কোনো তথ্য সেখান থেকে আমাদের পাঠানো হয় না।”

অথচ কুমিল্লা ও মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে পাওয়া গেল উল্টো বক্তব্য।

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, “কোনো ব্যক্তিকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার পর তার একটি কপি বিভাগীয় কমিশনার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আমরা সেটা মেনটেইন করি।”

আর মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌস বলেন, “নিয়মানুযায়ী আমরা অস্ত্রের তথ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে থাকি। তবে বিষয়টি গোপনীয়, আপনাকে তথ্য দিতে পারছি না।”

এলাকাভিত্তিক লাইসেন্সপ্রাপ্তদের অস্ত্র ও গুলির বিবরণসহ বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট থানায় জানানোর নিয়ম আছে। সে তথ্য একটি নিবন্ধন খাতায় সংরক্ষণ করার কথা।

লাইসেন্স বাতিল হলে, অস্ত্র হারিয়ে গেলে, নবায়ন না হলে, অস্ত্র নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গেলে বা লাইসেন্সধারী ব্যক্তি দেশের বাইরে গেলে সেই তথ্যও থানায় জানানোর বিধান রয়েছে।

বৈধ অস্ত্রের তথ্যের জন্য থানাগুলোর এই ‘নিবন্ধন খাতার’ ওপরই নির্ভর করতে হয় রেঞ্জের ডিআইজি বা পুলিশ সুপার কার্যালয়গুলোকে।

পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য বলেন, “প্রতিটি থানায় গান রেজিস্ট্রার চেকিং চার্ট আছে। থানার একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে লাইসেন্সধারী ব্যক্তির অস্ত্র নিয়মিত পরীক্ষা করার বিধান রয়েছে।

“লাইসেন্সধারী অস্ত্রের সংখ্যা কত তা থানায় লিপিবদ্ধ থাকবে, তার তালিকা এসপি অফিসেও থাকার কথা। তারাই তদারকি করবে। ডিআইজি অফিসে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই।”

তবে পাবনার পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম তার এলাকায় বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা জানাতে পারেননি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বৈধ অস্ত্রের ব্যাপারে থানায় একটি রেজিস্ট্রার মেইনটেইন করা হয়।”

একই ধরনের কথা বলেছেন ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামানও।

বৈধ অস্ত্রের বিষয়ে থানা ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের তথ্যে মিল আছে কিনা সেটাও দেখার কেউ নেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এক থানার ওসি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “থানায় একটি রেজিস্ট্রার রাখা হলেও সেটা আপডেট থাকে না। (অস্ত্র) এলাকার বাইরে গেলে থানায় জানানোর কথা, কেউ সেটা জানায় না। গুলি ব্যবহারের তথ্যও থানাকে জানান না লাইসেন্সধারী ব্যক্তি।”

দেশে বৈধ অস্ত্রের সঠিক পরিসংখ্যান পুলিশ সদর দপ্তরেও নেই। সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশ অস্ত্রের লাইসেন্স দেয় না। তবে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার স্বার্থে ইউনিট লেভেলে লাইসেন্সকৃত বৈধ অস্ত্রের তালিকা সংরক্ষণ করা হয়।”

সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব কামাল উদ্দিন জানান, তার সময়ে সারাদেশে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা জানতে একটি উদ্যাগ নেওয়া হয়েছিল। তবে দুই বছর আগে অবসর নেওয়ায় তিনি ফলাফল দেখে যেতে পারেননি।

“৫-৬ জনকে দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রণালয়ে নতুন একটি ডেস্কও করা হয়, যাদের কাজ ছিল জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এবং তথ্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা।”

সেই কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা বের করতে সম্প্রতি সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।

“জেলা থেকে তথ্য এসেছে। সে অনুযায়ী একটি প্রাথমিক তালিকাও তৈরি করা হয়েছে, ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার বৈধ অস্ত্রের তথ্য রয়েছে।”

তবে এই তালিকা চূড়ান্ত নয় জানিয়ে তিনি বলেন, “অস্ত্রের লাইসেন্সের বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া। কখনও বাতিল হচ্ছে, কখনও নতুন অস্ত্র ইস্যু হচ্ছে। কারও অস্ত্র আবার চুরি বা হারিয়ে যাওয়াও ঘটনা ঘটেছে। তবে নতুন যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেখানে সব তথ্য আপডেট রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।”

হালানাগাদ তথ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখিয়ে তালিকা চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।