২৬ বছরে এসএসসিতে পাস বেড়েছে যে হারে
মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় গত ২৬ বছরে পরীক্ষার্থীর সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পাসের হার।
১৯৯০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় যেখানে ৩১ দশমিক ৭৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছিল, সেখানে চলতি বছর পাস করেছে ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ পরীক্ষার্থী।
অর্থাৎ, এই সময়ে পাসের হার বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ পয়েন্ট। গণিতের হিসাবে পাসের হার বৃদ্ধির হার দাঁড়াচ্ছে ১৭৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
বুধবার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছ থেকে চলতি বছরের পরীক্ষার ফলাফল জানার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ফলকে ‘অনেক ভালো’ বলেছেন। সেইসঙ্গে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ‘ফেল’ আরও কমানোর কথাও বলেছেন তিনি।
“পাসের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি ছেলেমেয়েরা ফেল করবে কেন?... ফেল করার কোন অর্থ হয় না। আমরা অনেক সুযোগ সুবিধা দিচ্ছি।”
বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের ‘অনেক মেধাবী’ অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তাদের ফেল করার কোনো সুযোগ নেই। একটু ভালভাবে সুযোগ দিলেই তারা পাস করতে পারবে।”
পরে এবারের সার্বিক ফলাফল জানাতে সংবাদ সম্মেলনে এসে শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ বলেন, “আমরা অসন্তুষ্ট নই, কিন্তু আমরা আরও ভালো চাই। আমাদের ছেলেমেয়েরা আরও ভাল করুক।”
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসএসসিতে ১৯৯০ সালে চার লাখ ৩৫ হাজার ৯১৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। ২০১৬ সালে এসে এই সংখ্যা হয়েছে ১৩ লাখ ২৮৪ জন জন।
এ হিসেবে ২৬ বছরে এসএসসিতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে তিন গুণের বেশি।
পাসের হারের পারদ: ১৯৯০-২০১৬
সাল | পাসের হার |
১৯৯০ | ৩১.৭৩% |
১৯৯১ | ৬৪.৯৫% |
১৯৯২ | ৬১.৬০% |
১৯৯৩ | ৬১.০৯% |
১৯৯৪ | ৭১.৪৬% |
১৯৯৫ | ৭৩.২০% |
১৯৯৬ | ৪২.৬১% |
১৯৯৭ | ৫১.৪৫% |
১৯৯৮ | ৪৭.৯৬% |
১৯৯৯ | ৫৪.৬২% |
২০০০ | ৪১.৫৮% |
২০০১ | ৩৫.২২% |
২০০২ | ৪০.৬৬% |
২০০৩ | ৩৫.৯১% |
২০০৪ | ৪৮.০৩% |
২০০৫ | ৫২.৫৭% |
২০০৬ | ৫৯.৪৭% |
২০০৭ | ৫৭.৩৭% |
২০০৮ | ৭০.৮১% |
২০০৯ | ৬৭.৪১% |
২০১০ | ৭৮.১৯% |
২০১১ | ৮২.১৬% |
২০১২ | ৮৬.৩২% |
২০১৩ | ৮৯.২৮% |
২০১৪ | ৯২.৬৭% |
২০১৫ | ৮৬.৭২% |
২০১৬ | ৮৮.৭০% |
এই ২৬ বছরের মধ্যে ১৯৯০ সালের পর পাসের হার সবচেয়ে কম ছিল ২০০১ সালে, ৩৫ দশমিক ২২ শতাংশ। এরপর ২০০৩ সালে ৩৫ দশমিক ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে।
২০১০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু হয়। পরের বছর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পাসের হার ৮০ শতাংশ পেরিয়ে যায়।
২০১৪ সালে তা পৌঁছায় ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশে। গত ছয় বছরে সবসময়ই পাসের হার ৮০ শতাংশের বেশি ছিল।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাসের হারে এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করার কারণে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতাও এক্ষেত্রে কাজ করেছে।
“শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার কারণেই পাসের হার বেড়েছে। আগে পারিবারিকভাবে এভাবে পড়ালেখায় যত্ন নেওয়া হতো না। এখন বাচ্চাদের নিয়ে সবাই সচেতন। বেতনের একটি বড় অংশ সন্তানের লেখাপড়ায় ব্যয় হচ্ছে।”
“বাংলাদেশে ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার মান বাড়া বা কমার বিষয়টি বোঝা যায় না। এই মান নিরূপণ করতে হলে বিজ্ঞাসম্মত গবেষণা প্রয়োজন; বাংলাদেশে কখনোই তা চোখে পড়েনি।”
মানের প্রশ্নে কোনো উত্তর না এলেও বিষয় বিবেচনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহের ঝোঁক বদলের একটি চিত্র পাওয়া যায় বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর কাছ থেকে।
এতে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে মাধ্যমিকে বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের সঙ্গে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চালুর পর থেকে শিক্ষার্থীদের মোট সংখ্যার মধ্যে আনুপাতিক হারে মানবিকে পড়ার প্রবণতা কমেছে অনেকখানি। অন্যদিকে বেড়েছে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থীর হার।
| ১৯৯৮ সাল পরীক্ষার্থী: ৭২২৩০০ জন | ২০১৬ সাল পরীক্ষার্থী: ১৩০০২৮৪ জন |
বিজ্ঞান | ৩৩.০১% | ২৯.০৩% |
মানবিক | ৫৯.৬৮% | ৪০.৬৬% |
ব্যবসায় শিক্ষা | ৭.৩০% | ৩০.৩১% |
অধ্যাপক মাসুদুজ্জামান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কেবল পাসের হারে নয়, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তন ছাড়াও মেয়েদের শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
“আগের সেই ৩১ শতাংশ পাসের বিষয়টি মঙ্গলজনক নয়। কারণ যারা অকৃতকার্য হলো, তাদের অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, ঝরে যাবে।
“আর ৮৮ শতাংশ পাসে আমি কোনো সমস্যা দেখছি না। পাশের দেশ ভারতেও এ ধরনের পাবলিক পরীক্ষায় ৯০ শতাংশের উপরে পাসের হার থাকে। তবে এই বৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে হলো কি না- সে প্রশ্ন থেকে যায়।”
পাসের হারে কেমন করে অস্বাভাবিকতা আসতে পারে?
এই শিক্ষা গবেষক বলছেন, পরীক্ষার খাতা যেভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তাতে ত্রুটি আছে।
“ভালো ফলাফলের সঙ্গে ভালো মান আশা করলে খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের বেশি সময় দিতে হবে। নইলে প্রত্যেক শিক্ষককে এখনকার চেয়ে কম খাতা দেখার দায়িত্ব দিতে হবে।”
মাধ্যমিকে এখন ১২০০ নম্বরের পুরোটাই চূড়ান্ত পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের লেখা থেকে মূল্যায়ন করা হয়। এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা যায় কি না- সে প্রশ্নও রেখেছেন অধ্যাপক মাসুদুজ্জামান।
তিনি বলেন, “পরীক্ষার পুরো নম্বরের মূল্যায়ন বোর্ডের ওপর ছেড়ে না দিয়ে অন্তত ২০ শতাংশ স্কুলের পারফরমেন্সের ওপর ছেড়ে দিলে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকবে।
“অবশ্য সেক্ষেত্রে আবার দেখতে হবে, অভিভাবকরা যাতে স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে কোনোভাবে ছেলেমেয়ের নম্বর বাড়িয়ে নিতে না পারেন।”
