আট মাসে ৩৬৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

সমীক্ষায় দেখা গেছে স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি; আর ছাত্রীদের আত্মহত্যার হার ছাত্রের তুলনায় বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 Sept 2022, 02:10 PM
Updated : 9 Sept 2022, 02:10 PM

চলতি বছর দেশে প্রতি মাসে গড়ে ৪৫ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা করার তথ্য উঠে এসেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায়।

সংগঠনটি বলছে, গত জানুয়ারি থেকে অগাস্ট পর্যন্ত আট মাসে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসা, নার্সিং শিক্ষাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ছাত্রছাত্রী রয়েছে।

আঁচলের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ স্কুলের ছাত্রছাত্রী। আর সব পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের আত্মহত্যার প্রবণতা ছাত্রদের তুলনায় বেশি।

‘সাইবার ক্রাইম’ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাকে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার বড় কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। অভিমান, প্রেম ঘটিত কারণ, ধর্ষণ, সেশনজট, পড়াশোনার চাপকেও কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শুক্রবার ‘বেড়েই চলেছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার: আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া কতটা জরুরি?’ শিরোনামে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এই সমীক্ষার প্রতিবেদন তুলে ধরে আঁচল।

ফাউন্ডেশনের গবেষক ফারজানা আক্তার লাবণী লিখিত বক্তব্যে তাদের সমীক্ষায় পাওয়া বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন।

· ৩৬৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে স্কুল শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ১৯৪ জন; তাদের ৩২.৯৯% ছাত্র এবং ৬৭.০১% ছাত্রী

· কলেজ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৬ জন; তাদের ৪৬.০৫% ছাত্র এবং ৫৬.৯৫% ছাত্রী

· বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন; তাদের ৬০% ছাত্র, ৪০% ছাত্রী

· মাদ্রাসার ৪৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন এই সময়ে; তাদের মধ্যে ৩১.২৯% ছাত্র এবং ৬০.৭১% ছাত্রী।

দেশের দেড়শ জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার আত্মহত্যার সংবাদ বিশ্লেষণ করে এই পরিসংখ্যান পেয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন।

আত্মহত্যার কারণ

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধান করে আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিমান থেকে, প্রেমঘটিত কারণে, ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির শিকার হয়ে তারা এ পথ বেছে নিচ্ছে।

পড়াশোনার চাপ, সেশনজট কিংবা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েও কেউ কেউ আত্মাহুতি দিচ্ছে।

এ ছাড়া পারিবারিক কলহ, পরিবার থেকে প্রত্যাশিত কিছু না পাওয়া, মিথ্যা অপবাদ, বিয়েতে প্রত্যাখ্যাত হওয়া, স্বামী পছন্দ না হওয়া, মানসিক অবসাদ, ভারসাম্যহীনতা, বিষণ্নতা, বন্ধুর মৃত্যুর কারণে হতাশা থেকেও অনেক শিক্ষার্থী নিজেকে শেষ করে দিয়েছে।

সাইবার ক্রাইমকে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছে আঁচল ফাউন্ডেশন।

অনলাইন নির্ভরশীলতাকে বর্তমান জীবনের অন্যতম অংশ হিসেবে বর্ণনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, আত্মহননকারী চার শিক্ষার্থীর জীবনে ‘সাইবার ক্রাইম’ বড় ভূমিকা রেখেছে।

আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছিল, সেই নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে তারা আত্মাহুতি দেয়।

আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাকে আত্মহত্যার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা তানসেন রোজ।

তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি শিক্ষার্থীরা পরিবার থেকে কোনো কিছু না পেয়ে অভিমান করে আত্মহত্যা করছে। দেখা গেছে, মোটরবাইক চেয়ে পায়নি, এমন কারণেও আত্মহত্যা করে বসেছে।”

কোভিড মহামারীর কারণে দীর্ঘসময় ঘরবন্দি থাকার সময়টা মানুষের মনে পরিবর্তন এনেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “মানুষের রাগ বেড়েছে, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার চাপ বেড়েছে, মানসিকভাবে সহজেই ভেঙে পড়ার হারও বেড়েছে …। আমাদের শিক্ষার্থীরা সবকিছু একসঙ্গে সামাল দিতে পারছে না বলেই আত্মহত্যার হার বেড়েছে।“

উপায় কী

তানসেন রোজ বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে বড় পরিসরে কাজ করা প্রয়োজন।

“সাত বছর বয়সী শিশু, যার আত্মহত্যা বোঝার মত বয়স হয়নি তার আত্মহত্যা করার পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করতে হবে। শিশু বয়স থেকেই শিক্ষার্থীদের মনোবল শক্ত করতে হবে।“

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্কুলগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট আত্মহত্যার ৬০ শতাংশের বেশি। এই হার উদ্বেগজনক।

“এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। পেশাজীবীদেরও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা উচিত। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।”

সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া নারায়ণগঞ্জের এডিসি (শিক্ষা ও আইসিডি ডিভিশন) আজিজুল হক মামুন শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষাথীদের নিয়মিত ‘কাউন্সেলিংয়ের’ আওতায় আনার তাগিদ দেন।

তিনি বলেন, “মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোয় একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং একজন সাংস্কৃতিক বিষয়ক শিক্ষক থাকতে পারেন। শিক্ষার্থীদের কারিকুলাম কার্যক্রমে জোর বেশি দিতে হবে।“

ফাউন্ডেশনের জেনারেল সেক্রেটারি সামিরা আক্তার সিয়াম বলেন, “পুঁথিগত বিদ্যা নয়, সামাজিক মূল্যবোধ চর্চায় শিশুকাল থেকে জোর দিতে হবে। এছাড়া পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করা, সামাজিক দায়িত্ব পালন করা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে শারীরিক স্বাস্থ্যসেবার মতই গুরুত্ব দিলে আত্মহত্যা প্রবণতা কমে আসবে।”

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রস্তব-

· আত্মহত্যা রোধে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন।

· পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে মানসিক শিক্ষা ও মনের যত্নের কৌশল বাস্তবায়ন।

· স্কুল-কলেজের আলোচনায় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা সম্পর্কিত বিষয় রাখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা।

· প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রাখা।

· শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সহশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

· শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোয় ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইন পরিচালনার উদ্যোগ।

· হতাশা, আপত্তিকর ছবি, আত্মহত্যার লাইভ স্ট্রিমিং, জীবননাশের পোস্ট ইত্যাদি চিহ্নিত করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ টুলস ব্যবহার করা।

· আত্মহত্যার ঘটনায় পরিবার ও পরিচিতজনদের ‘দায়’ অনুসন্ধানে বাধ্যবাধকতা রাখার ব্যবস্থা নেওয়া।

· মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দ্রুত ও সহজলভ্য করতে একটি টোল ফ্রি জাতীয় হট লাইন চালু করা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক