Published : 16 Apr 2026, 06:53 PM
সংসদ ভবনে শব্দযন্ত্র (সাউন্ড সিস্টেম) স্থাপন ও পরবর্তী সংস্কার কাজে দুর্নীতির অভিযোগে ঠিকাদার কোম্পানি কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী জাহিদুর রহিম জোয়ারদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক।
বৃহস্পতিবার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বেরিয়ে সাংবাদিকদের কাছে জাহিদুর রহিম দাবি করেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় ক্ষতিগ্রস্ত অধিবেশন কক্ষের বিদ্যুতের তার ‘লুজ’ হয়ে যাওয়ায় সংসদে টেবিল চাপড়ানোর সময় সাউন্ড সিস্টেম বা শব্দ ব্যবস্থায় বিভ্রাট ঘটে।
তিনি সংস্কার কাজের প্রথম ধাপে যুক্ত আমানত এন্টারপ্রাইজের কারিগরি অনভিজ্ঞতাকেও দায়ী করেন।
জাহিদুর বলেন, “সংস্কার কাজের প্রথম অংশ করেছিল আমানত এন্টারপ্রাইজ। তাদের কারিগরি অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় শেষ পর্যায়ের কাজ আমাদের করতে হয়েছে।”
এদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জাহিদুর রহিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুদকের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসের নেতৃত্বে একটি দল তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, সংসদ ভবনে শব্দযন্ত্র স্থাপন ও পরবর্তী সংস্কার কাজে দুর্নীতির অভিযোগে ঠিকাদারকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে নথিপত্র সংগ্রহের উদ্যোগ চলছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর দিন থেকেই আইনপ্রণেতাদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে শব্দযন্ত্রে বিভ্রাট। এ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন একাধিক সংসদ সদস্য। এমনকি শব্দযন্ত্রের বিভ্রাটের কারণে ১২ মার্চ প্রথম দিনের অধিবেশন কিছু সময়ের জন্য বন্ধও রাখতে হয়েছিল।
পরদিনের বৈঠকেও ‘হেডফোন ও শব্দ ব্যবস্থা’ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী।
এরপর ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আবারও শব্দযন্ত্র বিভ্রাটের ঘটনা ঘটে। সেদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তার নিজের মাইকও কাজ করছিল না। পরে তা মেরামত ও নামাজের বিরতির জন্য অধিবেশন ৪০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হয়।
শব্দযন্ত্রে এই বিভ্রাট ‘অন্তর্ঘাত’কি না তা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে ‘সংসদ কমিটি’।
বিষয়টি নিয়ে গত ৭ এপ্রিল এক নোটিসে জাহিদুর রহিম জোয়ারদারকে ১৬ এপ্রিল হাজির হয়ে বক্তব্য দিতে বলে দুদক।
নোটিসে বলা হয়, কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদারসহ অন্যদের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের ‘যোগসাজশে’ শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে।
অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসে ৯ এপ্রিল। তখন সংস্থার উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষের ‘সাউন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম’ বা এসআইএস পরিচালনা, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে ‘অর্থ আত্মসাৎ’ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৩ জানুয়ারি এ অনুসন্ধান শুরু হয়।
অভিযোগে বলা হয়, জাহিদুর রহিম জোয়ারদার, তার কোম্পানি কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কিছু প্রকৌশলীর যোগসাজশে সংসদের অধিবেশন কক্ষের এসআইএস পরিচালনা, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে ‘বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ আত্মসাৎ’ করেছেন। আমদানির ক্ষেত্রে ‘বেশি দাম’ দেখিয়ে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগও রয়েছে।
এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে ব্যয় হিসাব, দরপত্রের নথি, প্রাক্কলন, বিল-ভাউচার, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের পরিচয় চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নথি না পাওয়ায় অনুসন্ধানে বিলম্ব হচ্ছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
এর আগে গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদের শব্দ ব্যবস্থার সমস্যা ‘জটিল আকার’ ধারণ করেছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “অধিবেশন চলার কারণে এখনই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তবে অধিবেশন শেষ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের ঘটনায় সংসদ ভবনের এসআইএস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি সচল করতে উদ্যোগ নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। তখন কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড ক্ষতিগ্রস্ত শব্দ ব্যবস্থা পরীক্ষা করে মেরামতের মাধ্যমে চালু করা সম্ভব বলে মত দেয় এবং সম্ভাব্য খরচের হিসাব জমা দেয়।
পরে প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া ও সম্মানী বাবদ ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা চেয়ে আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। এসআইএস মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৯ কোটি টাকার প্রাক্কলনও প্রস্তুত করা হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনের বৈঠক শেষে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়েছে। এটি মেরামতও করা হয়েছে। পরে আমরা শুনেছি, এখানে আগুনও লেগেছিল, যদিও আমরা নিজেরা তা দেখিনি। কিন্তু সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের নামে দুর্নীতি হয়েছে বলেই আমাদের বিশ্বাস হয়েছে।
“প্রায় চার কোটি টাকা খরচ করে সাউন্ড সিস্টেম রিপেয়ার করা হয়েছে। অথচ রিপেয়ার না করে যদি সেটি রিপ্লেস করার চেষ্টা করা হত, তাহলে ভালো হত। এখনো ঠিকভাবে সাউন্ড শোনা যায় না। সংসদ যেভাবে চলার কথা, এখনো সেভাবে চলছে না। আমি যখন প্রথম সংসদ সদস্য হয়ে আসি, তখন এখানে ফিলিপসের সাউন্ড সিস্টেম ছিল। তখন একজন সংসদ সদস্য মাইক্রোফোন ভেঙে ফেললেও সাউন্ডে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু এখন তো সাউন্ডই ঠিকমত কাজ করে না।”
দুদক এ বিষয়ে কাজ করে থাকলে তাকে স্বাগত জানিয়ে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “দুর্নীতি দমন কমিশন যদি এ বিষয়ে কাজ করে থাকে, আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। একইসঙ্গে আমরাও চেষ্টা করছি, যাতে বাজেট অধিবেশনের মধ্যেই সাউন্ড সিস্টেমের উন্নতি করা যায়।
“এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে তিন পক্ষের সঙ্গে বসে ‘আধুনিক প্রযুক্তি’ বোঝেন এবং সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা আছে, এমন লোকজনের সহায়তায় সমাধান বের করার চেষ্টা করা হবে।”
ঠিকাদার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে চিফ হুইপ বলেন, “আপনারা শুনলে অবাক হবেন, সাউন্ড সিস্টেমের ঠিকাদার করা হয়েছে এমন লোককে, যাদের অভিজ্ঞতা নির্মাণকাজে। অথচ এ ধরনের কাজে সাউন্ড বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকা দরকার ছিল।
“আরও আশ্চর্যের বিষয়, মেরামতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একজন মুদি দোকানদারকে। এখান থেকেই সমস্যার শুরু। আর রিপেয়ার করেছে কারা, সেটাও বিস্ময়কর। টেন্ডারে দুইজন অংশ নিয়েছিল। যিনি কাজ পাননি, তাকেই দিয়ে পরে রিপেয়ার করানো হয়েছে। অর্থাৎ যিনি কাজ পেয়েছেন, তিনি কাজ না করে, যিনি পাননি তাকে দিয়ে কাজ করিয়েছেন। এখানে একটা জোচ্চুরি হয়েছে।”
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দায়ি করতে চান না চিফ হুইপ। তার ভাষায়, “আমরা এখনই কাউকে দোষ দিতে চাই না। আমরা একটি অনুসন্ধান কমিটি করেছি। তারা রিপোর্ট দিলে কার দায় কোথায়, তা দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে আমরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে সাউন্ড সিস্টেম উন্নত করার চেষ্টা করছি।”