Published : 08 Mar 2026, 02:08 AM
‘তহবিল সংকটে’ থাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সদ্য বিদায়ী প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের সময় দেওয়া সব ঠিকাদারি কাজ ও বিলের যর্থাথতা খতিয়ে দেখতে চান নতুন প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
এজন্য ‘তদন্ত কমিটি’ গঠন করতে যাচ্ছেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন তিনি।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার দিন কয়েক পর দায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রশাসক মিল্টন উত্তর সিটির বেহাল আর্থিক অবস্থার কথা তুলে ধরেন। এর জবাবে এক দিন পর ফেইসবুক পোস্টে তিনি বিদায় নেওয়ার সময় কত টাকা রেখে গেছেন তা তুলে ধরেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব পাওয়া এজাজ।
এ নিয়ে দুই প্রশাসকের বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে শনিবার উত্তর সিটির এক অনুষ্ঠান শেষে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় মিল্টন গত দেড় বছরে করপোরেশনের দেওয়া ‘কাজ ও বিল খতিয়ে দেখে তাতে অনিয়ম হয়েছে’ কি না যাচাই করার কথা বলেন।
“কিছু অনৈতিকভাবে টেন্ডার যেগুলো হয়েছে, সেগুলো আমরা তদন্ত করব। তার (সাবেক প্রশাসক এজাজ) যত কাজ আছে, অনিয়ম আছে, সেগুলো আমরা তদন্ত কমিটি করে যাচাই করব।”
উত্তর সিটির আর্থিক অবস্থা এতটা খারাপ হওয়ার মূল কারণ এরপর বলা যাবে বলে তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকা-১৫ আসনে ভোট করে হেরে যাওয়া বিএনপির প্রার্থী মিল্টনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দায়িত্ব পালনকালে ‘মোট ২৫৭০ কোটি টাকার বিলের নথি অনুমোদন’ করে গেছেন সাবেক প্রশাসক এজাজ, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আগের প্রশাসকের ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির’ সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পেয়েছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মিল্টন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আগের প্রশাসকের আমলের দেওয়া কাজ ও বিলেল বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।
“কিছু হইছে কিনা বা অন্য কোনো অনিয়ম আছে কিনা এটা দেখতেছি।”
এজন্য তদন্ত কমিটি গঠন করার চিন্তাভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
এজাজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে দুদক
গত ৯ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের তৎপরতার মধ্যেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক এজাজকে সরিয়ে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
সেদিন তার বদলে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আক্তার জাহানকে নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ত্রয়োদশ সংসদে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি।
এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটিসহ দেশের ছয় সিটি করপোরেশনে ছয়জন বিএনপি নেতাকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেয় সরকার। যেখানে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসকের দায়িত্ব পান মিল্টন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কাছে হেরে যান।
কী অভিযোগ
এর আগে চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছর ১৯ অগাস্ট ঢাকা উত্তর সিটিসহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করা হয়। ওই দিনই এসব সিটি করপোরেশনে প্রশাসক বসানো হয়।
তাতে ঢাকা উত্তর সিটির দায়িত্ব পান স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মাহমুদুল হাসান। এরপর ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজকে উত্তর সিটির প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কিন্তু অল্প দিনেই তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। এক পর্যায়ে সেসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
এর অংশ হিসেবে এজাজকে দুদকে তলব করা হয়। তিনি হাজির না হওয়ায় গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি আদালত তার দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
আদালতে দুদকের আবেদনে বলা হয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধিনস্ত মিরপুর গাবতলী পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, বোরাক টাওয়ার বা হোটেল শেরাটনের ভাগ, বনানী কাঁচাবাজারে দোকান বরাদ্দ, খিলগাঁও তালতলা সুপার মার্কেটের পার্কিং স্থানে দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দ, সিটি করপোরেশনের ভ্যান সার্ভিস, ফুটপাতে দোকান বরাদ্দ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নানা বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে।
উত্তর সিটির তহবিলে ‘২৫ কোটি টাকা’
প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩ মার্চ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে মিল্টন উত্তর সিটির অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই বেহাল দশায় থাকার কথা সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “উত্তর সিটির সাবেক প্রশাসক জাতীয় নির্বাচনের দু-দিন আগে ১০ ফেব্রুয়ারি শেষ অফিস করেছেন। সেদিনও তিনি ৩৪টি ফাইল সাইন করে গেছেন। করপোরেশনে এখন একেবারেই ভঙ্গুর অবস্থা, কোনো ফান্ড নেই। এদিকে ১৪৭০ কোটি টাকার টেন্ডার দিয়ে ওয়ার্ক অর্ডার দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
“করপোরেশনে এখন কোনো টাকা নেই, মাত্র ২৫ কোটি টাকা আছে বলে জানলাম। আয়-ব্যয় এবং রাজস্ব থেকে রেভিনিউ সেকশন- আমি কথা বলে যেটা জানতে পেরেছি, প্রতি মাসে স্যালারি আসে ১৩ কোটি টাকা। ফলে থাকবে কেবল ১২ কোটি। এখন বিচার বিশ্লেষণ আপনারাই করবেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কীভাবে করব?”
এজাজের জবাব
এর একদিন পর ৫ মার্চ ফেইসবুকে সাবেক প্রশাসক এজাজ দাবি করেন চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি তার শেষ কর্মদিবসের দিন উত্তর সিটির ২৬টি অ্যাকাউন্টে মোট ১২৬০ কোটি টাকার বেশি জমা রেখে গেছেন।
তিনি লেখেন, “আমি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে এক বছর মেয়াদের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলাম। আমার এক বছরের মেয়াদের শেষ দিন ১০ ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেই। সেদিন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২৬ টি অ্যাকাউন্টে মোট ১২৬০ কোটি ১৫ লাখ ৫১ হাজার তিনশ ১১ টাকা ৬০ পয়সা তহবিলে জমা রেখে একটি সমৃদ্ধ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন রেখে এসেছিলাম। আশাকরি সুন্দর ঢাকা গড়তে বর্তমান টিম আরও ভালো করবে, শুভকামনা।”
কড়া প্রতিক্রিয়া মিল্টনের
উত্তর সিটি করপোরেশনের তহবিলের ভঙুর অবস্থা নিয়ে তার বক্তব্যে প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রশাসকের জবাবের বিষয়ে শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা বলেন নতুন প্রশাসক মিল্টন।
মহাখালীর রক্ষাকালী মন্দির ও দুর্গা মন্দিরের সংস্কার কাজের উদ্বোধন শেষে তিনি আগের প্রশাসকের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তার ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।


তিনি বলেন, “সাবেক প্রশাসক দায়িত্ব হস্তান্তরের দিন করপোরেশনের ২৬টি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে ১,২৬০ কোটি ১৫ লাখ ৫১ হাজার ৩১১ টাকা ৬০ পয়সা থাকার যে দাবি করেছেন, সে বিষয়ে জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
“ডিএনসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি বিল পরিশোধ করা হয় কর্পোরেশনের সাধারণ তহবিল থেকে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নতুন প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণকালে ডিএনসিসির সাধারণ তহবিলে ক্যাশ স্থিতি ছিল ২৫ কোটি টাকা এবং ফিক্সড ডিপোজিট ছিল বিভিন্ন তহবিলের ৮২৫ কোটি টাকা, যা আপদকালীন দায় মেটানোর জন্য সংরক্ষিত রাখা আছে।
“ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে ১ জুলাই ২০২৫ তারিখে সাধারণ তহবিলে ক্যাশ স্থিতি ছিল ৫৯৭ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন তহবিলের ফিক্সড ডিপোজিট ছিল ৮২৫ কোটি টাকা। ১ জুলাই ২০২৪ তারিখ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয় ১১৭৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৪ তারিখ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ তারিখ পর্যন্ত মোট ক্যাশ ব্যালেন্স ১৭৭৫ কোটি টাকা।
“সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর অতি উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রণয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত মোট ব্যয় করেছেন ১৪৩৯ কোটি টাকা। ফলে ১ জুলাই ২০২৫ তারিখে ক্যাশ স্থিতি থাকে ৩৩৬ কোটি টাকা। ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয় ৮২০ কোটি টাকা। ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ক্যাশ স্থিতি দাঁড়ায় ১১৫৬ কোটি টাকা।”
মিল্টন বলেন, “সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ পুনরায় অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এই অল্প সময়ের মধ্যে খরচ করেন ১১৩১ কোটি টাকা।”
বর্তমান প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণের দিন অর্থাৎ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ‘ক্যাশ স্থিতি থাকে ২৫ কোটি টাকা, যা ডিএনসিসির ইতিহাসে সর্বনিম্ন’ বলে তুলে ধরেন তিনি। আর পূর্বের বিভিন্ন তহবিলের ফিক্সড ডিপোজিট করা ৮২৫ কোটি টাকা, যা আপদকালীন দায় মেটানোর জন্য সংরক্ষিত রাখা আছে।
মিল্টনের অভিযোগ, “সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ তঞ্চকতার আশ্রয় গ্রহণ করে ফিক্সড ডিপোজিটের ৮২৫ কোটি টাকা এবং কর্পোরেশনের বিভিন্ন নির্দিষ্ট তহবিল-যেমন: জামানত তহবিল, পেনশন তহবিল, শিক্ষা তহবিল, জিপিএফ (জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড) ইত্যাদি খাতের চলতি/সঞ্চয়ী হিসাবের ৪৩৫ কোটি টাকা একত্র করে মোট ১২৬০ কোটি টাকার একটি হিসাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে নগরবাসীকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছেন এবং ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছেন মাত্র।”
নতুন প্রশাসক মিল্টন বলেন, “সাবেক প্রশাসক শেষ কর্মদিবসে অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সাধারণ তহবিলে স্থিতির বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে এবং প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে কিনা তা যাচাই না করে তাড়াহুড়ো করে ৩৬টি বিলের নথি অনুমোদন করে গেছেন, যাতে প্রায় ৪২ কোটি টাকা বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাবে। বর্তমানে বর্ণিত নথিগুলো যাচাই করার জন্য প্রক্রিয়াধীন।”